পুলিশ বলল, ‘আর ভোট দেওয়া লাগবে না, ভোট শেষ’|114075|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৯:০২
পুলিশ বলল, ‘আর ভোট দেওয়া লাগবে না, ভোট শেষ’
ফখরুল ইসলাম, সিলেট

পুলিশ বলল, ‘আর ভোট দেওয়া লাগবে না, ভোট শেষ’

ভোটকেন্দ্রের নাম পাঠানটুলা জামেয়া ইসলামীয়া কামিল মাদ্রাসা। কেন্দ্রটি সিলেট নগরীর মদিনা মার্কেট এলাকায় অবস্থিত। এটি সিলেট-১ (মহানগর-সদর) আসনের অন্তর্ভুক্ত। রবিবার বেলা পৌনে ২টায় ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসা ভবনের সামনের অংশের অনেকগুলো কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে নিচে পড়ে আছে।

মাদ্রাসার মূল ফটক দিয়ে বের হয়ে কয়েক হাত দূরেই ছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থীর অস্থায়ী কার্যালয়। ভোটারদের টোকেন নম্বর দেওয়ার জন্য কার্যালয়টি খোলা হয়েছিল। সেই কার্যালয়ের ৪-৫টি চেয়ার ভেঙে চুরমার হয়ে আছে। কার্যালয়ের সামনেই এক আওয়ামী লীগ নেতার আগুনে পোড়া মোটরসাইকেল পড়ে আছে।

কেন্দ্রটিতে ঢুকে দেখা যায়, ভিতরে কোন ভোটার নেই। প্রিসাইডিং অফিসারসহ অন্যরা দুপুরের খাবার খাচ্ছেন। খাবার খেতে খেতে প্রিসাইডিং অফিসার সৈয়দ মোহাদ্দিস আহমদ বলেন, ‘এই কেন্দ্র কেবল পুরুষ ভোটারের জন্য। এখানে ভোট রয়েছে ৩ হাজার ১৮৬টি। সকাল থেকে ভালোভাবে ভোট চললেও সাড়ে ১১টার দিকে গণ্ডগোল সৃষ্টি হয়।’

তিনি জানান, কেন্দ্রের বাইরে দুইপক্ষের মধ্যে প্রায় ঘণ্টাব্যাপী ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়েছে। বেশ কয়েক রাউন্ড গুলির শব্দও শোনা গেছে। ভোটকেন্দ্রের গ্লাসও ভাঙচুর হয়েছে।

ওই ঘটনার পর থেকে ভোটারের উপস্থিতি কম। তবে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়নি জানিয়ে প্রিসাইডিং অফিসার বলেন, ‘ভোটার এলেই তার ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে।’ বেলা ২টার দিকে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার সময় কেন্দ্রের প্রধান ফটকে দেখা যায়, একজন ভোটার টোকেন হাতে নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন। তিনি ভোট দেওয়ার জন্য ভিতরে যেতে চান, তবে দায়িত্বরত পুলিশ তার পথ আগলে বলেন, ‘আর ভোট দেওয়া লাগবে না, ভোট শেষ।’ একই সঙ্গে ওই পুলিশ সদস্য তার সঙ্গীদেরও বলে দিলেন, ‘কোন ভোটারকেই যেনো আর ভিতরে ঢুকতে দেওয়া না হয়।’

ওই ভোটকেন্দ্রের বাইরে এসে একাধিক লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সকালে প্রথমে বিএনপির একটি টোকেন অফিস ভাঙচুর করে আওয়ামী লীগের লোকজন। এরপর বিএনপি-জামায়াতের কর্মীরা পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে আওয়ামী লীগের অফিস ভাঙচুর করেছে। আওয়ামী লীগকর্মী আব্দুর রাজ্জাক রাজার মোটরসাইকেলও পুড়িয়েছেন তারা।

সিলেট নগরীর শিবগঞ্জে অবস্থিত স্কলার্সহোম স্কুল কেন্দ্রে দুপুর ১২টায় গিয়ে দেখা যায়, লাইনে কোন ভোটার নেই। স্কুলের দ্বিতীয় তলায় ভোটকক্ষের দরজার সামনে ২-৩ জন ভোটার। প্রিসাইডিং অফিসার আমিন মোহাম্মদ সাঈদ স্কুলের আঙিনায় হাঁটাহাঁটি করছেন।

এই কেন্দ্রে মোট ভোট ২ হাজার ৪৬৩। বেলা ১২টার মধ্যে অর্ধেক ভোট গ্রহণ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে কেন্দ্রের বাইরে গণ্ডগোল হওয়ায় ভোটার কম আসছেন।’

কেন্দ্র থেকে বের হয়ে দেখা যায়, শিবগঞ্জ মূল সড়কে অসংখ্য ইট-পাথর পড়ে আছে। সাড়ে ১১টার দিকে এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এটা তারই চিহ্ন। একজন পান দোকানী জানান, ভোটকেন্দ্রের পাশের লামাপাড়া গলির মুখে কিছু লোক অবস্থান নিয়ে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিচ্ছিলেন। এ নিয়েই সংঘর্ষ হয়েছে।

সকাল সাড়ে ৮টায় নগরীর নয়াসড়কে কিশোরীমোহন বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, পুরুষ ও নারী ভোটারের দুইটি লাইনেই ভালো উপস্থিতি। কেন্দ্রের ভিতরে গিয়ে কথা হয়, ধানের শীষের এজেন্ট নীলিমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, ভোট সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে। তার পাশে বসা নৌকার এজেন্ট লুৎফা বেগমও এতে সায় দেন। এই কেন্দ্রে লাইনে দাঁড়ানো তরুণী ভোটার সামিয়া সিরাজ বলেন, ‘জীবনে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিচ্ছি। খুব আনন্দ লাগছে।’

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর বন্দরবাজারের দুর্গাকুমার পাঠশালা কেন্দ্রে ভোট দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। তিনি তার ছোট ভাই, সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ড. এ কে আবদুল মোমেনসহ পরিবারের সদস্যদে সঙ্গে নিয়ে ভোট দিয়েছেন।

ভোট দিয়ে বেরিয়ে এসে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, ‘অত্যন্ত চমৎকার পরিবেশে ভোট হচ্ছে।’

এসময় ড. মোমেন বলেন, ‘মানুষ ঈদ উৎসবের মতো আনন্দিত মনে ভোট দিচ্ছে। কেন্দ্রের ভিতরে ধানের শীষের এজেন্টরাও সুখে-শান্তিতে দায়িত্ব পালন করছেন। কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না।’ এসময় তিনি জয়ের ব্যাপারেও দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বিকাল ৩টায় নগরীর ইলেকট্রিক সাপ্লাই রোডে নিজের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন সিলেট-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার  আবদুল মুক্তাদির। এসময় তিনি বলেন, ‘এটা কোন ভোট নয়, ভোটের নামে প্রহসন। অনেক কেন্দ্রে রাতেই ব্যালটে নৌকা প্রতীকে সিল মেরে বাক্স বোঝাই করে রাখা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ কেন্দ্রেই বিএনপির এজেন্টদের মারধর, হুমকি দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে। ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমি নিজে দারুস সালাম মাদ্রাসা কেন্দ্রে গিয়ে প্রার্থী পরিচয় দিয়েও ভিতরে ঢুকতে পারিনি। একজন পুলিশ সদস্যকে আমি পরিচয় দিয়ে ভিতরে ঢুকতে চাইলে তিনি হেঁটে ভিতরের দিকে চলে যান। এর মিনিট দুয়েক পরে কেন্দ্রের ভিতর থেকে ফাঁকা গুলির শব্দ শুনতে পাই। এটাই হলো নির্বাচনের চিত্র।’

সিলেট-১ আসনে মোট দশজন প্রার্থী গতকালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তবে বেশিরভাগ কেন্দ্রেই নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক ছাড়া অন্য প্রার্থীদের এজেন্টের দেখা মিলেনি।