৫০ হাজার ভোটার এলাকাছাড়া|113362|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
নরসিংদী-৫
৫০ হাজার ভোটার এলাকাছাড়া
সুমন বর্মন, চরাঞ্চল থেকে ফিরে

৫০ হাজার ভোটার এলাকাছাড়া

যারা গ্রামে আছেন তারাও পেশিশক্তির হাতে জিম্মি। এ কারণে নির্বাচনের আমেজ নেই চরাঞ্চলে।

 

সুমন বর্মন, চরাঞ্চল থেকে ফিরে

নির্বাচনের আমেজ নেই নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেঘনা নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে। কারণ ‘টেঁটাযুদ্ধে’র ঘটনায় প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে ও মামলার আসামি হয়ে চরাঞ্চলের মানুষের প্রায় অর্ধেকই এখন এলাকাছাড়া। বিএনপির দাবি, এলাকাছাড়া  পভাটারের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যাদের ভোট দেওয়া অনিশ্চিত।

নিলক্ষ্যা, বাঁশগাড়ী, চরমধুয়া, মির্জারচর, পাড়াতলী, চাঁনপুর, শ্রীনগর এবং চরআড়ালিয়া উপজেলার মেঘনাবেষ্টিত এ ৮টি ইউনিয়ন চরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। নরসিংদী-৫ (রায়পুরা) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৭০ হাজার ৬৯৯ জন। এর মধ্যে ওই ৮ ইউনিয়নের ভোটার এক লাখ ২ হাজার ২৭।

আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এসব ইউনিয়নে টেঁটা, বল্লম ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে লড়াই চলে আসছে। ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হক দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহতসহ বহুলোক টেঁটা-বল্লম ও গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে ইউনিয়নগুলোতে কয়েক হাজার ভোটার বাড়িঘর ছেড়ে পলাতক রয়েছে। প্রতিপক্ষের বিভিন্ন মামলায় আরো কয়েক হাজার ভোটার আসামি হয়ে এলাকাছাড়া। যারা গ্রামে আছেন তারাও পেশিশক্তির হাতে জিম্মি। এ কারণে নির্বাচনের আমেজ নেই চরাঞ্চলে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে আরো জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের প্রয়াত দুই চেয়ারম্যান সিরাজুল হক ও সাহেদ সরকারের সমর্থকদের মধ্যে প্রায়ই টেঁটাযুদ্ধ বাধে। বর্তমানে সিরাজুল হকের সমর্থকরা এলাকায় থাকলেও সাহেদ সরকারের সমর্থকরা এলাকাছাড়া। নিলক্ষা ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হক সরকার ও সুমেদ আলীর সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছে। এর জেরে বর্তমানে সুমেদ আলীর সমর্থকরা এলাকাছাড়া।

মির্জাচর ইউপির চেয়ারম্যান ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি জাফর ইকবাল মানিকের সঙ্গে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজি ফিরোজের ছেলে ফারুকুল ইসলামের বিরোধ রয়েছে। বর্তমানে চেয়ারম্যান মানিকের সমর্থকরা এলাকাছাড়া। পাড়াতলীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মাসুদুর রহমান মাসুদের সঙ্গে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কামরুজ্জামান তুহুর বিরোধ চলছে। মাসুদের সমর্থকরা এলাকায় টিকতে পারছেন না।

চর আড়ালিয়ায় চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান সরকারের সঙ্গে জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হাসানুজ্জামান সরকারের বিরোধ রয়েছে। বর্তমানে হাসানের পক্ষের শীর্ষ নেতারা এলাকাছাড়া। আর সমর্থকরা রয়েছে কোণঠাসা। চাঁনপুরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবুল মিয়ার সঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল কাদির জিলানীর বিরোধ রয়েছে। জিলানীর সমর্থকরা এলাকায় কোণঠাসা রয়েছে।

চরমধুয়ায় বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুস সালাম শিকদার ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূর আলম ফকিরের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। দুই পক্ষই এলাকায় অবস্থান করলেও তাদের মধ্যে উত্তেজনা রয়েছে।

পাড়াতলী ইউনিয়নের আড়াকান্দা গ্রামে সড়কের পাশেই প্রতিপক্ষের হামলায় দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে হোসেন মিয়ার বাড়ি। বাড়ির পাশেই কথা হয় বৃদ্ধা আফিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘৮ মাস আগে বাঁশগাড়ির সিরাজুল হক চেয়ারম্যানের মৃত্যুর পরই এই বাড়ি ভাইঙ্গা ফেলে। এরপর আর তারা বাড়ি আইতে পারে নাই।’

একই সড়কের সামনে এগুলো বাঁশগাড়ি ইউনিয়নের চরমেঘনা গ্রামের নুরু মিয়া, ইদ্রিস মিয়া, বরকত উল্লাহর বিধ্বস্ত বাড়ি চোখে পড়ে। বাঁশগাড়ি বাজার থেকে ভেতরে ঢুকতেই বটতলী গ্রাম। সেখানে গিয়েও অনেক ভাঙাচোরা বাড়িঘর দেখা যায়। অনেক বাড়িতে মানুষ না থাকার চিহ্ন স্পষ্ট। অনেক  ঘরের দেয়াল ও মেঝেতে আগাছা জন্মেছে।

বটতলী গ্রামের রেহেনা বেগম বলেন, ‘গ্রামের লোকজন যে যেখানে গিয়া বাঁচতে পারে সেখানে গিয়ে বাইচ্চা রইছে। তারা বাইগ্গা থাইক্কা রইছে, আইতে পারলেসে ভোট দিতে পারত।’

একই গ্রামের শান্তি মিয়া বলেন, ‘এলাকার মধ্যে অর্ধেক মানুষ আছে আর অর্ধেক নাই। মহিলা পর্যন্ত নাই। তারা সব বাড়ি ছাইড়া গেছে গা। এইসব লোকেরা নাই, ভোটটা দিব কারা?’

বাঁশগাড়ি থেকে পালিয়ে অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছে পার্শ¦বর্তী নিলক্ষা ইউনিয়নের হরিপুরে। হরিপুর বাজারে কথা হয় বাঁশগাড়ি ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ফয়সাল আহমেদ সুমনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে শুধু বাঁশগাড়ির ৪ হাজারের অধিক নেতাকর্মী এলাকাছাড়া। আমরা এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ চাই। নির্বাচনে ভোট দিতে চাই।’

গত ১৯ ডিসেম্বর এ আসনের বিএনপি প্রার্থী আশরাফ উদ্দিন বকুল নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে চরাঞ্চলের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারসহ সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রয়োজনে ওই আটটি ইউনিয়নে সেনাবহিনী ও বিজিবি মোতায়নের আবেদন করেছেন। তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের হামলা ও মামলার আসামি হয়ে চরাঞ্চলের ৫০ হাজার ভোটার এখন এলাকাছাড়া। এত বিপুল সংখ্যক লোককে নির্বাচনের বাইরে রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না।

আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাংসদ রাজিউদ্দিন আহমেদ রাজু বলেন, ভোট দেবে এতে কোনো সমস্যা নেই। তবে এ সুযোগে ফের সংঘাত হোক এটা কাম্য নয়। তিনি নির্বাচিত হওয়ার পর চরের সংঘাত দূর করে শান্তি ফেরাতে উদ্যোগ নেবেন বলে জানান।

জেলা রিটানিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ফারহানা কাউনাইন বলেন, ভোটারদের বাড়ি থেকে আনার দায়িত্ব প্রশাসনের নয়। চরাঞ্চলে ভোট প্রদানে কোনো বিধিনিষেধ নেই। ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে কেন্দ্রে এলে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া হবে।