ভোটের মাঠে পুলিশের নিরপেক্ষতা চাই|113827|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১০:৪৮
ভোটের মাঠে পুলিশের নিরপেক্ষতা চাই

ভোটের মাঠে পুলিশের নিরপেক্ষতা চাই

আগামীকালই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। কিন্তু এর মধ্যে বারবার আলোচনায় উঠে এসেছে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বা সব রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য সমান সুযোগের প্রসঙ্গটি। অনেক আলোচনা হচ্ছে নির্বাচনের আগে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দমন-পীড়নে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে। কারণ নির্বাচনকে সুষ্ঠু করতে নিরপেক্ষ পরিবেশের কোনো বিকল্প নেই। আর একটি দলীয় বা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নিরপেক্ষতা আরো বেশি জরুরি। সঙ্গত কারণেই নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন আর পুলিশ প্রশাসনকে ঘিরেই যাবতীয় আলোচনা-সমালোচনা আবর্তিত হচ্ছে। পুলিশ রাষ্ট্রের অপরিহার্য কাঠামোগুলোর একটি। রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর মধ্যে পুলিশই একমাত্র শক্তিশালী সংগঠন যার বিস্তৃতি

তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। ক্রিমিনাল জাস্টিস কাঠামোর একটি অপরিহার্য উপাদান পুলিশ। পুলিশের হাতেই আছে আইনকে প্রয়োগের ক্ষমতা। তাই, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবে পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অপরিহার্য অংশ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল রাখা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা কোনোভাবেই পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা ছাড়া সম্ভব নয়।

কিন্তু, বাংলাদেশের বাস্তবতা কী? ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন বাংলাদেশ পুলিশের ভিত্তিমূলের একটি। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরিপ্রেক্ষিতে একটি দমনমূলক পুলিশ বাহিনী গঠনই ছিল ব্রিটিশদের এই আইন প্রণয়নের লক্ষ্য। আইনটি প্রণয়নের শত বছর পরেও এটি সংশোধন পরিমার্জনের খুব বেশি উদ্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা যায়নি। পুলিশ সংস্কার আইন নিয়ে এত উদ্যোগের পরেও তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে পুলিশ তার বাহিনীসুলভ আচরণ থেকে বের হয়ে এখনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ নিতে পারেনি। তাই হরহামেশাই পুলিশ বাহিনী গণমাধ্যমের সংবাদ হয়। ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রের পথে বাংলাদেশের নতুন অভিযাত্রা শুরু হওয়ার পরও সব সরকারই চেষ্টা করেছে পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশে ব্যবহারের। পুলিশ একটি সুশঙ্খল বাহিনী যা চেইন অব কমান্ড দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। অথচ প্রত্যেকটি রাজনৈতিক সরকারের সময়ই দেখা যায় একটি বিশেষ গোষ্ঠী বাহিনীর নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বিভিন্ন সময়ের গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, একজন কর্মকর্তার ব্যাচমেটই তার বস হয়ে এসে তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন লিখছেন। অথচ ঐ কর্মকর্তা বছরের পর বছর ধরে একই পদে রয়ে যাচ্ছেন। একটি বিশেষ ব্যাচের কর্মকর্তারাই গুরুত্বপূর্ণ সব পদে থেকে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব রাখার খবরও আমরা পড়ি। এমন অজস্র ঘটনা সব সরকারের সময়ই দেখা যায়। এছাড়া পুলিশকে একটি নিরপেক্ষ পেশাদার বাহিনীতে রূপ দেওয়ার জন্য খুব বেশি চেষ্টা সরকার থেকেও দেখা যায় না। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর নিরপেক্ষতার ঘাটতি একটি সাধারণ প্রচলিত বিষয়।

বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনের সময় মূল ভূমিকা পালন করে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের বিস্তৃত একটি ক্ষমতা বাংলাদেশের সংবিধান ও নানা আইনেই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ক্ষমতার কোনো মূল্যই থাকে না যখন পুলিশের চেইন অব কমান্ড দুর্বল থাকে। যার প্রমাণ আমরা দেখি ফেইসবুকসহ নানা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতেÑ যেখানে পুলিশ কর্মকর্তারা সরকারি দলের পক্ষে ভোট চাইছেন, দলীয় পরিচয় জাহিরের চেষ্টা করছেন। গণমাধ্যমের খবরে আমরা হাজার হাজার গায়েবি মামলার কথা শুনি। যে সব মামলায় আটক করা হয়েছে বিরোধী পক্ষের নেতাকর্মীসহ অনেক সাধারণ মানুষকে। এমনও দেখা গেছে, দেশের বাইরে থেকেও বোমা হামলার আসামি হতে হয়েছে। নানা জায়গায় গায়েবি মামলায় মৃত ব্যক্তিকেও আসামি করেছে পুলিশ। কারাগারে থেকেও মামলার আসামি হয়ে গেছেন সাম্প্রতিক সময়ে এমন খবরও আমরা দেখি।

প্রতি নির্বাচনের সময় পুলিশ গুরুত্ব দেয় অস্ত্র উদ্ধার অভিযানসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দিকে। কিন্তু এবার পুলিশকে বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলোর নেতাকর্মীদের শায়েস্তা করার ক্ষেত্রে। নির্বাচনের সময় দায়িত্ব পালন করা পোলিং কর্মকর্তাদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করে দলীয় পরিচয় জানার চেষ্টা করেছে পুলিশ। ফলে নির্বাচনের আগেই পুলিশের নিরপেক্ষ ভূমিকা নিয়ে জনমনে সংশয় দেখতে পাওয়া যায়। এছাড়া বিরোধী নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে হেনস্তা করা, প্রার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করার কারণে নির্বাচনের আগের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে যা বোঝায় সেটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েই গেছে। ক’মাস আগে পুলিশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অনুসন্ধান শুরু করেছিল বলে পত্রিকায় খবরও এসেছে। এসব ভূমিকার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ছোট ঘটনা হলেও এসব ঘটনার প্রভাব অনেক বিস্তৃত। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে পুলিশের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ে। এমনিতেই পুলিশের ভাবমূর্তি সব রাজনৈতিক সরকারের সময়ে থাকে সংকটে। আর নির্বাচনের সময় পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে মানুষের কাছে একটি মন্দ বার্তাই নিয়ে যায়।

অথচ পুলিশ সমাজের বাইরের কোনো বাহিনী না। সবচেয়ে শক্তিশালী ও তৃণমূল পর্যন্ত বিস্তৃত বেসামরিক বাহিনী বাংলাদেশ পুলিশ। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের রয়েছে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা। নয় মাসের রণাঙ্গনে শহীদ হয়েছেন ৭৫১ জন পুলিশ সদস্য। তাই দেশপ্রেমিক একটি বাহিনী হিসেবে পুলিশের কাছে মানুষের প্রত্যাশা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করে দেশের গণতন্ত্রের যাত্রাকে সুসংহত করে মুক্তিযুদ্ধের আকাক্সক্ষাকে সমুন্নত রাখা।