৪৭ বছরেও স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ|113582|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
৪৭ বছরেও স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

৪৭ বছরেও স্বীকৃতি না পাওয়ার আক্ষেপ

তাদের বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের পুরোটা লেখা সম্ভব নয়। রণাঙ্গনে সমরে অংশ নেননি। কিন্তু বল নিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়েছেন তারা। বলা হচ্ছে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বীর সেনাদের কথা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠন আর অর্থ সংগ্রহের জন্য ১৯৭১ সালে গঠিত হয় দলটি। একঝাঁক তরুণ সংগঠক ফুটবলার মিলে ভারতজুড়ে খেলেছিলেন ১৬টি ম্যাচ। তাদের নিয়ে ভারতজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। মুম্বাইয়ে প্রদর্শনী ম্যাচে বসেছিল তারার মেলা। সে সময়ের ভারত ক্রিকেট দলের অধিনায়ক নবাব মনসুর আলি খান পাতৌদি, ভারতের কিংবদন্তি অভিনেতা দিলীপ কুমারের মতো তারকা একাত্মতা প্রকাশ করেন সেই ফুটবলারদের ব্যতিক্রমী উদ্যোগে। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে এমন অবদান সত্ত্বেও এই দলটি স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও পায়নি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। গতকাল এই মহান বীরদের সম্মাননা জানিয়েছে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। খেলোয়াড়-সংগঠক মিলিয়ে ১২ জনের মতো উপস্থিত ছিলেন কাল। জীবনের গোধূলিলগ্নে দাঁড়িয়ে একটি কথাই তাদের মুখে ‘চাই প্রাপ্য স্বীকৃতি’।

অনুষ্ঠানের প্রধান উদ্যোক্তা বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনও ছিলেন সেই দলের অন্যতম সদস্য। স্বাগত বক্তব্যে সালাউদ্দিন বললেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়েই এ লড়াইয়ে নেমেছিলেন তারা, ‘আমাদের সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” এরপর মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে ঘর ছাড়ি। তখনো জানতাম না, আমাদের লড়াইটা এরকম হবে।’ সালাউদ্দিন গেল ১০ বছর সভাপতিত্ব করছেন দক্ষিণ এশিয়া ফুটবল ফেডারেশনেরও (সাফ)। স্বাধীনতা এসেছিল বলেই তিনি সাতটি দেশের সভাপতি হতে পেরেছেন।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার ছিলেন তানভীর মাজহার তান্না। তার কথায় ফিরে এলো ৪৭ বছর আগের স্মৃতি, ‘আমি তখন ক্রিকেট খেলতাম। ম্যানেজারের অভিজ্ঞতাও টুকটাক হয়েছিল। যুদ্ধে যোগ দেব বলে আগরতলা গিয়েছি ট্রেনিং করতে। সেখানে শুনলাম তৎকালীন মুজিব সরকার একটি ফুটবল দল গঠন করেছে। যার ম্যানেজার আমাকে নির্বাচিত করা হয়েছে। কলকাতায় এসে দেখি প্যাটেলের (সাইদুর রহমান) ভাবনা থেকে আসা এই দলের অনেক কাজই এগিয়ে গেছে।’

এরপরই ঝরল আকুতি, ‘আমরা কয়েকজন বাদে এই দলের বেশির ভাগ সদস্যই ভালো নেই। তারা অনেক সমস্যাগ্রস্ত। অনেকে তো চলেই গেছেন পরপারে। যারা আছেন তাদের অনেকই দিন গুনছেন মৃত্যুর। আমাদের সবারই এখন যাওয়ার সময়। অথচ ৪৭ বছরেও এই দলটি কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। সরকারের কাছ থেকে মাসে তিন হাজার টাকা করে ভাতা পান কেউ কেউ। এই টাকায় কী হয়? আমি সবার হয়ে বলছি, দয়া করে এদের জন্য কিছু করুন। এই মানুষগুলোর অবদান কিন্তু অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’

যার মাথা থেকে এসেছিল সেই ব্যতিক্রমী ভাবনাটা সেই প্রধান উদ্যোক্তা প্যাটেল এই স্বীকৃতি না মেলার জন্য নিজেদের ভেতরের কোন্দলকেই দুষছেন, ‘আমরাই আসলে আমাদের বিতর্কিত করেছি। আমাদের দেশে সবচেয়ে নিকৃষ্ট গালি হচ্ছে রাজাকার। কিন্তু আমি বলব, যারা আমাদের অবদান নিয়ে মিথ্যাচার করে তারা রাজাকারের চেয়েও নিকৃষ্ট। গুটিকয় মানুষের জন্য আমরা আজ প্রাপ্য সম্মানটুকু পাচ্ছি না। এখানে একক কৃতিত্ব নেওয়ার কিছু নেই। এই উদ্যোগে যারাই ছিলেন তারা প্রত্যেকেই কৃতিত্বের দাবিদার।’

সেই দলের খেলোয়াড় তসলীমউদ্দিন শেখ সব বিভেদ ভুলে এক হওয়ার আহ্বান জানালেন, ‘আমাদের এখন যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। অনেকেই অতৃপ্তি নিয়ে গিয়েছেন। যাওয়ার আগে যদি দেখতাম প্রাপ্য স্বীকৃতিটুকু পেয়েছি, মরেও শান্তি পেতাম।’

অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এই মহান বীরদের স্বীকৃতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়। এমন প্রতিশ্রুতি অবশ্য গত ৪৭ বছরে কম পাননি এই ফুটবলাররা। কিন্তু কার্যত হয়নি কিছুই। তাই তো জাতীয় জাদুঘরে টাঙানো ২৪ জুলাই কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে পতাকা হাতে ফুটবলারদের সেই ছবিও আর গৌরব জাগায় না তাদের মনে।