logo
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
মাউথঅর্গান
টিভিপর্দায় শিল্পের রাগিণী
শুভাশীষ সিনহা

টিভিপর্দায় শিল্পের রাগিণী

একঘণ্টার টেলিভিশন-নাটক আমাদের ইলেকট্রনিক মিডিয়ার একটা উজ্জ্বল উদ্ভাবন। খুব অল্প বাজেটে তৈরি এসব নাটক নির্মাণের গুণে শর্টফিল্মের মর্যাদা পেতে পারে বৈকি। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘স্পার্টাকাস ৭১’, নূরুল আলম আতিকের ‘তৃতীয় মাত্রা’, মেজবাউর রহমান সুমনের ‘একদা আঙুরলতা নন্দকে ভালোবেসেছিল’, মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের ‘গ্রে স্কেল’সহ অসংখ্য ফিকশন বিষয় আর প্রকাশের ব্যাপ্তিতে ছাড়িয়ে গিয়েছে টেলিভিশনের ছোট্ট বাক্সটি, ছুঁতে চেয়েছে দৃশ্যের অপার ক্যানভাস।

আর্থিক লস খেয়েও তরুণ শিল্পপিপাসু নির্মাতারা এখনো তাদের মেধা, শ্রম, প্যাশন দিয়ে আমাদের টিভিনাটকের এই ধারাটিকে শক্তিশালী করে রেখেছে। তরুণ নির্মাতাদের মধ্যে ইদানীং হাসান রেজাউল উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেছেন তার পরিচ্ছন্ন নির্মাণের গুণে, লোকেশনের নতুনত্বে, মূলত সাহিত্যভিত্তিক নাট্যনির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এরই মধ্যে সেলিম আল দীনের কাহিনী অবলম্বনে তার চুমকী, বিপরীত তমসায়, রবীন্দ্রনাথের ল্যাবরেটরি, হরিশংকর জলদাসের ‘এখন তুমি কেমন আছো’ ইত্যাদি নাটক আলোচনায় এসেছে।

গত ২২ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৫ মিনিটে এনটিভিতে প্রচারিত হলো শক্তিমান লেখক প্রয়াত সৈয়দ শামসুল হকের ‘একদিন অরণ্যে’ গল্প অবলম্বনে হাসানের ‘মাউথ অর্গান’ নাটকটি। আগের কাজগুলোর মতো এ নাটকের নির্মাণেও হাসান যথেষ্ট যতœশীল ছিলেন। সারা দুনিয়ায় অডিও ভিজুয়াল প্রোডাকশনের প্রথম শর্ত যে একটা ভার্জিন লোকেশন, এ নাটকেও তা পাওয়া গেছে। খুব সুন্দর এক নিবিড় অরণ্যে নাটকটির অধিকাংশ চিত্রায়ণ হয়েছে। ক্যামেরার মুভমেন্ট ছিল কনভেশনালি নিখুঁত। সুমন হোসেন ধন্যবাদ পাবেন। চরিত্র আর সংলাপ নির্ভর নাটক বলে অভিনেতার মুখের ওপরই বিভিন্ন তলে আর কোণে ফ্রেমিংয়ের চেষ্টা ছিল, যা গল্প আর চরিত্রের ভেতর দিয়ে জার্নি করতে চোখে আরাম দিয়েছে। আবহ সঙ্গীতে অমিতাভ মজুমদার অরণ্যের আবহটাকে নিয়ে আরেকটু খেলতে পারতেন।

গল্পটা এরকম : বাবার বন্ধু আনিসের সঙ্গে দূর নির্জনে বেড়াতে গেছে মিতু। এর মধ্যে দুজনের নানান গল্প, খুনসুটি হয়। মিতু আনিসকে আংকেল হিসেবেই দেখে, পছন্দও করে। কিন্তু আনিস অন্যভাবে নিজেকে ওর কাছে ট্রিট করাতে চান। একসময় তিনি বলেন, সে যেন তাকে ভাই বলে ডাকে। এক সময় এক রহস্যময় যুবকের আগমন ঘটে, যে মাউথ অর্গান বাজায়। সে তাদের দুজনের দিকে ক্রুদ্ধ, সন্দেহাত্মক চোখে তাকায়। আনিস যখন কোনো প্রয়োজনে একটু তফাতে যান, যুবক এসে মিতুকে বোঝানোর চেষ্টা করে, এভাবে বাবা-মাকে না জানিয়ে লোকটার সঙ্গে এমন জায়গায় বেড়াতে আসা ঠিক হয়নি। মেয়েটি প্রথমে পাত্তা দেয় না, কিন্তু একটা সময় যুবক লোকটির অবর্তমানে তাকে জোর গলায় বুঝিয়ে ফেলে যে লোকটি তার সর্বনাশ করানোর জন্যই এখানে নিয়ে এসেছে। মেয়েটিকে সে প্রমাণস্বরূপ পাশের বাংলোর দালাল শ্রেণির এক লোকের সঙ্গে তার কথাবার্তা শোনায়। মেয়েটি হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। যুবক তখন তার জীবনের এক গল্প শোনায়। তার প্রেমিকাও একদিন এরকম এক লোকের খপ্পরে পড়ে ‘সর্বনাশের’ শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে। সে মেয়েটিকে বাঁচাতে চায়। ওদিকে নারীলোভী আনিস মরিয়া হয়ে অরণ্যের ভেতর খুঁজতে থাকে মেয়েটিকে। যুবক-যুবতী যাত্রা করে প্রেমময় নতুন পথের সন্ধানে। অভিনয়ে মধ্যবয়সী আনিস চরিত্রে শহীদুজ্জামান সেলিম যথানুগ, ইরফান সাজ্জাদও ভালো, তবে রহস্যাবরণে ঢাকা একটা চরিত্রের মুখে খুব সাধারণ মানের সংলাপ পুরো আবহটাকে নষ্ট করে দিয়েছে, সংলাপে আরেকটু মুন্সিয়ানা নিতে পারতেন মনি হায়দার, তবে চিত্রনাট্য খারাপ হয়নি, সাবিলা নূরের এক্সপ্রেশনস মজার ছিল। সব মিলিয়ে ভালো লাগার মতো একটা নাটক। যারা দেখেননি, ইউটিউবে দেখে নিতে পারেন।