স্থবির সাঁতার অঙ্গন|112982|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
স্থবির সাঁতার অঙ্গন
ক্রীড়া প্রতিবেদক

স্থবির সাঁতার অঙ্গন

কথা ছিল গত ২২ অক্টোবর থেকে মিরপুরের জাতীয় সুইমিং কমপ্লেক্স মুখরিত হবে নানা জেলার শত শত সাঁতারুতে। ২০১৭-তে জাতীয় সাঁতার চ্যাম্পিয়নশিপ হয়নি। এক বছর বিরতির পর ফের আসরটি হওয়ার সম্ভাবনায় নিজেদের প্রস্তুতও করেছিলেন তারা। অথচ আসর শুরুর তিন দিন আগে বাংলাদেশ সাঁতার ফেডারেশন অনিবার্য কারণ দেখিয়ে স্থগিত করে দেয় এই আসর। ফলে টানা দুই বছর ঘরোয়া পর্যায়ে কোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া হলো না সাঁতারুদের। অতীতে সিনিয়র সাঁতারুদের আক্ষেপ ছিল বছরব্যাপী মাত্র একটি আসরে খেলার সুযোগ পাওয়া নিয়ে। অথচ ২০১৬ সালের পর আর হয়নি এই আসর। গত বছর সাঁতার ফেডারেশনের কর্মকা- সীমাবদ্ধ ছিল কেবল একটি জুনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মধ্যে। এ বছর সেই জুনিয়র আসরটিও হয়নি। এতে করে খেলাটির এখন জাদুঘরের শোকেসে ওঠার জোগাড়।

‘পাশের দেশগুলোর সাঁতারুরা দেশেই নিয়মিত খেলার সুযোগ পাচ্ছে। ভারত তো সবসময়ই এগিয়ে। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালদ্বীপেও অনেক টুর্নামেন্ট হয়। আমাদের মাত্র একটাই টুর্নামেন্ট। সেটাও যদি না হয় তবে নিজেদের মান যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না।’ এভাবেই আক্ষেপ ঝরল ২০১৬ এসএ গেমসে জোড়া স্বর্ণপদকজয়ী সাঁতারু মাহফুজা খাতুন শীলার কণ্ঠে। সম্প্রতি জাতীয় দলে আর খেলবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর হয়ে এবারের সিনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার। কিন্তু সেই ইচ্ছেটা অপূর্ণই রইল শীলার, ‘একটা জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হয় কমপক্ষে দুই-তিন মাস আগে থেকে। এই প্রস্তুতিতে আর্থিক বিষয়টাও জড়িত। শুধু তো পুলে সাঁতরালে চলে না, নিউট্রিশনটাও তখন জরুরি হয়ে পড়ে। এবারও আমরা প্রস্তুতি নিয়েছিলাম খেলার জন্য। কিন্তু কী কারণে ফেডারেশন এটা স্থগিত করল বলতে পারব না।’ ২০১৬ এসএ গেমসে ৫টি ব্রোঞ্জপদক জেতা সাঁতারু মাহফিজুর রহমান সাগরও হতাশ খেলতে না পারায়- ‘ঘরোয়া পর্যায়ে নিজেদের মান যাচাইয়ের একমাত্র সুযোগ জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপ। অথচ গত দুই বছর ধরে এটা হচ্ছে না। এর ফলে খেলার সুযোগ যেমন কমে যাচ্ছে তেমনি নতুনরাও উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে।’

কুষ্টিয়ার আমলায় তৃণমূলের সাঁতারুদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছেন কোচ আমিরুল ইসলাম। ছিলেন বিগত কমিটির সদস্যও। এবার সিনিয়রের মতো জুনিয়র আসরটিও না হওয়ায় হতাশ তিনিও, ‘আমরা প্রতিদিন ১৪০ জনের মতো ছেলেমেয়েকে নিয়মিত অনুশীলন করাই কুষ্টিয়ায়। অনেকেই এসে প্রশ্ন করে কবে তারা জাতীয় পর্যায়ে খেলার সুযোগ পাবে। কোনো জবাব দিতে পারি না। ট্রেনিংয়ে যতই টাইমিং হোক প্রতিযোগিতার টাইমিংটাই আসল। সেখানেই নিজের মানটা বোঝা যায়। ফেডারেশন গত প্রায় দুই বছর ধরে ট্যালেন্ট হান্ট থেকে বাছাইকৃত ছেলেমেয়েদের নিয়মিত ট্রেনিং করাচ্ছে। এটা খুবই ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এরাও তো নিজেদের যাচাই করার সুযোগ পাচ্ছে না জাতীয় জুনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ না হওয়ায়।’

সাবেক সাঁতারু লায়লা নূর সম্প্রতি এশিয়ান গেমসের জাজের দায়িত্ব পালন করে এসেছেন। সেখানেই ভারতীয় সাঁতারুদের ফাইনালে চীনের সাঁতারুদের সঙ্গে সমান্তরালে লড়তে দেখেছেন। এসব দেখে বুকের ভেতর জমে হাহাকার। ‘একটা সময় আমরা ভারতীয়দের সঙ্গে সমান্তরালে লড়তাম। কিন্তু এখন ভারতীয়রা যেভাবে এগিয়ে গেছে তাদের ছোঁয়া আর সম্ভব নয়। শুধু ভারত নয়, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ এমনকি নেপালও সুষ্ঠু পরিকল্পনা হাতে নিয়ে অনেক এগিয়ে গেছে। একজন সাবেক সাঁতারু হিসেবে কষ্ট পাই যখন দেখি এই ফেডারেশন একটিমাত্র আসর আয়োজন করতেও ব্যর্থ হয়। এবার তো তারা জুনিয়রও করতে পারেনি।’

জানতে চাইলে ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক এমবি সাইফ নিজেও সিনিয়র চ্যাম্পিয়নশিপ পিছিয়ে দেওয়ার কারণটা বলতে পারলেন না, ‘আমাদের সব প্রস্তুতিই ছিল। কিন্তু সভাপতি মহোদয় বললেন এটা এখন করা যাবে না। তাই স্থগিত করে দিয়েছি। আমাদের ইচ্ছে আছে আগামী বছর মার্চে এটা আয়োজন করার। তাছাড়া একটা জুনিয়র করতে ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়। সিনিয়র করতেও প্রায় ২০ লাখ টাকা লাগে। এত টাকা তো ফেডারেশনের পক্ষে একা বহন করা সম্ভব নয়।’

নানা অজুহাতে বছরে একমাত্র আসরটিও করতে পারেনি এই ফেডারেশন। এক সময়ে সোনাফলা এই খেলাটি নিয়ে এখন আশাবাদীর সংখ্যা নেই বললেই চলে।