নির্বাচনে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক চাই|113641|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১১:৫৪
নির্বাচনে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক চাই

নির্বাচনে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক চাই

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে ইসি বেশ কয়েকটি সংস্থাকে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবার অনুমতি দিয়েছে। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ অনুচ্ছেদের বিধানের আলোকে ইসি এই অনুমতি প্রদান করেছে। এই অনুচ্ছেদে বলা আছে-

91 C. (1) The Commission may permit in writing any person, whether national or foreign, as an election observer who is in no way associated with or affiliated to, any political party or contesting candidate and who is not known for his sympathy, direct or indirect, for any particular political ideology, creed or cause or for any manifesto, program, aims or object of any political party or contesting candidate. 

অর্থাৎ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ সি (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইসি চাইলে কোনো দেশি বা বিদেশি ব্যক্তিকে (অথবা সংস্থাকে) নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবার জন্য লিখিত অনুমতি দিতে পারে। তবে শর্ত থাকে যে, সেই ব্যক্তি (অথবা সংস্থা) (ক) কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারবে না; (খ) কোনো রাজনৈতিক দল বা বা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারবে না; এবং (গ) কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীর মতাদর্শ, বিশ্বাস, ভিত্তি, ম্যানিফেস্টো, প্রোগ্রাম, লক্ষ্য বা উদ্দেশের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত হতে পারবে না।

পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এবারে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ৮১টি প্রতিষ্ঠানের ২৫ হাজার ৯২০ জন পর্যবেক্ষককে ইসি নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অনুমোদন দিয়েছে (প্রথম আলো, ২২ ডিসেম্বর ২০১৮)। ওপরের আইনের আলোকে আমরা জানি যে, একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে অবশ্যই নির্দলীয় হতে হবে। আর সেটা যদি না হয় তবে তারা ঘোলা পানিতে মাছ ধরবার চেষ্টা করবে। ‘দলকানা’ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা কখনই নিরপেক্ষ মতামত দেবে না, দিতে পারে না; সে তার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের হয়েই কথা বলবে বা মতামত দেবে। আর তাই ইসির উচিত হবে না কোনো ‘দলকানা’ নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার অনুমতি দেওয়া। কিন্তু আমি ইসির অনুমতিপ্রাপ্ত নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর মধ্যে সুস্পষ্টভাবে ‘বিএনপি ঘনিষ্ঠ’ তিনটি পর্যবেক্ষক সংস্থা দেখতে পাচ্ছি। জানি না এক্ষেত্রে ইসি গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ সি (১) অনুচ্ছেদের ব্যত্যয় ঘটাল কি না! এই তিনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রত্যেকটি বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে সরাসরি ভাবে সংযুক্ত এবং সম্পর্কিত। আর শুধু তা-ই নয়, তিনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থাই বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটির মতাদর্শ, বিশ্বাস, ভিত্তি, ম্যানিফেস্টো, প্রোগ্রাম, লক্ষ্য বা উদ্দেশের প্রতি প্রত্যক্ষভাবে সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত।

তিনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার অন্যতম একটি হচ্ছে, ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’। ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’-এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন সাংবাদিক শফিক রেহমান এবং নির্বাহী পরিচালক মিসেস তালেয়া রহমান। দুজনে আবার স্বামী-স্ত্রী। সাংবাদিক শফিক রেহমান হচ্ছেন বিএনপির রাজনৈতিক দলের নেতা। তিনি বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ ও হত্যা চেষ্টার মামলার আসামিও বটে। একসময় এই দম্পতির ঢাকার ইস্কাটনের বাসভবন বিএনপির আগের ‘হাওয়া ভবন’ হিসেবে পরিচিত ছিল। ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’-এর মতো বিএনপির ‘দলকানা’ একটি সংগঠন যখন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবে তখন তারা নানারকম সমস্যা সৃষ্টি করবে, তারা কিছুতেই নিরপেক্ষ মতামত দেবে না। সুতরাং, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১  সি (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’ কিছুতেই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

আরেকটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা হচ্ছে ‘আব্দুল মোমেন খান ফাউন্ডেশন’ যা ‘খান ফাউন্ডেশন’ নামেও পরিচিত। জনাব আব্দুল মোমেন খান অর্থাৎ যার নামে এই ফাউন্ডেশন, তিনি ছিলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান সরকারের খাদ্যমন্ত্রী। ‘খান ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক হলেন মিসেস রোকসানা খন্দকার। তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য জনাব আবদুল মঈন খানের স্ত্রী এবং জনাব আব্দুল মোমেন খানের পুত্রবধূ। তাহলে এটি দিনের আলোর মতো পরিষ্কার যে ‘খান ফাউন্ডেশন’ নামক সংস্থাটির বিএনপি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আছে। ‘খান ফাউন্ডেশন’-এর মতো বিএনপি ‘দলকানা’ একটি সংগঠন যখন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবে তখন তারা কিছুতেই নিরপেক্ষ মতামত দেবে বলে আমরা প্রত্যাশা করতে পারি না। অতএব, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ সি (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘খান ফাউন্ডেশন’ কিছুতেই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।

তিনটি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থার আরেকটি হচ্ছে, ‘লাইট হাউজ’। ‘লাইট হাউজ’ বগুড়ায় নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করতে যাচ্ছে। ‘লাইট হাউজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা হলেন বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান। ‘লাইট হাউজ’-এর নির্বাহী পরিচালক হলেন জনাব হারুনুর রশীদ, যিনি বিএনপির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের আশীর্বাদপুষ্ট ও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে কী? ‘লাইট হাউজ’ নামক সংস্থাটির বিএনপি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিচয় আছে। ‘লাইট হাউজ’-এর মতো বিএনপির ‘দলকানা’ একটি সংগঠন যখন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে যাবে তখন তারাও কিছুতেই নিরপেক্ষ মতামত দেবে বলে মনে করি না।

ফলে, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ সি (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ‘লাইট হাউজ’ কিছুতেই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না। অথচ ইসি ‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’, ‘খান ফাউন্ডেশন’ এবং ‘লাইট হাউজ’-এই তিনটি সংস্থাকেই গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৯১ সি (১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করবার অনুমতি দিয়েছে। যুক্তি হিসেবে ইসি সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ গণমাধ্যমে বলেছেন, ‘এই সংস্থাগুলো ইসিতে নিবন্ধিত। আইনগতভাবে নিবন্ধন বাতিল করা জটিল প্রক্রিয়া। যেহেতু তারা ইসিতে নিবন্ধিত, তাই তাদের পর্যবেক্ষণ থেকে বিরত রাখা যাবে না।’ কী জানি বাবা! কিছুই তো বুঝলাম না। আইন বড়, না নিবন্ধন বড়? যেহেতু এই তিনটি সংস্থারই (‘ডেমোক্রেসি ওয়াচ’, ‘খান ফাউন্ডেশন’ এবং ‘লাইট হাউজ’) বিএনপির মতো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, সেহেতু আইন (গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) ৯১ সি (১) ভঙ্গ করে নিবন্ধন করাটাই তো প্রথম অন্যায়। আর তার ওপরে আইন ভঙ্গ করে এসব নিবন্ধিত ‘দলকানা’ নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে ‘সিন্দাবাদের ভূতের’ মতো পিঠে চড়িয়ে পক্ষপাতমূলক নির্বাচন-এর দায়ভার তো জাতিকেই বইতে হবে। ইসি কি সেই দায়ভারের বাইরে থাকতে পারবে? কখনই না! নাগরিক হিসেবে আমাদের একটাই দাবি, সামনের নির্বাচনে নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক চাই, কোনো কুচক্রী-দালাল নয়!