নির্বাচনে বিদেশিদের ততটা প্রভাব আছে বলে মনে হয় না|113038|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:০৬
নির্বাচনে বিদেশিদের ততটা প্রভাব আছে বলে মনে হয় না
ইমতিয়াজ আহমেদ

নির্বাচনে বিদেশিদের ততটা প্রভাব আছে বলে মনে হয় না

বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রভাব নিয়ে যতটা আমরা কথা বলি, ততটা প্রভাব আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোসহ অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু অংশীদার রয়েছেন।– বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক এবং সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক ইমতিয়াজ আহমেদ। সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধের বিচার, রোহিঙ্গা শরণার্থী ও অন্যান্য প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আহমেদ মুনীরুদ্দিন

দেশ রূপান্তর : নির্বাচনের আগে সব সময়ই আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে শুনি। এবারের নির্বাচনে এ প্রসঙ্গটি আপনি কীভাবে দেখছেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ : বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রভাব নিয়ে যতটা আমরা কথা বলি, ততটা প্রভাব আছে বলে আমার মনে হয় না। কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় রাজনৈতিক দলগুলোসহ অভ্যন্তরীণ বেশ কিছু অংশীদার রয়েছেন। সেটা ব্যবসায়ী মহল থেকে শুরু করে নিরাপত্তার বিষয়টি যারা দেখেন, সামরিক বাহিনীসহ নির্বাচনের কাঠামোটা যারা মিলে তৈরি করেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না এই বিষয়গুলো এসব স্থানীয় অংশীদারদের দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তবে জনগণই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কেন না শেষ পর্যন্ত জনগণের ভোটের মধ্য দিয়েই বিষয়টির ফয়সালা হয়।

বাংলাদেশের জনগণ কিন্তু যথেষ্ট সচেতন। খেয়াল করা দরকার, দেশে বড় দুটি রাজনৈতিক দল বা জোটের ভোট কিন্তু ‘ব্লক ভোট’ বা নির্ধারিত, সেটা হয়তো দুই পক্ষ মিলিয়ে প্রায় ৬০ ভাগের মতো। দল বা জোটের যত সমালোচনাই হোক, এই ভোটাররা অন্য কোথাও ভোট দেবেন না বা দলীয় আনুগত্যের বাইরে যাবেন না। সেটা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের তিরিশ-পঁয়তিরিশ শতাংশ বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বা তাদের জোটের পঁচিশ-তিরিশ শতাংশ যাই হোক। আসলে ফলাফল আসে এই দুটো নির্ধারিত অংশের বাইরে থাকা ভোটারদের কাছ থেকে। এবারের নির্বাচনে হয়তো নতুন ভোটাররা, যারা এবারই প্রথম ভোট দেবেন তারা হয়তো সেই নির্ধারণী শক্তি হয়ে উঠতে পারেন।

দেশ রূপান্তর : যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অব্যাহত রাখার প্রসঙ্গটি আওয়ামী লীগের ইশতেহারে আছে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ইশতেহারে না রাখলেও বিচার চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সমর্থনের কথা জানিয়েছে।  কিন্তু এ বিষয় বিএনপির নীরব থাকার কারণ কী বলে মনে করেন?
ইমতিয়াজ আহমেদ : প্রথমত, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে যেটা মাথায় রাখতে হবে সেটা হলো এই বিচারের একটা কেন্দ্রীয় জায়গা রয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীসহ সেখানকার যুদ্ধাপরাধীরা। সেটা যতদিন না হয় তার আগে আমরা বলতে পারি আপাতত আমাদের এখানে যে বিচার প্রক্রিয়া চলছে সেখানে কিন্তু আমরা কোলাবোরেটর্স বা স্থানীয় সহায়তাকারীদের বিচারটা করেছি বা করছি। সেখানে স্থানীয় বড় বড় যুদ্ধাপরাধী বা শীর্ষ অপরাধীদের হয়তো বেশির ভাগেরই বিচার হয়ে গেছে বা শাস্তি হচ্ছে। এই বিচারের প্রতিশ্রুতি আওয়ামী লীগ দশ বছর আগে দিয়েছিল তাদের ইশতেহারে এবং সেটার বাস্তবায়ন হয়েছে। কাজেই এটা এবারের নির্বাচনে আর সেই রকম কোনো ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে বলে মনে হয় না।

দ্বিতীয়ত, একটা কারণ হতে পারে যে বিএনপি হয়তো ভেবেছে, যে গোষ্ঠীর ভোট তারা চান, এই বিষয়ে নীরব থাকলে তারা হয়তো সেই ভোটগুলো পাবেন। আরেকটা হতে পারে যে, তারা ভাবছে বড় আকারে যেহেতু বিচারের কাজটা হয়ে গেছে ফলে এখন এই প্রসঙ্গ না আনাই ভালো। কেন না যারা বিচারের প্রক্রিয়াটা নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না বা অন্য পক্ষে ছিলেন তাদের ভোট হয়তো তারা পাবেন।

দেশ রূপান্তর : মধ্যপ্রাচ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রসঙ্গটি এখন কীভাবে দেখা হচ্ছে বলে মনে করেন। এ বিষয়ে সৌদি আরব ও তুরস্কের বর্তমান অবস্থাই বা কী?
ইমতিয়াজ আহমেদ : বিদেশিদের কথা যদি আমরা বলি, মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে তুরস্কের যথেষ্ট আপত্তি ছিল, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে একটা টেনশন ছিল। অনেকেই মনে করেন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে তুরস্কের একটা সম্পর্ক আছে, হয়তো মুসলিম ব্রাদারহুডের কারণে। সেই তুরস্কের সঙ্গেও দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় এই সরকারের সঙ্গে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে। আর সৌদি আরবের সঙ্গেও বাংলাদেশ সরকারের একটা সুসম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৌদি আরব সফর করলেন। ফলে দশ বছর আগে যুদ্ধাপরাধের ইস্যুটা নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যে পরিস্থিতি ছিল এখন তা নেই।

আর সাধারণভাবে যদি বলি, আন্তর্জাতিক মহলের বাংলাদেশ নিয়ে এখন যে মনোযোগ সেখানে দুটো বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মনে হয়। এক. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অব্যাহত থাকবে কি না, কারণ এখানে তাদের বিনিয়োগ আছে, বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব আছে। দুই. হলো সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নটি, যেহেতু এখানে হলি আর্টিজানের মতো বড় ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়ে গেছে, যেহেতু এটা অনেক বড় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, ফলে সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে তারা নজর রাখতে চাইবে।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। এই নির্বাচনকে ঘিরে শরণার্থীদের প্রশ্নটি কি কোথাও গুরুত্ব পাচ্ছে?
ইমতিয়াজ আহমেদ : অনেকেই ভেবেছিল, বিদেশি মহলও ভেবেছিল যে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিষয়টি এই নির্বাচনের আগে একটি বড় বিষয় হয়ে থাকবে। এমনকি বর্তমান সরকারও হয়তো এমনটা ভেবেছিল, যে কারণে তড়িঘড়ি করে কিছু রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠানোর একটা প্রক্রিয়ার মধ্যেও তারা যাচ্ছিল। কিন্তু খুবই লক্ষ করবার মতো বিষয় হলো, এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে একটা ঐকমত্য বাংলাদেশে আছে এখনো পর্যন্ত। এর একটা কারণ হতে পারে, আমাদের একাত্তরের সামষ্টিক স্মৃতি, আমরা নিজেরাও প্রায় এক কোটি শরণার্থী হয়ে এই দেশটা স্বাধীন করেছিলাম। আরেকটা হতে পারে যে, যেহেতু রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই মুসলিম।

যে কারণেই হোক বাংলাদেশ এ বিষয়ে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। ভারতে যেমন আমরা দেখি যে, বিজেপি বলছে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দাও, কংগ্রেসের অনেকেই বলছে  ওদের আশ্রয় দিতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে কিন্তু ডান-বাম বা সব দলই এই বিষয়ে একমত। হয়তো এই সাধারণ ঐকমত্যের কারণেই এটা নির্বাচনী ইশতেহারেও তেমনভাবে নেই। আবার ইউরোপেও কিন্তু শরণার্থীরা একটা বড় নির্বাচনী ইস্যু হিসেবে থাকে। শরণার্থীদের প্রশ্নেই কিন্তু সেখানে ডানপন্থিরা সামনে চলে আসছে।

দেশ রূপান্তর : রোহিঙ্গা শরণার্থী বিষয়ে আরেকটি কথা আমরা প্রায়ই শুনি যে, তাদের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টিকে কীভাবে বিবেচনা করেন আপনি?
ইমতিয়াজ আহমেদ : সত্তরের দশকে এবং নব্বই দশকেও কিন্তু রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে বড় আকারে এসেছে। কিন্তু তখনো আমরা দেখিনি যে রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। তখন বা এখনো কিন্তু আমরা এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ পাইনি যে, আমরা বলতে পারব রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসবাদে যুক্ত। আরেকটা বিষয় বুঝতে হবে যে, রোহিঙ্গারা কিন্তু একটি পরিবারকেন্দ্রিক সম্প্রদায়, অনেক সন্তান এবং পরিবার পরিজন নিয়ে তারা এখানে এসেছে। তারা এমনভাবে ছিন্নমূল না যে, খালি তরুণ-যুবারাই এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে, ফলে তাদের এই পরিবার কেন্দ্রিকতাও একটা নজর দেওয়ার মতো বিষয়। ফলে কোনো তথ্য-প্রমাণ ছাড়া রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাস-সংশ্লিষ্টতা নিয়ে কথা বলার অর্থ হবে, তাদের বিষয়ে মিয়ানমারের অভিযোগকে সমর্থন করা, কেন না মিয়ানমার তো বলেই আসছে যে রোহিঙ্গারা সন্ত্রাসী। সে জন্য আমাদেরও সচেতন হওয়া দরকার।

এখানে খেয়াল রাখা দরকার যে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সংখ্যায় ভুটানের জনগণের চেয়েও বেশি। ভুটানের জনসংখ্যা আট লাখের কম। এখানে আছে ১১ লাখের মতো। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে আস্ত একটা ভুটান বাংলাদেশের ভেতরে জন্ম নিয়েছে। এত বড় একটা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দেওয়ার পরও সেখানে কিন্তু আমরা তেমন কোনো বিশৃঙ্খলা দেখিনি। এমনকি পুরো বাংলাদেশেও এর তেমন কোনো প্রভাব আমরা দেখছি না। ইউরোপে এর চেয়ে অনেক কম শরণার্থী নিয়েও বহু দেশের রাজনীতি টালমাটাল পরিস্থিতি তৈরি হতে দেখেছি আমরা। ফলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যারা সেখানে সফর করেছেন, সবাই এটা বলতে বাধ্য হয়েছেন, যে বাংলাদেশকে প্রশংসা না করে কোনো উপায় নেই।

দেশ রূপান্তর : রোহিঙ্গা প্রশ্নে দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি ভারত এবং চীনের ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন? ঢাকার সঙ্গে দিল্লি এবং বেইজিংয়ের সম্পর্কে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কী প্রভাব ফেলছে?
ইমতিয়াজ আহমেদ : এটা মাথায় রাখতে হবে যে, চীন একটা শীর্ষ বিনিয়োগকারী দেশ। স্বাভাবিকভাবেই সে চাইবে না যে দেশে সে বিনিয়োগ করছে সেখানে গণহত্যার ঘটনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহল কথা বলবে, প্রশ্ন তুলবে। সে হিসাবে আমরা দেখলাম যে, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বাংলাদেশে আসলেন তখন তিনি বললেন যে, তিনটি ধাপে আমরা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান দেখতে চাই।

প্রথমত. রাখাইন রাজ্যে যে সংঘাত চলছে সেটা থামাতে হবে, দ্বিতীয়ত পর্যায়ক্রমে শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন হতে হবে এবং তৃতীয়ত রুট কজ বা সমস্যার উৎসমূলে গিয়ে এটা সমাধান করতে হবে। এখানে উৎসটা কিন্তু ওই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রহীনতা, মানে মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া। তার মানে, চীন মিয়ানমারকে এই বার্তা দিচ্ছে যে, তোমাদের আজ হোক কাল হোক এই সমস্যা সমাধান করতেই হবে। এ ক্ষেত্রে বলতেই হবে যে, বেইজিং কিন্তু দিল্লির চেয়ে অনেক স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে।

দ্বিতীয় আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে একটা পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। আগে সাধারণভাবে যেটা ছিল যে, দিল্লির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক বেশি, বিএনপির সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক বেশি। কিন্তু বর্তমান সরকার বিশেষত প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে বেইজিংয়ের সঙ্গে একটা সম্পর্কোন্নয়ন হয়েছে।

তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির সঙ্গে বিষয়টা ঝুলে আছে। ফলে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, তুমি আমার যতটা কাছের বলো, ততটা তো তুমি না। আরেকটা বিষয় হলো, বিনিয়োগ সক্ষমতার প্রশ্নে বেইজিং এখন দিল্লি এমনকি ওয়াশিংটনের চেয়েও অনেক বেশি এগিয়ে। ফলে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের প্রশ্নে চীনকে গুরুত্ব না দিয়ে আমাদের উপায় নেই। ফলে এটা বলা যায় এখন অবস্থাটা এমন হয়েছে যে, যেই সরকারই আসুক তাকে চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেই এগুতে হবে।

দেশ রূপান্তর : চীনের সঙ্গে এশিয়ান হাইওয়েতে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়া নিয়ে ভারতের প্রবল আপত্তি ছিল। কিন্তু দিল্লির আপত্তি উপেক্ষা করেই ঢাকা এতে যুক্ত হয়েছে। এটা ঢাকা-দিল্লি বা দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলছে কি?
ইমতিয়াজ আহমেদ : একটা কথা মনে রাখতে হবে, ভারতের এক নম্বর বাণিজ্য অংশীদার এখন চীন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশ মিলিয়ে হয়তো আরেকটু বড় হতে পারে কিন্তু একক দেশ হিসেবে খোদ ভারতেরই সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার চীন। দ্বিতীয়ত, সাংহাই কো-অপারেশনে চীনের সঙ্গে ভারত-পাকিস্তানও আছে, তারা একটার পর একটা সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে। তৃতীয়ত ২০১৮ সালেই প্রথমবারের মতো, ভারতের ছাত্রছাত্রীরা ব্রিটেনের চেয়ে বেশি সংখ্যায় চীনে পড়তে গিয়েছে। তার মানে এখানে একটা পরিবর্তন ঘটছে। এ সবই চীন-ভারত সম্পর্কের একটা নতুন মাত্রা নির্দেশ করছে।

সে জায়গায় চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশের তো পিছিয়ে থাকার কোনো কারণ নেই। ভারত-চীনের যেমন সংঘাত ছিল বা আছে, আমাদের তো তেমন কিছু নেই। আর এটা ভারতও বুঝতে পারছে বাংলাদেশের বড় রকমের উন্নয়ন দরকার এবং চীনের অংশগ্রহণ ছাড়া এটা সম্ভব নয়, ফলে তারাও এই বিষয়টি অনুধাবন করছে।

দেশ রূপান্তর : আপনি এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর জোনোসাইড স্টাডিজের পরিচালক। শুরুর দিকে আপনি বলছিলেন, যুদ্ধাপরাদের বিচারের একটা কেন্দ্রীয় জায়গায় রয়েছে পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ কীভাবে এগুতে পারে বলে মনে করেন।
ইমতিয়াজ আহমেদ : এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি যেটা প্রয়োজন সেটা হচ্ছে গবেষণা। আমাদের তথ্য-প্রমাণ আছে প্রচুর, কিন্তু সেগুলো উপস্থাপনের জন্য যে ধরনের গবেষণা প্রয়োজন তা এখনো নেই। আমাদের এই কেন্দ্রটিও হয়েছে মাত্র চার পাঁচ বছর, সবগুলো বিশ্ববিদ্যালয়েও এটা নেই। আমরা আশা করব সব জায়গাতেই এমন কেন্দ্র হবে। এমন কিছু যদি চল্লিশ বছর আগে হতো তাহলে হয়তো আমরা এখন একটা পর্যায়ে থাকতাম। কিন্তু আমাদের করণীয় অনেক।

একাত্তরের গণহত্যা এবং যুদ্ধাপরাধে পাকিস্তানের সংশ্লিষ্টদের বিচারের বিষয়ে আমাদের একটা পদ্ধতি ধরে এগুতে হবে। আমরা কি তাদের সঙ্গে কথা বলে একটা সম্পর্ক তৈরি করে সেটা অর্জন করব, না কি তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক না রেখে তাকে বর্জন করে সেটা পাব তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে পড়ালেখায় থাকার কারণে বলতে পারি কূটনীতিতে সম্পর্ক রাখার মাধ্যমে অনেক কিছু পাওয়া যায়, ‘সম্পর্ক না রাখার’ মাধ্যমে না।

পাকিস্তানের জনগণের একটা অংশ তারা সংখ্যায় ছোট হলেও মনে করেন যে, একাত্তরে বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো হয়েছে। ফাইয়াজ আহমেদ ফাইয়াজের মতো কবিরা ছিলেন, তারা কবিতা লিখেছেন, বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলেছেন। এখন সেখানকার নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা আছে।

তাদের বাংলাদেশ এনে দেখাতে হবে আমাদের এখানে মুক্তিযুদ্ধে কী ঘটেছিল। এভাবে নাগরিকদের মধ্যে একাত্তরের গণহত্যার বিষয়ে একটা সচেতনতা তৈরি করতে হবে। রাজনীতিকদের চাপ দেওয়ার কূটনীতির পাশাপাশি পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের জনগণের সঙ্গে এই কূটনীতি চালিয়ে যেতে হবে আমাদের।