কলকাতার সেরা ৫ ছবি|113559|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
কলকাতার সেরা ৫ ছবি
আল মাসিদ

কলকাতার সেরা ৫ ছবি

কয়েক বছর ধরে কলকাতার ছবির বাজারে মসলা ছবির ভাটা পড়েছে। আর্ট আর কমার্শিয়াল উপাদানের মিশেল রয়েছে যেসব ছবিতে, সেগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। এ বছরও কলকাতার সেরা ছবির সব কটিই আর্ট আর কমার্সের মিশেলে তৈরি। তবে নজর কাড়ার মতো বিষয় হচ্ছে নারীপ্রধান ছবি কলকাতায় বেশ ভালো জায়গা করে নিয়েছে। এ ছাড়া শিশুদের নিয়েও ছবি তৈরি হয়েছে। ২০১৮ সালের সেরা পাঁচ ছবি নিয়ে এই আয়োজন সাজিয়েছেন আল মাসিদ

দৃষ্টিকোণ

এখনো সজীব প্রসেনজিৎ-ঋতুপর্ণা জুটি। তাদের ৪৮ নম্বর ছবি কৌশিক গাঙ্গুলির ‘দৃষ্টিকোণ’ এ বছরের অন্যতম ব্যবসাসফল ছবি। ছবিতে গল্পের অন্দরে গল্প। সম্পর্কের টানাপোড়েনে তৈরি হয়ে ওঠা ভালোবাসার গল্প। সদ্য স্বামী হারানো যুবতী শ্রীমতী এবং তার উকিল জিয়ন। জিয়নের রয়েছে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অভিজাত এক বিশাল বাড়ি। তেমনই অভিজাত তার সুন্দরী স্ত্রী রুমকি আর সুখী গৃহকোণ। জিয়নের চরিত্রে প্রসেনজিতের স্বাভাবিক, সংযত অভিনয় যে উচ্চতায় পৌঁছে যায়, তা বলার ভাষা রাখে না।

কৌশিক গাঙ্গুলি যে একজন অসাধারণ অভিনেতা তা আরো একবার প্রমাণ করে দিলেন। ঋতুপর্ণা তো ভালো অভিনেত্রীই। তবে নতুন করে মুগ্ধতা জাগান চূর্ণী গাঙ্গুলি। একজন মমতাময়ী মা এবং স্ত্রী; একই সঙ্গে এক এলিগ্যান্ট লেডি, এক অনায়াস দক্ষতায় তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন! সত্যি, এ এক অন্য দৃষ্টিকোণ, অন্য ভালোবাসার গল্প। মুভি শেষ হয়ে যাওয়ার পরও দর্শক সম্মোহিত! কারণ তখন তার চেতনার আনাচে-কানাচে উঁকি মারছে অন্য দৃষ্টিকোণ, অন্য আলোর উদ্ভাস।

ক্রিসক্রস

বিরসা দাসগুপ্ত পরিচালিত ‘ক্রিসক্রস’ ছবিতে বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে পাঁচজন নারীর গল্প উঠে এসেছে। কেউ চাকরি খুঁজে হয়রান। কেউ আপস না করতে পেরে পিছলে যাওয়া। কেউ জীবনের অগ্রাধিকার নিয়ে ব্যতিব্যস্ত। কেউ আবার সংসারের জাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে জীবনের মানে হারিয়ে ফেলা এক ছাপোষা মেয়ে! প্রত্যেকের একটা দিনের ক্রাইসিস ‘ক্রিসক্রস’-এর প্রাণ। ফটোগ্রাফার ইরার (মিমি চক্রবর্তী) জীবন দশটা-পাঁচটার গন্ডিতে বাঁধা থাকে না। মাঝেমধ্যে পুরো একটা রাত কেটে যায় অফিসেই। ব্যক্তিজীবন, সম্পর্ক আর প্রফেশনাল কমিটমেন্টের বোঝায় গুলিয়ে যায় জীবনের ব্যালান্স। শাশুড়ির মুখঝামটা, দেবরের চাহনি আর বরের চূড়ান্ত নির্লিপ্ততায় কখন যে রূপার (সোহিনী সরকার) মুখে রক্ত উঠে আসে, কারো খেয়াল হয় না! কারণ, এই ডিজিটাল যুগেও যে বরের শারীরিক অক্ষমতা নয়, প্রশ্ন ওঠে রূপার মাতৃত্ব নিয়েই! স্কুল ফি দিতে না পারলে সন্তানের নাম কাটিয়ে দেওয়া হবে। হাতে মাত্র দুদিন! এ যেন সুজির (প্রিয়ঙ্কা সরকার) ধর্মসংকট। এ লড়াইয়ে তাকে তো জিততেই হবে। সে যে সিঙ্গল মাদার! অভিনেত্রী মানেই কাজের জগতে আপস নয়! ধারণাগুলো পাল্টে দিতে চায় মেহের (নুসরত জাহান)। মেহেরের উপস্থিতি বোঝায়, নারীর শরীর অত সস্তা নয়! মিস সেন (জয়া আহসান)। মানুষ যত ওপরে ওঠে, তত নাকি একা হয়ে যায়। মিস সেন চরিত্রটি বোধহয় তেমনই একা! পরিবার-পরিজন হারিয়ে কেরিয়ারের শীর্ষে পৌঁছানো মিস সেনের চারিত্রিক রূঢ়তা আসলে সেই ফাঁপা জীবনের পরিচয় বহন করে। ছবিটি একই সঙ্গে দর্শক ও সমালোচকের নজর কেড়েছে।

এক যে ছিল রাজা ছবিতে যিশু সেনগুপ্ত। সেরা ছবির মধ্যে দুটির নায়ক তিনি

 

মাছের ঝোল

 

এ বছরের সবচেয়ে সমালোচকপ্রিয় ছবি ‘মাছের ঝোল’। এর কাহিনী, চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনা করেছেন প্রতীম ডি গুপ্ত। কথায় আছে, ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’। কিন্তু আজকালকার অনেক বাঙালিই মাছ খান না। খারাপ গন্ধ লাগে। রান্না করতেও অনেক ঝক্কি। এত সময় ব্যয়, এত খাটনি আজকাল নতুন জেনারেশনের অধিকাংশ মানুষের আর পোষায় না। তার থেকে চিকেন আর ডিম অনেক সহজ। টুক করে রেঁধে ফেললেই হলো। প্রোটিনের ঘাটতিও মিটে যায়। এমন ব্যস্ত ও কিঞ্চিৎ ফাঁকিবাজ বাঙালিদের টেবিলে মাছের ঝোল সার্ভ করাটা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। আর এ কাজটাই প্রতীম ডি গুপ্ত করেছেন তার ‘মাছের ঝোল’ ছবিতে। এই ছবিটি বাংলায় তৈরি প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যরে ‘ফুড ফিল্ম’। বিদেশে বহুকাল থেকেই এ ধরনের ছবি হয়ে আসছে। হিন্দিতেও বেশ কিছু এই গোত্রের ছবি আমরা দেখেছি। ‘বাবুর্চি’, ‘রামজি লন্ডনওয়ালে’, ‘চিনি কম’, ‘লাভ সাব দে চিকেন খুরানা’ ইত্যাদি। ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী। তিনি একজন সেফের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। এক্সপেরিমেন্টে তাকে সাহায্য করেন ম্যাগি। এই ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সৌরসেনী মিত্র। এ ছাড়া ঋত্বিকের প্রাক্তন স্ত্রীর ভূমিকায় আছেন পাওলি দাম, বাবার ভূমিকায় সুমন্ত মুখোপাধ্যায় আর মায়ের ভূমিকায় মমতা শঙ্কর।

এক যে ছিল রাজা

১২ অক্টোবর মুক্তি পায় জনপ্রিয় নির্মাতা সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের বহুল আলোচিত ছবি ‘এক যে ছিল রাজা’। ছবিটি অবিভক্ত ভারত তথা এখনকার বাংলাদেশের গাজীপুর এলাকার ভাওয়াল রাজার জীবন নিয়ে সত্য ঘটনার ওপর নির্মিত। এতে নাম ভূমিকায় আছেন যিশু সেনগুপ্ত। তার বোনের চরিত্রে দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান। আর বাদী-বিবাদীর দুজন আইনজীবীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী অপর্ণা সেন ও সংগীতশিল্পী অঞ্জন দত্ত। এসভিএফ প্রযোজিত ছবিটি বেশ ভালো ব্যবসা করেছে। সেই সঙ্গে ছবির নির্মাণশৈলী, অভিনয়শিল্পীর অভিনয় নিয়েও যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছে ছবিটি। একাধিক চিত্রসমালোচক ছবিটিকে সৃজিতের পরিণত নির্মাণ বলে অভিহিত করেছেন। এই ছবিতে যিশু সেনগুপ্তের অভিনয়কে ক্যারিয়ারের সেরা বলেও বিবেচনা করা হয়েছে। তবে ছবির প্রাণ বলা হয়েছে জয়া আহসানের অভিনয়কে। গানের দিক থেকেও এই ছবি এগিয়ে থাকবে। ইন্দ্রদীপ দাশগুপ্তের সংগীত, শ্রীজাতের লেখা গানগুলোয় কণ্ঠ দিয়েছেন শ্রেয়া ঘোষাল, কৌশিকী চক্রবর্তী, আরিজিৎ সিং, কৈলাশ খের ও ঈশান। রবীন্দ্রনাথের গান গেয়েছেন শাহানা বাজপায়ি।

সোনার পাহাড়

জনপ্রিয় অভিনেতা পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পরিচালিত ছবি ‘সোনার পাহাড়’। পর্দায় তাকিয়ে আপনার চোখের কোণটা চিকচিক করে যদি গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসে কিংবা কোনো এক দৃশ্যে ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টের পান, বুঝতে হবে ছবিটা মন টেনেছে। ‘সোনার পাহাড়’ দেখে কিন্তু এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সত্তর বছরের উপমার বাথরুমে পড়ে যাওয়া দিয়ে গল্পের শুরু। মা, ছেলে এবং বৌমার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নেই, তাই তারা আলাদা থাকেন। অভিমান আর জেদের পাহাড় জমে। জেনারেশন ওয়াইয়ের ব্যস্ততার দরুন একদিনও ছেলেবউ সময় দিতে পারেন না বৃদ্ধা মাকে। অভিনয় করেছেন তনুজা, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, যিশু সেনগুপ্ত, পরমব্রত, শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়, অরুণিমা ঘোষ, গার্গী রায়চৌধুরী।

এ ছাড়া শিশুতোষ কমেডি ছবি ‘হামি’ সব শ্রেণির দর্শকের মন জয় করে নিয়েছে। ব্যবসাসফল নির্মাতা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের এই ছবির চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছে স্কুলের কয়েকটি ঘটনাকে ঘিরে। ভুটু ও চিনির সরল বন্ধুত্ব দিয়ে শুরু হওয়া গল্প ক্রমে জটিল হয়ে যায়। ছবিতে ভুটুর চরিত্রে অভিনয় করেছে ব্রত এবং চিনির ভূমিকায় তিয়াসা। কলকাতায় হল না পেলেও বক্স-অফিসে শিবু-নন্দিতার নামের ভারেই কেটে গেছে হামি।