বারদীতে শতবর্ষী ‘প্যাঁড়া সন্দেশ’|113746|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
বারদীতে শতবর্ষী ‘প্যাঁড়া সন্দেশ’
জহিরুল ইসলাম মৃধা, সোনারগাঁও

বারদীতে শতবর্ষী ‘প্যাঁড়া সন্দেশ’

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বারদীর ‘প্যাঁড়া সন্দেশের’ সুখ্যাতি বহু দিনের। ঠিক কবে থেকে এই অঞ্চলে প্যাঁড়া সন্দেশের প্রচলন তা সুস্পষ্ট করে বলা যায় না। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রায় ১০০ বছরেরও আগে থেকে সোনারগাঁওয়ের বারদীতে প্যাঁড়া সন্দেশ তৈরি হচ্ছে।

বারদী এলাকায় শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর মন্দির এলাকায় শত বছর ধরে প্যাঁড়া সন্দেশ তৈরি হতো। এর প্রমাণ মেলে মন্দিরের অতীত ইতিহাস ঘেঁটে। মন্দিরের পূজারীরা এই সন্দেশ দিয়ে আরাধ্য সাধক শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীকে নিয়মিত ভোগ দিতেন। তবে এখন মন্দিরের ভোগের বাইরেও সাধারণ মানুষ অতিথি আপ্যায়ন থেকে শুরু করে কুটুমবাড়িতে পর্যন্ত প্যাঁড়া সন্দেশ পাঠায়।

‘প্যাঁড়া সন্দেশ’ মিষ্টির জগতের অনেক বড় একটি জায়গা দখল করে নিয়েছে। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্যাঁড়া সন্দেশ তৈরি হলেও এটি সোনারগাঁওয়ে বারদীতে প্রথম শুরু হয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। পুণ্যার্থীরা জানান, হিন্দু সম্প্রদায় সারা বছর বিভিন্ন পূজা-অর্চনা করে থাকেন। তাই প্রতি পূজার সময় পূজারীরা মন্দিরে ভোগ দিয়ে থাকেন। এই ভোগের প্রয়োজন মেটাতে সোনারগাঁওয়ে বারদীতে মহাসাধক শ্রীশ্রীলোকনাথ ব্রহ্মচারীর মূল ফটকের সামনে রঙিন ছাতায় ঘেরা ছোট ছোট মিষ্টির দোকান বসে। এসব দোকান থেকে প্রয়োজনীয় মিষ্টি জাতীয় দ্রব্যাদি কিনে নিয়ে পূজারীরা ম-পে ম-পে দেবীর অর্ঘ্য হিসেবে ভোগ দিয়ে থাকেন।

শুধু বারদীর মধ্যেই নয়, ভক্তরা এটি এখন বিভিন্ন দেশ-বিদেশেও নিয়ে যায়। বারদীতে যারাই আসেন তারা এ সন্দেশ খেতে কিংবা সঙ্গে করে নিয়ে যেতে কখনো ভুল করেন না। গরুর খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি এ বিশেষ ধরনের সন্দেশের রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ একটি স্বাদ। শত বছরের পূর্বে সোনারগাঁও বারদীতে শশীমোহন দে ওরফে বুছা আলই ছোট একটি মিষ্টির দোকান নিয়ে বসেন। পাশাপাশি কারিগর হিসেবে ছিলেন, মাখন দে, পরিতোষ দে ও পচু দে। বর্তমানে বংশপরম্পরায় দোকানের স্বত্বাধিকারী শংকর কুমার দে। তবে প্যাঁড়া সন্দেশ তৈরিতে এখন হিন্দুদের পাশাপাশি মুসলিম ব্যবসায়ীরাও সুনাম অর্জন করেছে।

ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ব্যবসায়ী লোকনাথ সুইটসের স্বত্বাধিকারী শংকর কুমার দে জানান, প্যাঁড়া সন্দেশ তৈরির প্রথম ধাপে তরল দুধের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হয় ক্ষীর। ক্ষীর যখন হাতায় জড়িয়ে আসে তখন উষ্ণ ক্ষীর দুহাতের তালু দিয়ে রোল করে সামান্য চাপ দিলেই তৈরি হয়ে যায় হালকা খয়েরি রঙের প্যাঁড়া সন্দেশ। তৈরির পদ্ধতি খুব সহজ। প্রতিটি প্যাঁড়া সন্দেশ প্রায় আধা ইঞ্চি চওড়া ও দুই ইঞ্চি লম্বা করা হয়ে থাকে। প্রতি কেজিতে ৭৫ থেকে ৮০টি প্যাঁড়া সন্দেশ পাওয়া যায়। এক কেজি সন্দেশ তৈরি করতে দরকার হয় ৭ লিটার তরল দুধ। দুধ আর চিনি ছাড়া অন্য কোনো উপকরণ না থাকায় এই সন্দেশ স্বাভাবিকভাবে রাখা যায় ১০ থেকে ১৫ দিন। আর কৃত্রিম উপায়ে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে এই সন্দেশ ভালো রাখা যায়।

সোনারগাঁও বারদীতে প্যাঁড়া সন্দেশ ব্যবসায়ী ‘জনক জননী পেড়া ঘর’-এর স্বত্বাধিকারী নিত্যানন্দ মনি জানিয়েছেন, বংশপরম্পরায় এখানকার মিষ্টির কারিগররা নিরবচ্ছিন্নভাবে তৈরি ও সরবরাহ করে যাচ্ছেন সোনারগাঁও বিখ্যাত ‘প্যাঁড়া’ সন্দেশ। এই সন্দেশ দেশের মধ্যে পূজা, ঈদসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেই শুধু নয়, আত্মীয়স্বজনের বাড়িতেও নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বেশ কয়েকজন আত্মীয়স্বজন এখানকার প্যাঁড়া সন্দেশ নিয়ে যান। বর্তমানে প্রতি কেজি সন্দেশের দাম ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা। আর স্বাদ ও মানের দিক থেকে এই সন্দেশ অতুলনীয়।