শতভাগ তামাকমুক্ত ভোটকেন্দ্র হোক|112742|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
শতভাগ তামাকমুক্ত ভোটকেন্দ্র হোক
সৌভাগ্য বড়ুয়া

শতভাগ তামাকমুক্ত ভোটকেন্দ্র হোক

জাতীয় জীবনে গুরুত্ববহ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বাছাইপর্ব সম্পন্ন করেছেন দায়িত্বশীল রিটার্নিং অফিসাররা। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনে দেশের অন্যতম রাজনৈতিক দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট অংশ না নেওয়ায় কিছুটা ফিকেই ছিল নির্বাচনী আমেজ। তবে চলতি বছর সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচনকে ঘিরে সারা দেশে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সারা দেশের মানুষের মধ্যে এক ধরনের আনন্দের আমেজ লক্ষ করা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে পরিলক্ষিত হচ্ছে প্রত্যাশা।

বেশ কয়েক দিন ধরে দেশের শীর্ষস্থানীয় অনেক পত্রিকা-টিভি চ্যানেলে নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন এলাকার, শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রত্যাশার চিত্র ফুটিয়ে তোলার জোর চেষ্টা চলছে। এসব প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের ব্যবস্থা, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস বন্ধ করা, জবাবদিহির ব্যবস্থা করা, নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাসযোগ্য, নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী করা, তথ্য অধিকার আইনের সংস্কার। আরো কত কী! এ ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নানা প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন নবীন প্রজন্মের অনেক। শিক্ষকসমাজ থেকে শুরু করে অন্য অনেক শ্রেণি-পেশার মানুষও তাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। এসব প্রত্যাশার সঙ্গে যুক্ত করতে চাই আরেকটি বিষয়। এ বিষয়টি পূরণ করতে কর্র্তৃপক্ষকে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না বলেই বোধ করি। আমাদের প্রত্যাশা, ‘তামাকমুক্ত ভোটকেন্দ্র’।

বাংলাদেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে জনসমাগমস্থল (পাবলিক প্লেস) ও জনপরিবহন (পাবলিক ট্রান্সপোর্ট) ধূমপানমুক্ত। এ ছাড়া রয়েছে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও কর্মক্ষেত্র, যদিও এসব স্থানেই সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হন। নিয়ন্ত্রণে অনেক আইন থাকা সত্ত্বেও অবলীলায় উদ্বেগহীনভাবে যত্রতত্র ধূমপান থেকে শুরু করে বিভিন্ন তামাকপণ্য সেবন করে যাচ্ছেন অনেকে। অভিজ্ঞতা বলে নির্বাচনী ভোটকেন্দ্রও তার বাইরে পড়ে না।

এবারের নির্বাচন ঘিরে সব শ্রেণির মানুষ ও ভোটারের প্রত্যাশা অন্য যেকোনো নির্বাচনকালীন সময়ের চেয়ে বেশি। একটি নির্বাচন দিয়েই নির্বাচন কমিশনের মনোভাব, দক্ষতা-সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। যেহেতু ভোটের কার্যক্রম পরিচালনার ভার নির্বাচন কমিশনারের এবং ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছাড়াও অনেক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট থাকেন। তাই চাইলেই এ সামান্য দৃষ্টান্তটুকু স্থাপন করে নির্বাচন কমিশন অসমান্য কৃতিত্ব লাভ করতে পারে।

সম্প্রতি নগরীর সিটি করপোরেশন কেবি আবদুর সাত্তার মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব থিয়েটার আর্টসের (বিটা) একটি প্রকল্প অবহিতকরণ অনুষ্ঠানে তামাকের ব্যবহারের অনেক তথ্য উঠে আসে। এ সভায় জানানো হয়, তামাক ব্যবহারজনিত কারণে দেশে প্রতিবছর ১ লাখ ৬৮ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। পঙ্গুত্ববরণ করে আরো প্রায় ৫ লাখ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ সংখ্যায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাকজাত পণ্য সেবন করে। পরোক্ষভাবে ধূমপানের শিকার হয় আরো ৪ কোটি ৮ লাখ মানুষ। এ তো গেল তামাক ব্যবহারকারীর পরিসংখ্যান। বিটা থেকে জানানো হয়, নগরীতে তামাক বিক্রয়কেন্দ্র চিহ্নিতকরণে নগরীতে একটি জরিপ চালিয়েছে তারা। এতে দেখা যায়, শুধু চট্টগ্রাম নগরীর ৪১ ওয়ার্ডে তামাক বিক্রয়কেন্দ্র আছে ১৭ হাজারেরও অধিক। এর অনেকগুলোই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্টুরেন্ট, হাসপাতালের ১০০ গজেরও কাছে।

বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। ওই কনভেনশনে স্বাক্ষরের পরই ২০০৫ সালে বাংলাদেশ ধূমপান এবং তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) অ্যাক্ট ২০০৫ প্রণয়ন করা হয়েছিল। বাংলাদেশে তামাক নিয়ন্ত্রণের এ মুখ্য আইনটি ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। এটি সংক্ষিপ্ত হলেও বিভিন্ন ক্ষেত্র যেমন, ধূমপানমুক্ত নীতি, তামাকের বিজ্ঞাপন, বিস্তার এবং সহায়তাকারী, তামাকজাত দ্রব্যাদির প্যাকেজিং, লেবেলিং ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে ওই অ্যাক্টের বিভিন্ন বিষয় বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যার জন্য ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা ২০১৫ প্রণীত হয়। এ ছাড়া প্রতিবছরের মতো এবারও যথাযথ উদ্্যাপনে পালিত হয়েছে বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের (৩১ মে)। প্রতিপাদ্য ছিল ‘এফসিটিসি’ (ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল)।
কিন্তু আইনের কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব, সচেতনতার সংকটÑ এসব মিলিয়ে কোনোভাবেই ঠেকানো যাচ্ছে না তামাকপণ্য সেবনকারী কিংবা বিক্রেতা কাউকেই। তামাকের বহুমাত্রিক ভয়াবহতার কারণে বিশ্বব্যাপী তামাক নিয়ন্ত্রণে বহুবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু চলমান পদক্ষেপগুলো বাধাগ্রস্ত করতে অপতৎপরতা চালাচ্ছে ধূর্ত তামাক কোম্পানিগুলো। ক্ষতিকর তামাকজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ কোনো রাষ্ট্রের কাছেই প্রত্যাশিত হতে পারে না। তামাক কোম্পানিগুলোকে বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে দেশে তামাক নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না।

এসডিজি অর্জনে সফলতা পেতে এবং জনকল্যাণে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার ইতোমধ্যে প্রত্যয় দেখিয়েছে সরকার। আমার ধারণা, জাতীয় নির্বাচনকে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলতে শতভাগ তামাকমুক্ত ভোটকেন্দ্রের ব্যবস্থা করা গেলে এটিই হতে পারে সেই লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম ধাপ। শুধু প্রশাসন নয়, রাজনৈতিক দলগুলো ও নির্বাচনী প্রার্থীরা এতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে এবং নির্দ্বিধায় বলা যায়, এ ধরনের উদ্যোগ দেশের জনগণের মতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। তৈরি হবে সচেতনতা।

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়