ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে মাও সে তুং|113232|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:৫৩
ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে মাও সে তুং

ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনে মাও সে তুং

ফরাসি ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন সাম্প্রতিক রাজনীতিতে একটি সমস্যা তৈরি করেছে। এটি খুবই জনপ্রিয় মতামতের অভিমুখী এবং এখানে উদ্ভাবনী ও স্বচ্ছ চিন্তার ঘাটতি রয়েছে। এখন বহুমুখী সামাজিক সংগ্রাম সংবলিত একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্যে আমরা বাস করছি। উদারনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং নতুন জনতুষ্টির মধ্যে একধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। পাশাপাশি বাস্তুসংস্থান সংক্রান্ত সংগ্রাম, নারীবাদ এবং যৌন স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন, জাতিগত ও ধর্মীয় লড়াই এবং বৈশ্বিক মানবাধিকারের আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়গুলোও রয়েছে। এ সবের একটিই চূড়ান্ত অভিমুখ, আমাদের জীবনের ওপর যে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ আরোপ হচ্ছে তাকে প্রতিরোধ করা। সুতরাং, এদের মধ্যে যে কোনো একটিকে প্রাধান্য না দিয়ে সব সংগ্রামকে একসূত্রে কীভাবে বাঁধা যায়? কেননা এই ভারসাম্য সকল সংগ্রামের মূল মন্ত্রকে উপলব্ধি করতে সহায়তা করবে।

অর্ধশতক আগে যখন মাওবাদী আন্দোলনের স্রোত শক্তিশালী ছিল, তখন মাও সে তুং-এর প্রধান এবং অপ্রধান দ্বন্দ্বের মধ্যে পার্থক্যের যে তত্ত্ব (মাও এর ১৯৩৭ সালে লেখা ‘দ্বন্দ্ব প্রসঙ্গে’ পুস্তকে উল্লেখিত) তা রাজনৈতিক বিতর্কের ক্ষেত্রে খুবই প্রচলিত ছিল। এখনো মানবজীবনের গতিপ্রকৃতিকে ব্যাখ্যা করার জন্য এই পার্থক্যের তত্ত্ব খুবই প্রাসঙ্গিক। আমরা একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে শুরু করতে পারি: মেসোডনিয়ার নাম কী হবে? বেশ কয়েক মাস আগে মেসোডনিয়া এবং গ্রিসের সরকার একটি চুক্তিতে উপনীত হয় যে মেসোডনিয়া নামের সমাধান করতে হবে। তারা নাম পরিবর্তন করে রাখে ‘উত্তর মেসোডনিয়া’। এই সমাধান তখনই দুই দেশের কট্টরপন্থীদের পক্ষ থেকে বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। গ্রিক বিরোধিতাকারীরা বলেন যে, মেসোডনিয়া নামটি পুরাতন গ্রিক নাম। আর মেসোডনিয়ার বিরোধিতাকারীরা দেশটির নামের সঙ্গে উত্তর যুক্ত করায় নিজেদের অসম্মানিত বোধ করেন। এই নামকরণের দ্বন্দ্বের বাইরে আরেকটি দ্বন্দ্ব রয়েছেÑ বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে লড়াই (একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ এবং অন্যদিকে রাশিয়া)। পশ্চিমারা এই সমঝোতাকে মেনে নিয়ে ইইউ এবং ন্যাটোতে যোগদানের জন্য চাপ সৃষ্টি করে এবং অন্যদিকে রাশিয়া এর বিরোধিতা করে। রাশিয়া দুদেশের সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন দেয়।

সুতরাং, আমরা কোন পক্ষ নেব? আমি চিন্তা করি, এই সমস্যার একমাত্র বাস্তবসম্মত সমাধান হলো আমাদের সমঝোতার পক্ষালম্বন করতে হবে। রাশিয়া কেবলমাত্র ভূ-রাজনৈতিক কারণে এর বিরোধিতা করছে। তাই রাশিয়াকে সমর্থন করার অর্থ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে মেসোডনিয়া এবং গ্রিসের সম্পর্কের মধ্যে যে সমস্যা চলছে তার যৌক্তিক সমাধানকে এড়িয়ে যাওয়া। এখন মেং ওয়াংঝুর গ্রেপ্তার নিয়ে আলোচনা করা যাক। তিনি হুয়াওয়ের প্রধান আর্থিক ব্যবস্থাপক এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতার কন্যা। তিনি ভ্যানকুভারে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তিনি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে তা লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন। প্রকৃত অর্থে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রোষের শিকার হয়েছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তার ৩০ বছরের কারাদ- হতে পারে। এখানে সত্যটা কী? সব বহুজাতিকই আইন ভঙ্গ করে। কিন্তু এটি আসলে অপ্রধান দ্বন্দ্ব এবং এখানে আরেকটি দ্বন্দ্বাত্মক লড়াই বিদ্যমান আছে। এটি কেবলমাত্র ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের ব্যাপার নয়, মূলত তা ডিজিটাল হার্ডওয়্যার এবং সফটওয়্যারের ওপর নিয়ন্ত্রণের বড় লড়াই। হুয়াওয়ে চীনকে এমনভাবে উপস্থাপন করছে যাতে দেশটি শুধুমাত্র আর ফক্সকনের চীন হিসেবে পরিচিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। অর্থাৎ সে শুধু আর আধা-দাসত্বের শ্রমভিত্তিক যন্ত্রশিল্প উৎপাদনের দেশ নয়, বরং এমন একটা দেশ যেখানে সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারও বিপুলমাত্রায় প্রস্তুত হয়ে থাকে। চীন এখন সনির জাপান কিংবা স্যামসাং-এর দক্ষিণ কোরিয়ার চাইতে বড় বাজারের প্রতিনিধিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বৈশ্বিক মানবাধিকারের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি আরো জটিল হয়ে উঠেছে। আমরা এক্ষেত্রে যারা এই অধিকারের ধারক-বাহক এবং যারা একে হুমকিতে ফেলছে তাদের মধ্যে একধরনের দ্বন্দ্ব খুঁজে পাওয়া যায়। বৈশ্বিক মানবাধিকার প্রকৃত অর্থে পশ্চিমা মূল্যবোধকে প্রাধান্য দেয় এবং ফ্যাসিবাদী কায়দায় সে মতাদর্শ গ্রহণ করে। এখানে ডানপন্থি জনতুষ্টিমূলক চরিত্র শ্রেণিসংগ্রামকে নিষ্প্রভ করে সামাজিক ক্ষমতাকাঠামোর চরমপন্থাকে সমন্বয় করে।

বিপরীত দিকে, রাজনৈতিকভাবে সঠিক বর্ণবাদবিরোধিতা এবং যৌন নিপীড়নবিরোধিতার সংগ্রাম তার চূড়ান্ত লক্ষ্য যে সাদা চামড়ার বর্ণবাদ এবং যৌনতাবাদ তা আড়াল করতে চায়। তারা শ্রেণিসংগ্রামকেও নিরপেক্ষ করে। এজন্য ‘সাংস্কৃতিক মার্কসবাদ’-এর রাজনৈতিক সঠিকতার যে সংজ্ঞা রয়েছে তা ভ্রান্ত। ছদ্ম-প্রগতির মধ্যে যে তথাকথিত রাজনৈতিক সঠিকতা রয়েছে তাকে অবলম্বন করে বুর্জোয়াদের উদারতাবাদ মার্কসবাদের বিরুদ্ধে শেষ প্রতিরোধ তৈরি করে, শ্রেণিসংগ্রামকে প্রধান দ্বন্দ্বের জায়গা থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে। তৃতীয়লিঙ্গ এবং মি টু আন্দোলনের ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। এগুলোও শ্রেণিসংগ্রামের মতো প্রধান দ্বন্দ্বকে আড়াল করে। এক দশক আগে তৈরি মি টু আন্দোলনের স্রষ্টা তারানা বার্কের মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সযতেœ চেষ্টা করছি মি টু আন্দোলনের যে জনপ্রিয় বয়ান আছে তার অভিমুখ ঘুরিয়ে দিতে। আমরা লিঙ্গযুদ্ধের বিশেষ করে পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে বয়ান আছে তাকে পরিবর্তন করে বলতে চাচ্ছি যে, এটি একটি নির্দিষ্ট ব্যক্তিবর্গের জন্যÑ সাদা, সমকামী, বিখ্যাত নারীদের জন্য।’

সাধারণ শ্রমজীবী নারী এবং গৃহবধূদের যে প্রাত্যহিক নিগ্রহতার শিকার হতে হয় সে দিকেই মি টু আন্দোলনের অভিমুখ হওয়া উচিত। উদাহরণ স্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়াতে মি টু আন্দোলনে হাজার হাজার সাধারণ নারী যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সমবেত হয়েছিলেন। ফ্রান্সের ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনেরও একই ধরনের অসংগতি আছে। বিশেষ করে তাদের যে নেতৃত্বহীন চরিত্র এবং স্ব-সংগঠনের ধারণা রয়েছে তা তাদের সীমাবদ্ধতারই বহিঃপ্রকাশ। এ ধরনের মুক্তির লক্ষ্যে যে প্রগতিশীল লড়াই রয়েছে তার সীমাবদ্ধতা হলো প্রধান দ্বন্দ্ব শ্রেণিসংগ্রামকে তারা আড়াল করতে চায়। প্রচলিত জনতুষ্টিমূলক কায়দায়, ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলন রাষ্ট্রের দিকে যে একগাদা দাবি নিয়ে আঘাত হানতে চাইছে তা মেটানোর সামর্থ্য বিদ্যমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার নেই। তাদের এমন কোনো নেতা নেই যে তাদের বিক্ষোভকে নতুন সমাজ রূপান্তরের দিকে অগ্রসর করবে। রাষ্ট্র এবং ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের দাবির মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে তা অপ্রধান। আমাদের যে সামগ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে সত্যিকার দ্বন্দ্ব রয়েছে এবং তার জন্য যে নতুন সমাজের অভ্যুদয় প্রয়োজন সেই দাবি কি বিক্ষোভকারীরা একবারও তুলেছে?

আরটি ডটকম থেকে
সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর : অনিন্দ্য আরিফ