২০১৮: ফোর-জি, বিতর্ক আর স্যাটেলাইটের বছর|113557|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
২০১৮: ফোর-জি, বিতর্ক আর স্যাটেলাইটের বছর

২০১৮: ফোর-জি, বিতর্ক আর স্যাটেলাইটের বছর

কক্ষপথে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট : কক্ষপথে আমাদের প্রথম পদচিহ্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। গত ১১ মে এটিকে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টিভি চ্যানেলগুলো সরাসরি সম্প্রচার সেবা নিতে পারে। এছাড়া নিজস্ব স্যাটেলাইট থাকার ফলে এদেশে এখন শুধুমাত্র একটি ডিশ এন্টেনার মাধ্যমেই নিরবচ্ছিন্নভাবে চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার উপভোগ করা যাবে। এতে অপারেটর কোম্পানিগুলোর দৌরাত্ম্য কমবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকালে দুর্যোগ ব্যবস্থ্াপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে স্যাটেলাইট। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট স্থাপনের আগে এই সেবাগুলো অন্যান্য স্যাটেলাইট থেকে আমাদের ভাড়া করা লাগত। ফলে এ বাবদ প্রতি বছর প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়ে যেত। কিন্তু নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপনের ফলে বাংলাদেশ এখন এটি অন্যান্য দেশের কাছে ভাড়া দিয়ে বছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করতে পারবে।

চালু হলো ই-পাসপোর্ট : একটি জার্মান কোম্পানির সহায়তায় দেশে এ বছরই ই-পাসপোর্ট চালু করেছে অভিবাসন ও পাসপোর্ট বিভাগ। জার্মান কোম্পানি ভেরিদোস জিএমবিএইচ-এর সঙ্গে ১০ বছরের চুক্তি অনুযায়ী ২০২৮ সাল পর্যন্ত সংস্থাটি ৩০ লাখ ই-পাসপোর্ট সরবরাহ করবে। ই-পাসপোর্ট চালু করা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ১১৯তম। প্রক্রিয়াটি শুরু করতে অভিবাসন ও পাসপোর্ট বিভাগের প্রায় ১০০ কর্মকর্তা সম্প্রতি জার্মানি সফর করেন। নতুন ই-পাসপোর্ট আগেরটির মতোই থাকবে। কেবল, বহনকারী ব্যক্তির বিভিন্ন তথ্য সংবলিত পাসপোর্টের প্রথম দুটি পৃষ্ঠা হবে পলিমারের।

ফোর-জি চালু : গত ফেব্রুয়ারি মাসে গ্রামীণফোন এবং রবি দেশে প্রথমবারের মতো ফোর-জি সেবা চালু করে। গ্রামীণফোনই প্রথমবারের মতো ৫০ লাখ মানুষকে ফোর-জি সেবা দিতে সক্ষম হয়। যদিও দেশে প্রায় ৯ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী আছে। বছরের শেষের দিকে টেলিটকও গ্রাহকদের ফোর-জি সেবা দিতে শুরু করে। ২০১৯ সালেই বাংলাদেশ পুরোপুরিভাবে ফোর-জি যুগে পদার্পণ করতে যাচ্ছে।

ডিজিটাল অর্থ লেনদেনের বছর : মে মাসে বিকাশ অ্যাপ চালুকরণ ছাড়াও ইউক্যাশ এবং ডিবিবিএল-এর নেক্সাসপে’র জোর প্রচারণার ফলে ডিজিটালি অর্থ আদান-প্রদানের সেবা এখন সাধারণ মানুষের কাছে খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিকাশ অ্যাপকে খুব সহজেই গ্রহণ করে গ্রাহকরা এবং এটি ধারাবাহিকভাবেই আপডেট সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছে গ্রাহকদের। বর্তমানে প্রতারণা ঠেকাতে ‘জিওলক’ নামে একটি সেবা সংযুক্ত করেছে বিকাশ অ্যাপ। এছাড়া পোস্ট অফিসের মাধ্যমে অনলাইন সেবা ‘নগদ’ একটি বড় অফার নিয়ে এসেছে। নগদ-এর মাধ্যমে গ্রাহকরা একদিনে সর্বোচ্চ আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেন করতে পারবে। যেখানে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে একদিনে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকার লেনদেন সম্ভব হয়। বিদায়ী বছরে দেশে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল মূল্য পরিশোধের প্লাটফর্মটি তৈরি করে ‘আইপে’।

প্রাথমিক বিনিয়োগ তহবিল : এ বছর যাত্রীসেবামূলক প্রতিষ্ঠান ‘পাঠাও’ জি-জ্যাক থেকে ১ কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে। অন্যদিকে, একই রকম প্রতিষ্ঠান ‘সহজ রাইডস’ গোল্ডেন গেট ভ্যাঞ্চারস থেকে প্রায় দেড় কোটি ডলারের তহবিল সংগ্রহ করে। এছাড়া অনলাইন শপ ‘শপ-আপ’ ও মিডিয়ার নেটওয়ার্ক এবং এঞ্জেল ইনভেস্টরস থেকে ১৬ লাখ ডলারের প্রারম্ভিক তহবিল সংগ্রহ করে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বিশ্বব্যাংকিং ব্যবস্থার বড় বড় প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল প্রারম্ভিক অর্থই প্রেরণ করে না, উপরন্তু কারিগরি সহায়তা থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ তৈরির পদক্ষেপ : এ বছরেরই এপ্রিলে স্যামসাং স্থানীয়ভাবে ফোর-জি সক্ষম হ্যান্ডসেট তৈরিরা ঘোষণা দিয়ে জুনে ঈদুল ফিতরের সময় থেকে সরবরাহ শুরু করে। এছাড়া আমারা, সিম্ফোনি, ট্র্যানজান বাংলাদেশ (আইটেল স্মার্টফোন নির্মাতা) এবং ড্যাফোডিল তাদের নিজস্ব কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর গত বছরের অক্টোবরেই ওয়াল্টন দেশে প্রথমবারের মতো তাদের ফ্যাক্টরি স্থাপন করে ল্যাপটপ, স্মার্টফোনসহ অন্যান্য যন্ত্রাংশ তৈরির কাজ শুরু করে। মোবাইল যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্কব্যয় ৩৬ শতাংশ থেকে ১ শতাংশে নামিয়ে এনে বাংলাদেশ সরকারও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এইসব পদক্ষেপে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এছাড়াও মোবাইল হ্যান্ডসেট আমদানিতেও ১০ শতাংশ শুল্কব্যয় কমানো হয়।

অনলাইন সংবাদ ও পোর্টাল বন্ধের বছর : নাগরিক স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বেশ কয়েকবারই খবরের শিরোনাম হয়েছে অনলাইন। দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ২৪, প্রিয়ডটকম-সহ বেশ কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল এ বছর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়াও গত আগস্টে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় প্রথমবারের মতো ইন্টারনেটের গতি সেøা করে দেওয়া হয়েছিল। প্রখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমসহ বেশ কিছু মানুষকে সে সময় গুজব ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়াও নির্বাচনকে সামনে রেখে ইন্টারনেটে যেন কেউ গুজব ছড়াতে না পারে সে জন্য সাইবার নিরাপত্তা আর্মি নামে একটি নজরদারি দল নিয়োগ করেছে নির্বাচন কমিশন।

তথ্য পাচার : গ্রাহকদের বিভিন্ন তথ্য অব্যবস্থাপনার অভিযোগ উঠেছে যাত্রীসেবা প্রতিষ্ঠান ‘পাঠাও’ এবং বাংলাদেশ টেলিকম্যুনিকেশন রেগুলেরটরি কমিশন (বিটিআরসি)-এর বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, প্রায় ৭ কোটি মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য কারো অনুমতি ছাড়াই সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স (বিবিএস)-এর কাছে হস্তান্তর করেছে বিটিআরসি। একটি জরিপ কাজের জন্য এটি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। একইভাবে রাইড শেয়ারিং প্লাটফর্ম ‘পাঠাও’-এর বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছে প্রতিষ্ঠানটি তাদের গ্রাহকদের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার একটি থার্ড পার্টির সার্ভারে পাঠিয়েছে। কিন্তু কেন তারা এই তথ্য পাচার করেছে তার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ পাওয়া যায়নি। আদালতের আদেশ কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো বিষয় জড়িত না থাকলে দেশের বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, অন্য কোনো পক্ষের কাছে গ্রাহকদের তথ্য পাচারের কোনো অধিকার নেই পাঠাও কিংবা বিটিআরসি’র।

বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন : এ বছরের ২০ সেপ্টেম্বর সংসদে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সম্পর্কিত প্রস্তাবটি পাস হয়। মনে করা হচ্ছে, এই আইনটি স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে বাধাস্বরূপ। আইনটির ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কেউ এই আইন ভঙ্গ করলে তার ২৫ লাখ টাকা জরিমানা ও সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল হতে পারে। অনুচ্ছেদ ৩১-এ আছে, কেউ যদি ঘৃণাত্মক বক্তব্য প্রদান করে তবে তার ৫ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা সর্বোচ্চ ৭ বছরের জেল, অথবা উভয় দ-ে দ-িত হতে পারে। নাগরিক নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এই আইনটি পাস করা হয়েছে। প্রস্তাবনার ৪৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এ সম্পর্কিত আইন অমান্যের সন্দেহে যে কাউকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রাখে পুলিশ।