যুবক, ডেসটিনির অর্ধকোটি গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে|113205|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
যুবক, ডেসটিনির অর্ধকোটি গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে
রায়ান বণিক

যুবক, ডেসটিনির অর্ধকোটি গ্রাহকের দীর্ঘশ্বাস বাড়ছে

পুঁজি ও কর্ম হারিয়ে দিশেহারা ডেসটিনি ও যুবক-এর প্রায় ৫০ লাখ গ্রাহক পরিবেশকের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। ছয় বছর ধরে কর্মহীন ডেসটিনি গ্রুপের প্রায় ৪৫ লাখ পরিবেশক। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে কর্ম হারানো যুবকের তিন লাখ গ্রাহকের অর্থ ফেরত দেওয়ারও কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। পুঁজি ও কর্ম হারিয়ে দিশেহারা দুই প্রতিষ্ঠানের ৪৮ লাখ গ্রাহক-পরিবেশকের হতাশা আরো বাড়ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, যুবকের গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য গঠিত কমিশন যুবকের সব সম্পত্তি সরকারের হেফাজতে নিয়ে তা বিক্রির মাধ্যমে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ডেসটিনির গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া কিংবা গ্রাহকদের মধ্যে কার কত টাকা প্রতিষ্ঠানটিতে বিনিয়োগ রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হিসাব-নিকাশই করা হয়নি সরকারের তরফ থেকে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, যুবক কমিশনের কাছ থেকে ২০১৩ সালে সুপারিশ পাওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়। তাতে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ওই দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। আর ডেসটিনির গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়া, না দেওয়ার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘যেহেতু প্রতিষ্ঠান দুটি কোম্পানি আইনে নিবন্ধিত, তাই গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় রাজি না হলে এ ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের করার কিছু নেই।’

এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব জানান, ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় অবৈধ ব্যাংকিংয়ের অভিযোগে কোম্পানি দুটির কার্যক্রম বন্ধ হয়েছে। তাই বিষয়টি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত নয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ১২ বছর আগে বন্ধ হওয়া যুবক এরই মধ্যে অনেক সম্পত্তি বিক্রি করে অর্থ সরিয়েছে। তিন লাখ গ্রাহকের পাওনা পরিশোধের মতো সম্পদ তাদের নেই। তাই এ পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব নেওয়া সম্ভব নয়। আর ডেসটিনি গ্রুপের সম্পদ ও গ্রাহকসংখ্যা অনেক বেশি। এত বড় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা ও ৪৫ লাখ গ্রাহকের পাওনা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা এ মন্ত্রণালয়ের নেই। সে কারণেই গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের দায়িত্ব নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব দেওয়ার পর বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তাতে সম্মতি দেয়নি।

২০১২ সালের জুলাই মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন ডেসটিনি গ্রুপের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মামলা করার পর থেকে গ্রুপটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তখন থেকেই আয়ের পথ বন্ধ হয় গ্রুপটির প্রায় ৪৫ লাখ পরিবেশকের। তাদের দীর্ঘদিনের সঞ্চয়ও আটকে আছে গ্রুপটিতে। মুনাফা কিংবা আসল, কোনোটিই পাচ্ছেন না তখন থেকে।

একই অবস্থা যুব কর্মসংস্থান সোসাইটি-যুবকের গ্রাহকদের ক্ষেত্রেও। তারা সংখ্যায় তিন লাখের বেশি। ২০০৬ সালে অবৈধ ব্যাংকিংয়ের অভিযোগে কার্যক্রম বন্ধ হয় প্রতিষ্ঠানটির। তারপর থেকে যুবকের সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে বেশ কয়েকটি কমিটি ও কমিশন গঠন করে এক যুগ পার করেছে সরকার। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি।

ডেসটিনি ও যুবকের গ্রাহকদের টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু, গত সপ্তাহে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কোনো জবাব দেননি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার থেকে কোম্পানিগুলোর সম্পদ চিহ্নিত করে অন্ততপক্ষে ব্যবসাগুলো যাতে চালু রাখা যায়, সে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। প্রয়োজনে প্রশাসক নিয়োগ দিয়েও কোম্পানিগুলো চালানো যেত। আমানতকারীদের একটি সময়সীমা দিয়ে ধীরে ধীরে টাকাগুলোও ফেরত দেওয়া যেত। সরকার উদ্যোগী হলে গ্রাহকদের টাকা ফেরত দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

ডেসটিনির পরিবেশক মোশাররফ হোসাইন বলেন, ডেসটিনি বন্ধ হওয়ার পর হঠাৎ কর্ম হারিয়ে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে কূল-কিনারা হারিয়েছেন ৪৫ লাখ পরিবেশক ও গ্রাহক। প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে বিপুলসংখ্যক মানুষকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও কোম্পানি চালু করে গ্রাহকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার বিষয়ে কোনো কিছুর উল্লেখ নেই।

২০১৬ সালে আদালতে জমা দেওয়া ডেসটিনি গ্রুপের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালের মে পর্যন্ত ডেসটিনি ২০০০, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি (ডিএমসিএসএল) ও ডেসটিনি ট্রি প্লান্টেশনের (ডিটিপিএল) মোট আয় ৫ হাজার ১২১ কোটি টাকা। এই অর্থ থেকে মোট ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ১০৫ কোটি টাকা। এ তিনটি কোম্পানির মোট জমির পরিমাণ ৯৬৮ একর, ঢাকা শহরে অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে ৭৪০৫৮ বর্গফুট। এ ছাড়া বাণিজ্যিক অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে ২৪৫৪৭ বর্গফুট। ডেসটিনি গ্রুপের মোট সম্পদের মূল্য ৯৬৬৫ কোটি টাকা। জব্দ থাকা ডেসটিনি গ্রুপের ৫৩৩টি ব্যাংক হিসাবে আছে প্রায় দেড়শো কোটি টাকা।

অন্যদিকে বন্ধ করার আগে ২০০৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য যুবককে নির্দেশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে সময়সীমা ২০০৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। তারপর থেকে গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সরকার থেকে আর কোনো সময়সীমা দেওয়া হয়নি। ফলে আদৌ কোনো দিন টাকা ফেরত পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে যুবকের গ্রাহকদের মধ্যে।

যুবকের গ্রাহকদের সংগঠন ‘যুবকে ক্ষতিগ্রস্ত জনকল্যাণ সোসাইটি’র সাধারণ সম্পাদক মাহমুদ হোসেন মুকুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা শেষ হয়ে গেছি। এক যুগ কেটে গেছে, তবুও সরকার থেকে আমাদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।’

সরকার গঠিত ‘যুবক কমিশন’ ২০১৩ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়ে জানায় যে, যুবকের গ্রাহক সংখ্যা ৩ লাখ ৩ হাজার ৭৩৯। তাদের পাওনা টাকার পরিমাণ ২ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা। যুবকের ব্যাংক হিসাবগুলোতে টাকা আছে মোটে ৭৮ লাখ ৬৪ হাজার।