logo
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
গ্রিক আন্তিগোনে যখন বাংলার রাবেয়া
শুভাশিস সিনহা

গ্রিক আন্তিগোনে যখন বাংলার রাবেয়া

তানভীর মোকাম্মেলের হুলিয়া, নদীর নাম মধুমতি আর চিত্রা নদীর পারে সিনেমাগুলো যে রকম আলোচনায় এসেছে, রাবেয়া তেমনটা আসেনি। কারণটা স্পষ্ট না।  অথচ প্লট, স্টোরি টেলিং, সংলাপ, পরিমিতিবোধ সব মিলিয়ে সিনেমাটি আলোচনার দাবি রাখে। গ্রিক পুরাণের কাহিনী থেকে সোফোক্লিস ‘আন্তিগোনে’ নাটকটি লিখেছিলেন। সেখানে ঈদিপাস আর জোকাস্তার কন্যা আন্তিগোনে, ট্র্যাজেডি হলো, জোকাস্তা ঈদিপাসেরই জন্মদাত্রী, নিয়তির এই পরিহাস বিশ্বসাহিত্যের এক ভূকম্পন। গৃহযুদ্ধে নিহত আপন ভাইয়ের সৎকার করতে বাধা দেন ক্রিয়ন, ফরমান জারি করেন, শাসকের ভয়ে সবাই চুপচাপ। তখন আন্তিগোনে মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে ভাইয়ের সমাধি দেয়। সেই কাহিনীকে তানভীর মোকাম্মেল নবায়ন করেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে। এখানে রাবেয়া গ্রিক পুরাণের সেই আন্তিগোনে।  গল্পটা এরকম : যুদ্ধের সময় এক প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করছিল দুই এতিম বোন রাবেয়া ও রোকেয়া।  দুজন তাদের এক চাচার বাসায় থাকে।  চাচা এমদাদ কাজী মুসলিম লীগের নেতা এবং পরবর্তীকালে চরম পাকিস্তানপন্থি। রাবেয়া-রোকেয়া’র একমাত্র ভাই খালেদ মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন।  একদিন এক গেরিলা অভিযান চালানোর সময় খালেদ শহীদ হন। পাকিস্তান বাহিনীর ক্যাপ্টেনের নির্দেশে খালেদের মৃতদেহ নদীর তীরে ফেলে রাখা হয়। এলাকার চেয়ারম্যান, শান্তি কমিটির লিডার এমদাদ কাজী আদেশ জারি করেন, কেউ যেন খালেদের লাশ কবর দেওয়ার সাহস না দেখায়।  কিন্তু এক রাতে ভাইকে কবর দিতে বেরিয়ে আসে রাবেয়া।  এমদাদ কাজীর লোকজন রাবেয়াকে ধরে নিয়ে আসে। এমদাদ রাবেয়াকে ভর্ৎসনা করেন। চুপ করে থাকে না রাবেয়াও। নিজের পক্ষে যুক্তি দেখায়। সিনেমার শেষে দেখা যায়, গ্রামবাসীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারাও অভিযান চালায় এই গ্রামে। অবশেষে অর্জিত হয় বিজয়। এভাবেই শেষ হয় ১০৫ মিনিটের সিনেমাটি। লক্ষণীয় বিষয়, সিনেমাটি কোথাও উচ্চকিত নয়। মুক্তিযুদ্ধের সিনেমায় সচরাচর যে মেলোড্রামা থাকে, এখানে তা একেবারেই নেই। এক ধরনের নির্লিপ্ত, নৈর্ব্যক্তিক অবজারভেশনের মধ্য দিয়ে তানভীর যুদ্ধকালীন ক্যানভাসটাকে দেখার-দেখাবার চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানি বাহিনী, রাজাকার, মুক্তিযোদ্ধা এবং যুদ্ধ সবই আছে, কিন্তু সবকিছুই একটা লজিক্যাল ডেকোরেশনে বিন্যস্ত। সংলাপ এ সিনেমার প্রধান শক্তি। দূরসম্পর্কিত এক চাচার সঙ্গে এমদাদের কথাবার্তার মধ্য দিয়ে ধর্ম, রাজনীতি আর মানুষের মনোজগৎকে খুব ছোট্ট পরিসরে পেশ করে ফেলেছেন তানভীর। চাচা এমদাদকে তার অন্যায় থেকে সরে আসার জন্য বলেন। এমদাদ বলেন, পাকিস্তান না থাকলে ইসলাম রক্ষা হবে কীভাবে! তখন বুড়ো চাচা বলেন, আল্লাহর ধর্ম আল্লাহই রক্ষা করবেন। ইসলাম রক্ষা করার সে কে! আর সে যে পথ বেছে নিয়েছে, তা-ই যে ইসলামের সঠিক পথ, সে গ্যারান্টি তাকে কে দিয়েছে! তখন এমদাদের মুখে আলো-ছায়ার দোলাচল। কিন্তু এমন একটা দৃঢ়তা শেষত প্রকাশ পায়, যার অর্থ পরিণাম যা-ই হোক, আপাতত তার ফেরার উপায় নেই। একই সঙ্গে বয়াতীর সঙ্গে এমদাদের কথাবার্তার সময় ধর্মের লোকজ আধ্যাত্মিক মর্ম প্রকাশ পায় বয়াতীর বয়ানে, যেখানে মানবধর্মই সারাৎসার। এমন সময় এমদাদের আধপাগল ছেলে হুট করে গান করে ওঠে, ‘শিশুকাল ছিল ভালো, যৌবন কেন আসিল...’ আপাত হিউমার মনে হলেও তাদের আধ্যাত্মিক আলাপ বা বয়াতীকথিত বৈরাগ্যের আলাপে তার এই শরীরী ইশারার গান তর্ক জুড়ে দেয় বৈকি! এমদাদ রাজনৈতিকভাবে যেমন নিষ্ঠুর, ভাতিজা-উপম খালেদের লাশ ফেলে রাখেন রাস্তায়, যাতে তা দেখে লোকজন তাদের পরিণাম আঁচ করে ভয় পায়, তেমনই আবার দ্বিধাগ্রস্তও, এর ওর কাছে মাঝেমধ্যে পরামর্শও চান, আবার আশ্রিতা রাবেয়ার স্পর্ধাকে সহ্য না করলেও তার প্রতি একেবারে খড়গহস্ত হন না, এমনকি নিজের পুত্র তরিকুলের সঙ্গে তার বিয়ের কথাও চিন্তা করেন, পরবর্তী সময়ে যেটা অবশ্য রাবেয়ার ছোটবোন রোকেয়াতে শিফট করে। যুদ্ধকালীন, বিবমিষা, আদর্শের দ্বন্দ্ব, লড়াকু চেতনা সবকিছু নানান চরিত্রের পুষ্পে একটি সুতোয় গাঁথা, যার নাম স্বাধীনতা। মাঝেমধ্যে গল্প বলার অতি ডিটাচমেন্ট সিনেমার গতিকে খানিকটা শ্লথ করে দিয়েছে, কখনো বা মনে হয়, আরেকটু ড্রামাটাইজেশন হতে পারত হয়তো বা, তবু পুরো সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর বুকের ভেতরটায় একটা দেশ আন্দোলিত হয়, সেই অনুভব গভীর। প্রয়াত চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন বরাবরের মতো এখানেও অসাধারণ। সাইকো-পলিটিক্যালি ডিস-হারমোনাইজড এমদাদের চরিত্রায়নে আলী যাকেরের অভিনয় মনে রাখার মতো, রাবেয়ার ভূমিকায় বন্যা মির্জার অতি শোকে কঠিন হয়ে থাকার অভিব্যক্তি, জ্যোতিকা জ্যোতির ইনোসেন্স, তৌকীরের চরিত্রানুগ পাগলামি তো আছেই, ছোট ছোট চরিত্রের অভিনয়ও ছিল সাবলীল।