তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন কবে হবে?|113323|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন কবে হবে?
উলুল অন্তর

তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন কবে হবে?

গণন্ত্রের সবচেয়ে আলোচিত সংজ্ঞা দিয়েছেন প্রয়াত মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনÑ জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা গঠিত, জনগণের সরকারই গণতন্ত্র। রাষ্ট্র পরিচালনায় সর্বসাধারণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে কেবল গণতন্ত্রে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর শোষণ-নিপীড়ন থেকে চিরস্থায়ী মুক্তি ও সাম্যের ভিত্তিতে এক অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়নে লাখো মানুষের প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা এলো, কিন্তু আজ আটচল্লিশ বছর পরও এ দেশের মানুষকে সেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করতে হচ্ছে।

ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিনিধি পছন্দ করার সুযোগ এ দেশের মানুষ খুব কম সময়ই পেয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বর দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিই এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। বাংলাদেশের গত দশ বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, এ নির্বাচনের গুরুত্ব সীমাহীন। আর এই নির্বাচনে অন্যতম বড় শক্তি এ দেশের তরুণরা।

দেশের মোট ভোটারের ২২ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সের মধ্যে। একেবারে নতুন ভোটারের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ, যাদের বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ছাত্রছাত্রী। এই বিপুল পরিমাণ তরুণ ভোটারকে আকৃষ্ট করতে প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিই নিজ নিজ ইশতেহারে তরুণদের দাবি-দাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের নির্বাচনের অতীত ইতিহাস বলে, ইশতেহারের গুরুত্ব খুব বেশি নয়। ভোটে জেতার পর কোনো রাজনৈতিক শক্তিই ইশতেহার বাস্তবায়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তবে এবারের নির্বাচনে ইশতেহারের গুরুত্ব যেমন আছে, তেমনি নির্বাচনে বিজয়ী দলের ওপর ইশতেহার বাস্তবায়নের ওপরও চাপ থাকবে।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে একুশ শতকের সবচেয়ে বড় দুটি ছাত্র আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে। এপ্রিল মাসে তীব্র হয়ে ওঠা কোটা সংস্কার আন্দোলন সংঘটিত হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা কমিয়ে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে যোগ্যদের সুযোগ করে দেওয়ার দাবিতে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ছাত্ররা এ দেশে দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকে। এ মুহূর্তে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় ২৭ লাখ। তাই কর্মসংস্থানের দাবিটা এখনো যৌক্তিক।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে দেশের বিভিন্ন স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। এ দুটি আন্দোলনেই ছাত্রছাত্রীদের ওপর হামলা করেছে পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা। বারবার হামলা করেও কোটা সংস্কার আন্দোলন যেমন থামিয়ে দেওয়া যায়নি, ঠিক তেমনি নির্যাতন করে কিশোরদের অসাধারণ প্রতিবাদও থামানো যায়নি। উল্টো তাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। এ দুটো আন্দোলন থেকে প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তির কাছেই একটা কথা স্পষ্ট হয়েছে নিপীড়ন করে তরুণদের দমন করা সম্ভব না। এই বোধদয়ের প্রভাব পড়েছে এবারের ইশতেহারে। নির্বাচনের পরও বিজয়ী দলকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।

আগামীর দক্ষ জাতীয় নেতা তৈরিতে ছাত্র রাজনীতির গুরুত্ব অপরিসীম। আর ছাত্র রাজনীতিচর্চার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো ছাত্রসংসদ। দুঃখের বিষয় হলো দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এ দেশের কোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না। ফলে জাতীয় রাজনীতিতেও খুবই কমসংখ্যক নতুন যোগ্য নেতা আসছেন।

নতুন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে হবে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। গণতান্ত্রিক পরিবেশ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্যতম শর্ত। ঠিক তেমনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের রাজনৈতিক সহাবস্থান ছাত্রসংসদ নির্বাচনের পূর্ব শর্ত।

দীর্ঘদিন ধরে আমাদের ছাত্র রাজনীতির সংস্কৃতি এতটাই নিচে নেমেছে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন ছাড়া অন্য কোনো সংগঠনকে রাজনীতিচর্চা করতে তো দেওয়া হয়ই না, বরং বাধা দেওয়া হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় ছাত্র রাজনীতির নামে চলছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। এ অবস্থা দূর করে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে সিট বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। হলে হলে ছাত্র নির্যাতনও বন্ধ করতে হবে।

বিতর্কিত ৫৭ ধারা বদলে এখন করা হয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, যা মানুষের বাক-স্বাধীনতা যেমন হরণ করেছে, তেমনি হরণ করেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাও। তরুণ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তির চর্চাও বন্ধ করার সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। মুক্তচিন্তার লেখক, প্রকাশক হত্যার বিচার হয়নি। বিচার হয়নি শিক্ষার্থী নিপীড়নেরও। এ অচলাবস্থা দূর করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিতে হবে।

পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁস এখন নিয়মিত দৃশ্য। নতুন সরকারকে অবশ্যই প্রশ্ন ফাঁস বন্ধে উদ্যোগী হতে হবে।

শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে। উদ্যোক্তাদের উৎসাহ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা সরকারকেই করতে হবে। কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত বেকার ভাতা অবশ্যই দিতে হবে। গবেষণাকর্মে পৃষ্ঠপোষকতা ও বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার ঘটানো খুবই জরুরি।

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রীড়া ও সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশ যেমন তৈরি করতে হবে, তেমনি ছাত্রসমাজের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষার্থী নিপীড়নের ঘটনায় জড়িতদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে। নতুবা এই বিশালসংখ্যক তরুণ রাজপথের পাশাপাশি জবাব দেবে ভোটকেন্দ্রেও।

লেখক : শিক্ষার্থী, মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়