শেষ হয়েও শেষ নয়|113593|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
শেষ হয়েও শেষ নয়
প্রতীক ইজাজ

শেষ হয়েও শেষ নয়

আনুষ্ঠানিকভাবে আজ শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে নির্বাচনী প্রচার শেষ হলেও প্রচার কাজ কার্যত শেষ হচ্ছে না। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকেই নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও এর আওতার বাইরে আছে প্রচারের অনেকগুলো মাধ্যম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, খুদেবার্তা, টেলিভিশন ও ডিজিটাল প্রচারের ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই নির্বাচন কমিশনের (ইসি)। ফলে প্রার্থীরা এসব মাধ্যমে প্রচার চালালেও তার বিরুদ্ধে কতটা ব্যবস্থা নিতে পারবে, তা নিয়েও দ্বিধাহীনতায় নির্বাচন কমিশন।

ইসি অবশ্য বলছে, সব ধরনের নির্বাচনী প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু আদৌ সে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে কি নাÑ তা নিয়েও সংশয় রয়েছে কমিশনের।

নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রচার তো প্রচারই। সব ধরনের প্রচারই নিষিদ্ধ। কিন্তু ফেইসবুক, টেলিভিশন, খুদেবার্তা বা ডিজিটাল প্রচারের বিরুদ্ধে ঠিক কতটুকু ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব- সেটি বিবেচ্য বিষয়। তবে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে রেখেছি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রচার বন্ধ করাটা কঠিন। যেমনÑ ফেইসবুকে যদি কোনো প্রার্থীর পক্ষে তার বন্ধু বা কোনো পক্ষ প্রচার চালায় বা খুদেবার্তা পাঠায় সেটি কিন্তু এর আওতায় আসে না। টেলিভিশনে পরোক্ষভাবে প্রচার চালালে সেটা বন্ধ করার উপায় নেই। এ ধরনের প্রচার বন্ধ করাটা কঠিন। তবে সব ধরনের কমার্শিয়াল প্রচারই নিষেধ। সেটা যেকোনো মাধ্যমেই হোক না কেন। তবে এখন পর্যন্ত দেশে এ ধরনের প্রচারের খবর আমাদের কাছে নেই। তবে কেউ যদি দেশের ভেতর বা বাইরে থেকে ডলার বিনিয়োগ করে ফেইসবুকে প্রচার চালায়, আমরা অভিযোগ পেলে তদন্ত করে তা ফেইসবুক কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নিতে বলব।

ধরনের প্রচার বন্ধের ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে- উল্লেখ করে এই কমিশনার আরো বলেন, মাঝখানে মাত্র দুদিন বাকি নির্বাচনের। এত অল্প সময়ে তদন্ত করে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া কতটুকু সম্ভব হবে- সেটাও ভাববার বিষয়। তবে এ ব্যাপারে কোনো প্রার্থী অভিযোগ করলে আমরা ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করব।

এমন অবস্থার মধ্যেই আজ থেকেই বন্ধ হচ্ছে বহুল কাক্সিক্ষত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনী প্রচার কাজ। ভোটের পর ১ জানুয়ারি বিকেল ৪টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এ সময় কোনো নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল, শোভাযাত্রা করা যাবে না। এখন অপেক্ষা কেবল ভোটযুদ্ধের।

গত ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ পেয়েই কোমর বেঁধে মাঠে নেমে পড়েছিলেন প্রার্থীরা।  ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গেছেন। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নিজের ও দলের সুকীর্তি তুলে ধরেছেন।

বাদ যায়নি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দলের সমালোচনাও। মিছিল-সমাবেশ উঠোন বৈঠক করেছেন। গানে স্লোগানে মুখর ছিল গোটা দেশ। রাতদিন চব্বিশ ঘণ্টা মাঠে পড়েছিলেন প্রার্থী ও তার সমর্থকরা। ভোটারের মন জয়ে ছিল নিরলস চেষ্টা। উৎসবমুখর ছিল দেশ ও মানুষ।

অবশ্য নির্বাচনী প্রচার বলতে যে উৎসবমুখর পরিবেশের ছবি চোখের সামনে ভাসে, এবার তেমনটা দেখা যায়নি। পাল্টাপাল্টি হামলা, প্রচারকেন্দ্রে আগুন, ভাঙচুর, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, সংঘর্ষ, মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা প্রার্থী ও ভোটারদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশানার কে এম নুরুল হুদা বারবার দাবি করেছেন, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেছেন, ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নেই।

প্রচারণার ১৭ দিন প্রার্থীদের ওপর শারীরিক আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিপক্ষের হামলায় রক্তাক্ত হয়েছেন ১৩ জন প্রার্থী। আর প্রার্থীর গাড়িবহরে হামলার ঘটনা ঘটেছে ৩০টিরও বেশি। সবমিলে সারা দেশে অন্তত ২১৫টির মতো সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৫ জেলাতেই ছিল হামলা, বাধা ও সহিংসতা। সহিংসতায় মারা গেছেন দুজন, একজন নোয়াখালীতে, অন্যজন ফরিদপুরে। দুজনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

প্রচারে বাধার ফলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন নিয়েও এক ধরনের সংশয় তৈরি করেছিল। নির্বাচনী সহিংসতা ও বিরোধীদের ধরপাকড়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। কমেছে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের সংখ্যা। শেষ দিনে অবশ্য নির্বাচনের ব্যাপারে এক ধরনের আশা জেগেছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা আনন্দবাজারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ‘আমরাই ক্ষমতায় আসছি’ বলে মন্তব্য করেছেন। সরকারবিরোধী জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন ‘ভোট বিপ্লবের’ ডাক দিয়েছেন। ইসিও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সার্বিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।

ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের জন্য সিল-প্যাডসহ নির্বাচনী সামগ্রী এরইমধ্যে জেলা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গত তিনদিনে অধিকাংশ আসনে ব্যালট পেপারও পাঠিয়েছে ইসি। আগামীকালের মধ্যে ভোটকেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে যাবে সব সামগ্রী। ভোটকেন্দ্রে জরুরি প্রয়োজনে ব্যালট পেপার পৌঁছাতে দুটি হেলিকপ্টারও প্রস্তুত রয়েছে। দেশের ৩৯টি দল ও স্বতন্ত্র মিলে ১ হাজার ৮৪০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১০ কোটি ৪২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৭৩ জন ভোটারের জন্য ৪০ হাজার ১৮৩টি কেন্দ্রে ২ লাখ ৬ হাজার ৪৭৭টি ভোটকক্ষ রয়েছে। এসব ভোটকক্ষে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন প্রায় ৭ লাখ।

নির্বিঘ্ন ভোটদানে এবার আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে বলে ইসি দাবি করছে। নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র‌্যাব ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী অন্যান্য বাহিনীর সমন্বয়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। টহলে রয়েছেন বিজিবির সদস্যরাও। এ ছাড়া ২৪ ডিসেম্বর থেকে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে মাঠে রয়েছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তারা থাকবেন ২ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্বাচনে সাধারণ এলাকার ভোটকেন্দ্রের পাহারায় একজন পুলিশসহ ১৪ জন সদস্য, মেট্রোপলিটন এলাকার ভোটকেন্দ্রে তিনজন পুলিশসহ ১৫ জন এবং দুর্গম ও উপকূলীয় এলাকার ভোটকেন্দ্রে দুজন পুলিশসহ ১৪ জন সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে ইসির।