ভোট নিয়ে হিজড়াদের প্রশ্ন আমরা কোন লাইনে দাঁড়াব|112813|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
ভোট নিয়ে হিজড়াদের প্রশ্ন আমরা কোন লাইনে দাঁড়াব
জান্নাতুল ফেরদৌসী

ভোট নিয়ে হিজড়াদের প্রশ্ন আমরা কোন লাইনে দাঁড়াব

ওদের দেখলেই অনেকে ভয়ে আঁতকে ওঠেন। কারো মুখে ফুটে ওঠে বিরক্তির ছাপ। ওরা হিজড়া সম্প্রদায়। এ ধরনের বৈষম্য দূর করতে ২০১৩ সালের নভেম্বরে তাদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় সরকার। ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি হিজড়াদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরই মধ্যে পেরিয়ে গেছে চারটি বছর। এর পরও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হিজড়ারা ‘হিজড়া’ লিঙ্গ হিসেবে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের আগের মতো ‘নারী’ অথবা ‘পুরুষ’ হিসেবে ভোট দিতে হবে। এ কারণেই ভোট নিয়ে তাদের মনে নানা প্রশ্ন। এসব প্রশ্ন তুলে এনেছে দেশ রূপান্তর।

রাজধানীর মগবাজারে থাকেন জুঁই হিজড়া। সারা দিন মগবাজারের দোকানসহ আশপাশের পথচারীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে পেট চালান তিনি। ভোট নিয়ে তার ভাবনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা ভোট নিয়ে কী ভাবমু? সরকার পরিচয় দিছে; সেই পরিচয়ের তো লাইন নাই। আমগোরে দাঁড়াইতে হইব মাইয়াগো লাইনে। আর মাইয়ারা তো আমগোরে দেখলেই ভয় পায়। অনেক মাইয়া আবার হাসাহাসি করে। এই অবস্থায় ভোট দিমু কেমনে?’

জুঁইয়ের গুরু স্বপ্না হিজড়া বলেন, ‘আমরা হিজড়াদের জন্য আলাদা লাইন চাইছিলাম; সরকার দেয়নি। সেখানেও আমাদের কষ্ট আর লজ্জা পোহাতে হবে। মেয়ে ও পুরুষের যে লাইনেই দাঁড়াই না কেন, ওরা আমাদের দেখলেই ভয় পায়। আমার চুল কেমন, আমার চোখে কী দিয়েছি, এসব নিয়ে কেউ কেউ গবেষণা করে। ভোট দিতে গিয়েও তো স্বস্তি পাব না।’

ভোটে হিজড়াদের জন্য আলাদা লাইন করার বিষয়ে গত ৮ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলন করেছিল ‘সচেতন সমাজ সেবা হিজড়া সংঘ’ নামের একটি সংগঠন। কথা হয় এর সভাপতি ইভান আহমেদ কথার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্বীকৃতি পেলেও স্পষ্ট পরিচয় পাইনি আমরা। আমার জাতীয় পরিচয়পত্র পুরুষ হিসেবে দেওয়া হয়েছে। অনেকের আছে মেয়ে হিসেবে। কিছুসংখ্যক হয়েছে হিজড়া হিসেবে। ভোটকেন্দ্রে গিয়ে তো ঝামেলায় পড়তে হবে। আমরা যে লাইনে দাঁড়াব, লাইনটাই তো স্পষ্ট নয়! আমরা লোকসমাজে গেলে অনেকে বিরক্ত হয়। ভোটকেন্দ্রে কি তাহলে আমরা মানুষদের বিরক্ত করতে যাব?’

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনী উল্লাসে পুরোটাই নিভে যাওয়া বাতির মতো আমরা। জাতীয় ভোট হচ্ছে, অথচ আমাদের জাতীয় পরিচয়পত্র স্পষ্ট নয়।’

হাতিরপুলে রিকশাযাত্রীর কাছ থেকে টাকা নিচ্ছিলেন হাসি হিজড়া। মুখেও ছিল হাসি। নির্বাচন নিয়ে জানতে চাইলে ক্ষেপে গিয়ে তিনি বলেন, ‘মশকরা করো আমগোর লগে! আইডি দিবা না, আমগো লাইগা জায়গা দিবা না, আবার কও ভোট দিতে। আমরা ভোট দিমু কোন লাইনে? অন্যগো লাইনে গিয়া কি আমরা ঠ্যালাঠেলি করুম? যাও এহান থাইক্কা।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে কথা হয় হেনা হিজড়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাসস্থান, সুচিকিৎসা, কর্মসংস্থান এগুলো নিশ্চিত করতে হবে। তবে বর্তমান সরকারের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।’ তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমান সরকার যে আমাদের পরিচয় দিয়েছে, এখন তো আমরা সবার কাছে গিয়ে আইডি কার্ড দেখাতে পারি। আগে তো সে সুযোগও পেতাম না।’

হিজড়া সম্প্রদায়ের দাবি নিয়ে ‘সম্পর্কের নয়া সেতু’ সংগঠনের সভাপতি জয়া সিকদার বলেন, “ভোটার তালিকায় হিজড়া জনগোষ্ঠীর ক্যাটাগরিতে হিজড়া কমিটি ছাড়াও রূপান্তরিত নারী-পুরুষও রয়েছে। আমরা চাই, প্রত্যেকের জেন্ডার ওরিয়েন্টেশন থাকুক। তারা তাদের জায়গা থেকে ভোট দেবে। কিন্তু ভোটার আইডি কার্ডে ‘থার্ড অপশন’ নামের যে জায়গা থাকা দরকার, সেটা নাই।”

তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের কাছে আমাদের দাবি ছিল, হিজড়ারা যেন ভোট দিতে পারে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন বলেছে যে, আমাদের অভিযোগ তারা শুনেছেন। কিন্তু এবার সেই প্রক্রিয়ায় ভোট দিতে পারব না। তা ছাড়া আমাদের জন্য একটা আলাদা লাইন করারও প্রস্তাব করা হয়েছিল, সেটাও নাকি সম্ভব নয় বলে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে। ভোটের মাঠে এটা আমাদের জন্য কষ্টের।’

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের ১১ হাজার মানুষ রয়েছেন। তবে জয়া হিজড়া বলেন, এ সংখ্যা লাখেরও বেশি। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করেন।

হিজড়াদের আলাদা সারির বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিষয়ে গত মাসের ২৩ তারিখে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে আমি দুটি চিঠি দিয়েছিলাম। এরপর তারা যেটা জানিয়েছে যে, এই মুহূর্তে আলাদা করে কোনো তালিকা করা সম্ভব নয়। তাহলে এই নির্বাচনে তাদের জন্য কী ব্যবস্থা রাখা যায়, এমন প্রশ্নে তারা আমাকে জানায়, নির্বাচন কেন্দ্রে প্রতিবন্ধী, প্রবীণ নাগরিক ও হিজড়াদের জন্য আলাদা লাইন রাখা হবে, যাতে করে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দিতে পারেন। কারণ সব মানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, ‘তাদেরকে তো ভোটার লিস্টে রেখেছি। এর থেকে বেশি কিছু আমি বলতে চাই না।’