বিটিভি দেখে দিন কাটে খালেদার|112803|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
বিটিভি দেখে দিন কাটে খালেদার
আলাউদ্দিন আরিফ

বিটিভি দেখে দিন কাটে খালেদার

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাগারে সময় কাটে বিটিভি দেখে, পত্রিকা পড়ে। মাঝে-মধ্যে তিনি গৃহকর্মী ফাতেমার সঙ্গে গল্প করেন। কারারক্ষীদের সহায়তা নিয়ে ফাতেমা তাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে বারান্দায় ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়ান।

খালেদার দিন কীভাবে কাটছে তা জানতে কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা, অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মো. ইকবাল হাসান, উপ-কারা মহাপরিদর্শক (ঢাকা) টিপু সুলতান, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল কবির চৌধুরীসহ কারাগারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারা অধিদপ্তরের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিভিশন (প্রথম শ্রেণির বন্দি হিসেবে বিশেষ সুবিধা) পাওয়া বন্দি হিসেবে কারাগারের তালিকায় থাকা একটি পত্রিকা নিতে  পারেন। তিনি টেলিভিশন (ডিশ লাইন ছাড়া) দেখার সুযোগ পান। আরেক কর্মকর্তা বলেন, পুরোনো কারাগারের ভেতরই তার জন্য রান্নার ব্যবস্থা আছে। কারারক্ষীরা সেটা তদারক করেন। মাছ, মাংস, ডাল, সবজি ও ভাত-রুটি রান্না করে তাকে দেওয়া হয়। বাইরে থেকে কোনো খাবার সরবরাহ করার সুযোগ নেই। রান্না করা খাবার চিকিৎসকের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর খালেদা জিয়াকে দেওয়া হয়। তিন বেলাই এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়।

খালেদা জিয়া বন্দি হিসেবে থাকায় নাজিম উদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারটি নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। বিপুলসংখ্যক কারারক্ষী ছাড়াও বাইরে সব সময় চকবাজার থানা-পুলিশের একটি দল দায়িত্বে থাকে। এ ছাড়া প্রায় সব গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনও পালা করে দায়িত্ব পালন করেন কারা ফটকে। সেখানে অপরিচিত কেউ গেলেই তাদের নানামুখী প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়।

নাজিম উদ্দিন রোডের পুরোনো কারাগারে দায়িত্বরত এক কারারক্ষী বলেন, খালেদা জিয়া খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। মাঝে মাঝে কারারক্ষীদের সহযোগিতায় তাকে হুইল চেয়ারে বসিয়ে ভবনের বারান্দায় ঘোরানো হয়। এ ছাড়া তিনি ইবাদত-বন্দেগিতে সময় পার করেন। কারারক্ষীরা তার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান না।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসক দলের সদস্য বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত এপ্রিলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার সময় খালেদা জিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ তার দেখা হয়েছে। এরপর বহুবার কারা কর্র্তৃপক্ষের কাছে দেখা করার অনুমতি চাইলেও দেওয়া হয়নি। খালেদা জিয়ার সঙ্গে মাঝে-মধ্যে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে পারেন। আগে সপ্তাহে একবার পরিবারের সদস্যরা সাক্ষাৎ করতে পারতেন, এখন প্রতি ১৫ দিন অন্তর পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে পারেন। তাদের কাছ থেকে যতটুকু জানা যায়, এর বেশি কিছু আমাদের জানার সুযোগ নেই।

তিনি বলেন, খালেদা জিয়া আগে থেকেই ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, হাঁটুব্যথা ও চোখের সমস্যাসহ অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত। আগে তিনি হুইল চেয়ার ছাড়াই চলতে পারতেন। কারাবন্দি হওয়ার পর তার অসুস্থতা বেড়ে যাওয়ায় হুইল চেয়ার ছাড়া চলতে পারেন না। এই সময় খালেদা জিয়ার বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু তাকে সেটা দেওয়া হচ্ছে না।

বিএনপি নেতারা জানান, গত ১২ নভেম্বর কারাগারে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সর্বশেষ সাক্ষাৎ করেন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ পাঁচ বিএনপি নেতা। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন, জমির উদ্দিন সরকার, মওদুদ আহমদ ও মির্জা আব্বাস তার সঙ্গে ছিলেন। ওই দিন সাক্ষাৎ শেষে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। পরে খালেদা জিয়ার জন্য ফেনী-৩, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনের মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয় তার ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামিকে। ওই দিনই নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারকে বিশেষ কারাগার ঘোষণা দিয়ে সেখানে রাখা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে। এর মধ্যে গত ৬ অক্টোবর আদালতের নির্দেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) ভর্তি করে কারা কর্র্তৃপক্ষ। এক মাস চিকিৎসা শেষে গত ৮ নভেম্বর তাকে ফের কারাগারে নেওয়া হয়।

১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদার তত্ত্বাবধানের জন্য গৃহকর্মী ফাতেমা বেগম পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারেই আছেন। তিনি দিনে কর্তব্যরত নারী ডেপুটি জেলারের কাছে থাকেন; ডাকা হলে তিনি খালেদা জিয়াকে ওষুধ দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা করেন। রাতে ঘুমান খালেদা জিয়ার পাশের কক্ষে। খালেদা জিয়ার সেবায় কারাগারের ভেতরে সার্বক্ষণিক একজন নারী ফার্মাসিস্ট, প্রয়োজন হলে একজন নারী চিকিৎসক থাকেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় খালেদা জিয়ার কক্ষ ঘিরে একজন নারী ডেপুটি জেলারের নেতৃত্বে সার্বক্ষণিক চারজন নারী কারারক্ষী থাকেন। কারাগারের বাইরে একজন ডেপুটি জেলারের নেতৃত্বে একদল কারারক্ষী দায়িত্ব পালন করেন।

কারা কর্মকর্তারা জানান, কারাবন্দি হওয়ার পর খালেদা জিয়াকে প্রথমে পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রশাসনিক ভবনের সিনিয়র জেল সুপারের কক্ষে রাখা হয়। ১১ ফেব্রুয়ারি ডিভিশন পাওয়ার পর সেখান থেকে খালেদা জিয়াকে বন্দিদের সন্তান রাখার স্থান ডে-কেয়ার সেন্টারে নেওয়া হয়। ডে-কেয়ার সেন্টারের দ্বিতীয় তলার সিঁড়ির ডান পাশের দুটি কক্ষ থাকার উপযোগী করে তোলা হয়। একটি কক্ষে লাগানো হয় নতুন টাইলস, সিলিং ফ্যান; বসানো হয় খাট, চেয়ার ও টেবিল এবং বিটিভির সংযোগ দেওয়া হয় সেখানে।