শুভ প্রত্যাশাই থাকবে নির্বাচনকে ঘিরে|112852|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১২:২৬
শুভ প্রত্যাশাই থাকবে নির্বাচনকে ঘিরে

শুভ প্রত্যাশাই থাকবে নির্বাচনকে ঘিরে

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে নানা নাটক হয়েছে শুরু থেকে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়া-না নেওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি করেছিল। শুরুতে শর্ত ছিল নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করে সেই সরকারের অধীনে নির্বাচন করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হলো তাদের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত না করলে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। প্রথম থেকেই অভিজ্ঞ মহলের বিশ্বাস ছিল, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে না এসে বিএনপি যে ভুল করেছে, একই ভুলে এবার পা দেবে না। বিগত পাঁচ বছরে দলের সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল, সেই ছন্নছাড়া অবস্থা থেকে দলকে সংগঠিত করার জন্য নির্বাচনকে অবলম্বন করতেই হতো। নিবন্ধন সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা তো ছিলই। এরই মধ্যে বিএনপির সক্রিয় বন্ধু জামায়াতে ইসলামী দল নিবন্ধন হারানোয় তা বিএনপির জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা ছিল। এবার দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া দ-িত হয়ে কারারুদ্ধ হলে নতুন সংকট বিএনপিকে ঘিরে ধরে। সংকট কাটাতে তাদের পরবর্তী কার্যক্রমটিও ভালো হয়নি। যেহেতু পরিবারতান্ত্রিকতায় আটকে গেছে আমাদের রাজনীতি তাই অন্য প্রবীণ নেতারা সাবালক হতে পারেননি। এ কারণে দ-িত পলাতক প্রবাসী তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করতে হলো। এসব বাস্তবতায় বিএনপির সংহতি সংকট পুরোপুরি কাটানো সম্ভব হয়নি। বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্তটা পাকা হয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনের মধ্য দিয়ে। বিএনপির সাফল্য এই যে, মুক্তিযোদ্ধা প্রাক্তন আওয়ামী লীগ নেতা কয়েকজনকে তাদের ক্ষুদ্র দলসহ নিজেদের নির্বাচনী ঐক্যে যুক্ত করতে পেরেছে। এসব নেতা শুরুতে আওয়াজ তুলেছিলেন জামায়াত সঙ্গে থাকলে তারা ঐক্য প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন না। বিএনপি এসব দৃশ্যত মেনে নিয়েই সম্ভবত এসব নেতাকে কাছে টানে। পরে ফাঁদে ফেলে অথবা ইচ্ছাকৃত ফাঁদে পা দেওয়া এই আগত নেতাদের বিএনপি নেতৃত্ব নিজস্ব তিলক কপালে পরিয়ে ২২ জন জামায়াত নেতাসহ সবাইকে একই নির্বাচনী পতাকার নিচে নিয়ে এলেন। এখানেই ক্ষ্যান্ত হলেন না। ঐক্যফ্রন্ট ও জামায়াত নেতাদের নিজেদের ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে দাঁড়ানো পাকা করলেন। অর্থাৎ বিএনপি, জামায়াত, গণফোরাম, নাগরিক ঐক্য, কৃষক-শ্রমিক জনতা লীগ ধানের শীষে একাকার হয়ে গেল। অন্যদিকে সরকারি দলের নেতারা আদর্শকে পরোয়া না করে হেফাজতে ইসলামের মতো দলকে নানা সুবিধা দিয়ে বন্ধুত্ব গড়লেন। এভাবে একধরনের রাজনৈতিক অসুস্থতার মধ্যদিয়ে এবার নির্বাচনী যাত্রাপথ তৈরি হলো।

বর্তমান সময়ের বাংলাদেশের রাজনীতি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় অগ্রসর হয়েছে বলে আমাদের মনে হয় না। বৈশ্বিক দৃষ্টিতে বলা যায় রাজতন্ত্রের ধারণার মধ্যদিয়ে রাজনীতির যাত্রা শুরু হলেও সময়ের বাস্তবতায় অঞ্চল ভেদে কখনো অভিজাততান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, একনায়কতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক নানা ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। তবে জন্মকাল থেকে শুরু করে বহুকাল পর্যন্ত রাজনীতির আভিজাত্য ছিল। রাজনীতিবিদরা সমাজের মানুষের চোখে নমস্য ছিলেন। তারা এখনকার অনেক রাজনীতিকের মতো ভুঁইফোড় প্রতিশ্রুতিবাজ ছিলেন না। তারা রীতিমতো রাজনীতি চর্চা করে নিজেদের যোগ্য করে তুলতেন। জনকল্যাণই যে রাজনীতিকের ব্রত, এটা বিশ্বাস করতে চাইতেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হারিয়ে দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য নানা চেষ্টা সব সময়ই চলত। তবে তা জনগণকে অস্বীকার করে নয়। চৌদ্দ, পনেরো, ষোলো শতকের বাংলার তুর্কি সুলতানরা দিল্লির সুলতানদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলায় স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রত্যেক সুলতান জনকল্যাণের আদর্শকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। সুলতান ও সুফিসাধকদের মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে এ পর্বে বাংলায় একটি অসাম্প্রদায়িক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উজ্জ্বল হয়েছিল অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিম-ল। ঔপনিবেশিক যুগে ব্রিটিশ শাসনবিরোধী সকল আন্দোলনে বাংলা তথা ভারতের রাজনীতি দেশ ও জনকল্যাণের আদর্শ বিচ্ছিন্ন হয়নি। এ কারণে জনচেতনায় রাজনীতি এর মাহাত্ম্য হারায়নি।

এরপর উপমহাদেশে ভারত বিভাগোত্তর রাজনীতিতে ধীরে ধীরে দুষ্টগ্রহ প্রভাব ফেলতে থাকে। রাজনীতিতে দলমতের বিভাজন থাকবেই। মতপথের পার্থক্য থাকলেও দেশপ্রেম ও জনকল্যাণের আদর্শ বিচ্যুত না হওয়াই ছিল রাজনীতির আদর্শ। এই সত্যটিকে অস্বীকার করে ‘দলতন্ত্র’ নামে একটি নতুন তন্ত্র জায়গা করে নেয় রাজনীতিতে। আমাদের দেশে দলতন্ত্র প্রবল প্রতাপে নেতিবাচক ধারণা নিয়ে সরবে অবস্থান গ্রহণ করতে থাকে স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে। প্রবল দলগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছার একটিই লক্ষ্য থাকে। রাজনীতিতে রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছার লক্ষ্য নিন্দার নয় বরঞ্চ কাম্যই হওয়ার কথা। রাষ্ট্রক্ষমতায় না পৌঁছাতে পারলে জনকল্যাণে কর্তব্য পালনের মোক্ষম সুযোগ তো পাওয়া যাবে না। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের আস্থায় এসে বড় দলগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া, ফিরে আসা এবং টিকে থাকার সম্ভাবনা সব সময় থাকে। এ কারণে সকল রাজনৈতিক দলের যার যার অবস্থানে থেকে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটানো প্রয়োজন। কর্তব্য জনগণের জন্য কাজ করে যাওয়া। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে দলতন্ত্র বা গোষ্ঠীতন্ত্র বলয়বন্দি হতে থাকে। দেশপ্রেমের চেয়ে দলপ্রেম প্রাধান্য পাওয়ায় জনগণের মতামতকে গৌণ করে ফেলেন আমাদের রাজনীতিবিদরা।

সকল পক্ষ গণতন্ত্রের মহাসড়ক দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছানোর মতো আত্মবিশ্বাসী থাকতে পারছে না। যে যার মতো করে খুঁজতে থাকে এদো কাদাময় গলিপথ। এই বাস্তবতায় সকল রাজনৈতিক দল জনসম্পৃক্ততাবিহীন কপট গণতন্ত্রের পসরা সাজায় রাজনীতির মঞ্চে। সাধারণ মানুষ তাদের আচরণে কতটা আস্থাশীল হলো কি হলো না তাকে পরোয়া করার প্রয়োজন বোধ করে না কেউ। ক্ষমতার রাজনীতির এক অশুভ প্রতিযোগিতায় দলীয় শক্তি বাড়াতে ঘর্মাক্ত হতে থাকে সকল পক্ষ। তবে অবশ্যই তা জনশক্তির ওপর ভর করে নয়। প্রতিযোগিতায় টেকার জন্য ভরসা করতে থাকে অর্থশক্তি আর পেশিশক্তির ওপর। এমন অসুস্থ ধারায় রাজনীতিকীকরণ হতে থাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শ্রমিক সংগঠন, বণিক সংঘ থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী সংগঠনে। এসব প্রতিষ্ঠানের রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা দলীয় রাজনীতির লেজুড়বৃত্তি করতে গিয়ে যুক্তিবুদ্ধি বিসর্জন দিয়ে নিজ নিজ দলের জিন্দাবাদ দিতে থাকেন। তাই যখন একজন দলীয়

রাজনীতিতিতে যুক্ত শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী নেতা নানা মাধ্যমে জনসম্মুখে বক্তব্য রাখেন তখন মনে হয় না মুক্তবুদ্ধি তাদের চালিত করে। বিবেকের শাসনের বদলে দলীয় নেতা-নেত্রীরা কোন শব্দ চয়নে সন্তুষ্ট হবেন এর প্রতিযোগিতায় মত্ত হন। ভালো মানুষ আর দেশপ্রেমিক রাজনীতিকরা মন্দের ভিড়ে কেবলই হারিয়ে যাচ্ছেন। তাই সাধারণের চোখে রাজনীতিবিদদের দাপুটে গোষ্ঠী এখন মিথ্যাচারী, দুর্নীতিপরায়ণ, ভূমিদস্যু, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী। এমন বাস্তবতায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের এই অন্তিম মুহূর্তেও তেমন উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না। দেশের অধিকাংশ জায়গাতেই বিরোধী পক্ষ সাবলীলভাবে মাঠে নামতে পারছে না বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এখনো উচ্চ আদালতের নির্দেশে ধানের শীষে আত্মগোপন করা ছদ্মবেশী জামায়াত প্রার্থীদের প্রার্থিতা অব্যাহত থাকবে কি না নির্বাচন কমিশন নিষ্পত্তি করেনি। হতো দ্রুতই একটা নিষ্পত্তির আদেশ পাওয়া যাবে।

সময়ের বাস্তবতায় এবং অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে দলগুলোকে ঘুরে দাঁড়াতেই হয়। পাঁচ বছর পরে হলেও একবার সাধারণ মানুষের কাছে ফিরে আসার তাগিদ অনুভব করেন নেতা-নেত্রীরা। নতুন পোশাকে শরীরের ঘা আড়াল করতে চান সবাই। দলের নীতি-আদর্শ পুনর্বার গণমানুষমুখী করার পদক্ষেপ নেন। সেই সুযোগে কখনো কখনো নিজেদের স্বচ্ছ করার ইচ্ছে জাগে। এসব কারণে ঘরপোড়া এ দেশের অনন্যোপায় বিপন্ন মানুষ ভাবে অন্তত নির্বাচনের এই প্রস্তুতিবেলায় আত্মশুদ্ধির পথে হাঁটবে আমাদের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা-যাওয়া করা বড় দলগুলো। কিন্তু দলগুলোর নেতারা যেভাবে প্রতিনিয়ত অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের গতানুগতিক ধারা বজায় রাখছেন, তাতে নির্বাচনের পরিবেশে একটি অস্বস্তি কাজ করছেই।

তারপরও আমরা উল্লিখিত সকল বাস্তবতা মেনেই প্রত্যাশা করব একটি গ্রহণযোগ্য শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হবে এবার। আর তেমন নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যক্ষ দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে হবে ভোটযুদ্ধে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকেই। অবশ্য এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকতে হবে সরকার ও সরকারি দলকে। নির্বাচনের মাঠকে যত বেশি উৎসবমুখর করে তোলা যাবে, সাধারণ মানুষের মন থেকে ভীতি ও সংশয় ততই কমে যাবে।

তবে বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় অনড় ভাবাপন্ন দলগুলো খুব সহজে যৌক্তিক অবস্থায় ফিরবে না। এমন পরিবেশ চলতে থাকলে জনগণের আস্থা থেকে প্রধান দুই দলই যে ক্রমে সরে যাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন কোনো আস্থাশীল পক্ষ দাঁড়ায়নি যে সাধারণ মানুষ শেষ আশ্রয়ের জন্য সেখানে ছুটে যাবে। এমন বাস্তবতায় জনমনে বিভ্রান্তি বাড়তে পারে। তাতে ক্রমে অশান্ত হবে রাজনৈতিক অঙ্গন। আমরা আমাদের রাজনৈতিক ভাগ্যবিধাতাদের অনুরোধ করব এই বাস্তবতা গভীরভাবে অনুভব করতে। আপনারা সমস্ত বদ্ধবুদ্ধি অতিক্রম করে, সমস্ত অচলায়তন ভেঙে একবার দলীয়, পারিবারিক ও ব্যক্তি স্বার্থভাবনা কমিয়ে গণতান্ত্রিক হওয়ার চেষ্টা করুন। সাধারণ মানুষের স্বার্থরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক মূল্য দিন। এ দেশের সাধারণ মানুষ অকৃতজ্ঞ নয়। ঋণ পরিশোধ তারা করতে জানে।

আমরা আশা করব এই সত্যটি রাজনীতি অঙ্গনে সবাই অনুভব করবেন। তাই মানুষের প্রত্যাশা থাকবে নিয়মতান্ত্রিক পথেই নির্বাচনকে এগিয়ে নেবেন সবাই। নির্বাচনকে ঘিরে আজ আমাদের এই শুভ প্রত্যাশাটিই থাকবে।