ভোটারের মন সাধনার ধন|112696|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৮:৩৩
ভোটারের মন সাধনার ধন

ভোটারের মন সাধনার ধন

সারা দেশের সব পথ এবং ভোটারের মন এখন ভোটকেন্দ্রের দিকে। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চলছে জোরেশোরে। গ্রামে-বাজারে, নগরে-বন্দরে, গঞ্জে প্রার্থীরা ব্যস্ত। ফুরসত নেই অন্য কোনো কিছু করার বা ভাবার। ভোটের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠার এই এক সুবর্ণ সময়। প্রার্থীরাও জানেন, জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে একটি আদর্শ ও লক্ষ্য পেশ করার মাধ্যমে জনগণমন অধিনায়ক হওয়ার দিগন্ত হয় উন্মোচিত। মানুষের মনে নিজের গ্রহণযোগ্যতা ও অপরিহার্যতা তুলে ধরা গেলে, ভোটার নিশ্চয় কাছে টেনে নেবে, বুকে মেলাবে বুক। তার ভোট পাওয়ার পথ হবে সুগম। জনগণই নির্বাচিত করবে কে হবেন তার প্রতিনিধি। কে হবেন তার নেতা। ভোটের মাধ্যমেই হয়ে আসছে এই নির্বাচন।

কিন্তু এই ভোট নিয়ে চলে নানা তালবাহানা। ভোটের রাজনীতি অনেক সময় হয়ে যায় বিপদসংকুল। বিপথে চালিত হয় অনেকেই। ভোট নিয়ে তাই থাকে সংশয়, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, হানাহানি; সংঘর্ষ-হাঙ্গামারও থাকে না অন্ত। রাজনৈতিক মানসকেও জনগণের সঙ্গে সম্পর্কিত করার পথ এই নির্বাচন। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহমর্মিতার হাত বাড়াতেই হয়। বিরোধিতা বিঘন্ন করে শান্তি, হানাহানির পথ করে প্রশস্ত। ধ্বংস ডেকে আনে, পতনের সিঁড়ি নামাতে থাকে নিচে। এসব হতে দূরে থেকে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের ভাষায় কথা বলার মধ্যেই আছে বাস্তবতার দিকদর্শন। প্রার্থীকে এসব বুঝতে হয়, ভাবতে হয়। এদেশে নির্বাচন আয়োজন খুব সহজসাধ্য নয়।

দেশবাসী নির্বাচনকে দেখে উৎসব হিসেবে। কিন্তু সেই উৎসবেও ভাটা পড়ে। যখন শক্তিমত্তার প্রদর্শন চলে, তখন ভোটে অংশগ্রহণ বা ভোটদান হয়ে পড়ে দুষ্কর। দুর্বৃত্তদের দাপট যখন হয়ে ওঠে তীব্রতর, তখন ভোট পরিণত হয় প্রহসনে। এসব কাজে রাজনৈতিক দলগুলোর থাকে মুখ্য ভূমিকা। যেকোনো মূল্যে বিজয় অর্জনের হীন পথ বেছে নিতে কার্পণ্য করে না তখন। ভোটার দলনের নির্মম দৃশ্যগুলো হয়ে যায় পীড়াদায়ক। এ দেশের জনগণ নির্বাচনভীতিতে কাটিয়েছে সামরিক শাসনকালে, এমনকি গণতান্ত্রিক আমলেও। ক্রমশ সেসব অপস্রিয়মাণ হয়ে আসছে।

মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য বাহুবলের বিপরীতে সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠুভাবে ভোটদানের জন্য দেশবাসী অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম এমনিক আত্মদানও করেছে। সেসব নির্বাচনী ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। এমনিতেই এই উপমহাদেশে নির্বাচনকালে হানাহানি, সংঘর্ষ, সংঘাত প্রাণহানির ঘটনা ঘটে আসছে। জমি দখল, চর দখলের চেয়ে অত্যধিক হচ্ছে ভোটযুদ্ধ। কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ও বাক্স দখলের জন্য এ সব সংঘর্ষ দেশবাসী সব সময়ই প্রত্যক্ষ করেছে।

ভোট পবিত্র আমানত হলেও ভোটদান খুব সহজ কাজ নয়। কেন্দ্রে গিয়ে বিফল মনোরথে ফিরে আসা ভোটারের সংখ্যাও এদেশে কম নয়। ব্যালট পেপার হাতে পাওয়ার আগেই শুনতে হয় যে ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। বিষন্ন হওয়ারই কথা। সমর্থিত বা পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অবশেষে যদি শুনতে হয়, ‘আপনার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে’ তখন ভেতরে ভেতরে কান্না জাগতেই পারে। মুষড়েও পড়তে পারেন ভোটার। আরো একধাপ এগিয়ে ভোটারকে আগের রাতে বলে আসা হয়, কেউ কেন্দ্র যাবেন না। গেলে বিপদ হবে। কিংবা কষ্ট করে কেন্দ্রে যাওয়ার দরকার নেই। আমরাই সিল মেরে দেব আপনার হয়ে।

ভোট এলে তাই এসব ভোটারের জীবনে বিভীষিকাও নেমে আসে। ভোটের আগে ও পরে ভোটারের ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়ার, জমির দখল নিয়ে নেওয়া, সম্পদ লুট করে নেওয়া, এমনকি নারীদের ধর্ষণের ঘটনারও কমতি নেই। সেসব ঘটনা লিখতে গেলে অনেক কথা লেখা হয়ে যাবে। ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সহিংস ঘটনাগুলো এদেশের নির্বাচনী রাজনীতির ইতিহাসে কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে আছে। ভোটের বিভীষিকার শিকার হয়ে আসছে এদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। সেই পাকিস্তান পর্ব থেকে বাংলাদেশ পর্বে তাদের ভুগতে হয় ভোটের সময়। মর্মান্তিক, নির্মম সেই সব ঘটনা দেশত্যাগেও বাধ্য করেছে অনেককে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনের আর দেরি নেই। আর ছয় দিন পর ভোট। ভোটের চাঁদ আকাশে উঁকি দিচ্ছে পৌষের হিম হিম রাতে। তার আলোকচ্ছটা ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। দিকদিগন্তে ভোটের সুবাতাস বইছে। জনগণের দরবারে ভোট প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির নহরও বইছে। এমনভাবে যেন সবকিছু উজাড় করে দিতে প্রার্থীর প্রাণ আঁকুপাঁকু করছে। ভোটার এ সময় হয়ে ওঠেন সম্মানিত জন। ধনী, গরিব, নিঃস্ব নির্বিশেষে। কোথাও হুমিকও দেওয়া হচ্ছে, প্রার্থীর পক্ষে। অমুক মার্কায় ভোট না দিলে দেখে ‘নেব’র হুমকিও ধ্বনিত হয়। এসব উপেক্ষা করে ভোট দেওয়া ভোটারের পক্ষে কঠিন বৈকি। আজকাল দেখা যায়, মোবাইল ফোনে ছবি তুলে এনে প্রার্থীর অনুগামীদের দেখাতে হয়, ভোট কোন মার্কায় দেওয়া হয়েছে। নতুবা ‘কেল্লা ফতে’ হওয়ার অবস্থা হয়। দেশজুড়ে চলছে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ। সবার লক্ষ্য ভোটারের মন জয় করা। এই মন জয়ের পথ ও পদ্ধতি সবার একরকম নয়।

উপঢৌকনের ব্যবহারেও কম যান না অনেক প্রার্থী। এই শীতার্ত সময়ে তাই দরিদ্রদের কম্বল, শীতবস্ত্র প্রদানের ঘটনা আর গোপন থাকছে না। যদিও তা আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। কিন্তু অর্থ দিয়ে ভোট কেনার বিষয়টা অনেক পুরোনো। তা শুধু জাতীয় নির্বাচনেই নয়, পেশাজীবীদের নির্বাচনেও এই চর্চা অনেক বেড়েছে। এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রতিশ্রুতির বহর বাড়ছে। ভোটাররা এমন সব প্রতিশ্রুতি অতীতের নির্বাচনেও পেয়েছে। কিন্তু সেসব শুধুই প্রতিশ্রুতি! নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিনিধি ভুলেও সেসব অঙ্গীকার পূরণে সক্রিয় হননি। এসব সামান্যতম কার্যকর করার ক্ষেত্রেও সচেষ্ট হতে দেখা যায়নি।

এবারের নির্বাচনে প্রায় সব দলের অধিকাংশ প্রার্থীই পুরোনো। অতীতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে না পারার অজুহাত হিসেবে খাড়া করছেন নানা যুক্তি। নতুন করে অবশ্য আবার প্রতিশ্রুতি দেওয়ার ‘রসিকতা’ ভোটারও উপলব্ধি করতে পারেন। তাই নানা আশ্বাস-প্রশ্বাস জনগণের কর্ণকুহরে প্রবেশ করানোর চেষ্টা চলছে।

যে জনগণকে একদা ‘দূর দূর’ করে তাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে কোনো কোনো প্রার্থীকে, সেই জনগণকে বুকে নিতে এখন খালু, নানা ডেকে মুখে ফেনা তুলে ফেলা প্রার্থীও কম নেই। গ্রামের মোড়ল, কিংবা পাড়া-প্রতিবেশী অথবা নাগরিক সহকর্মীর প্ররোচনায় কিংবা নির্দেশে তাদের নির্দেশিত মার্কায় ভোট দিতে হয়। গ্রাম-গঞ্জসহ সর্বত্র এখন ভোটার আর প্রার্থীর কোলাকুলি, গলাগলি চলছে। যেন তারা কত আপনজন। ভোটারের মন গলানোর মাঝেই বুঝি নিহিত রয়েছে বিজয়ের পতাকাকে অর্জন করা। নির্বাচনের আকাশজুড়ে কালো মেঘও ভাসে কখনো কখনো।

ভোটকেন্দ্র দখলের মহড়া থেকে পুরোপুরি দখল; প্রতিপক্ষের সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো, ভোট প্রদানে বাধাদানের দৃশ্য জনগণ আর দেখতে চায় না। তারা চায় না বলেই ভুয়া ভোটার আর জালভোট প্রদানের চিত্র ক্রমশই লুপ্ত হয়ে গেছে। নির্বাচন গণতন্ত্রের একটি অংশ। গণতন্ত্রের অর্থ হলো জনগণের মতামত অনুযায়ী দেশশাসন। সরকার যদি মনে করে আমরা পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়েছি, সুতরাং এই সময়ে আমাদের কাজকর্মের হিসাব চাইতে পারবে না কেউ। আমরা যা খুশি করব। কিন্তু ক্ষমতায় যাওয়ার আগে ভোটপ্রার্থী হিসেবে দেশবাসীর কাছে কী কবুল করেছিলেন তা তারা মনে রাখেন না। এসব এ দেশবাসী দেখেছে পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে। ক্ষমতায় গিয়ে এযাবৎকালের তাদের কাজ একটি গ্রাম্য প্রবাদের সঙ্গে তুলনীয়। প্রবাদটি হচ্ছে ‘তুই মোর কোলের পোলাটি ধর, আমি তোর পান্তাভাত খেয়ে নেই।’ এ সবই অতীতের কথা। বর্তমান সময় প্রযুক্তির কাল। কিন্তু ভোট হবে মান্ধাতার আমলের পদ্ধতিতে। যা অনেক দলই চায় না।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে প্রার্থী ও ভোটারদের উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ, সংশয় ততই বাড়ছে। বিভিন্ন স্থানে হামলা, সংঘর্ষ, এমনকি হতাহতের ঘটনাও ঘটছে। ঋণখেলাপি, বিলখেলাপিসহ নানা কারণে অনেকের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে। যা আদালতেও গড়িয়েছে। ইতোমধ্যে একটি আসনের প্রার্থী ইন্তেকাল করায় সেখানে নতুন তফসিল ঘোষণা করা হবে পরে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের সহিংসতা ঘটেনি এখনো। কিন্তু ঘটতে কতক্ষণ!

ভোটাররা সংঘবদ্ধ শক্তি নয় বলেই তাদের ওপর দিয়ে ঝড়ঝাপটাও বয়ে যেতে পারে। ভোটের দিন কেন্দ্র দখল ও পাহারা দেওয়ার ঘোষণাও এসেছে রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে। যা সংশয় বাড়ায়। কিন্তু এসব ছাপিয়ে একাদশ সংসদ নির্বাচনে শঙ্কামুক্ত হবেন বলে ভোটাররা আশা করতেই পারেন। অবশ্য ভোটারের মন বোঝা সহজ নয়, এটা সাধনার কাজ। ব্যালটে সিল মারার আগেও সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে, সে ভোটারের একান্তই নিজস্ব ইচ্ছাতেও। প্রার্থীরা যতই চেষ্টা করুন, দলীয় আনুগত্যের বাইরে থাকা ভোটারের মন সহজে গলে না।