রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি দিনে কেন্দ্র দখল, অভিযোগ ধানের শীষ প্রার্থীর|114078|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১৯:৩৮
রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি দিনে কেন্দ্র দখল, অভিযোগ ধানের শীষ প্রার্থীর
বিজয় চক্রবর্তী কাজল, নীলফামারী প্রতিনিধি

রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি দিনে কেন্দ্র দখল, অভিযোগ ধানের শীষ প্রার্থীর

বড় কোনো ধরণের সহিংসতা ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে নীলফামারী জেলার ৪টি সংসদীয় আসনের ভোট গ্রহণ।

রোববার সকাল আটটা থেকে জেলার মোট ৫০৯টি ভোট কেন্দ্রে এক যোগে ভোট গ্রহণ শুরু হয়ে বিকাল চারটা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোট গ্রহণ চলাকালে কেন্দ্রগুলোতে ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতি দেখা গেছে।

এদিকে নীলফামারী-৩ আসন জলঢাকা উপজেলার একটি কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা করার সময় পুলিশ পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

অপর দিকে ভোট গ্রহণের মাঝপথে এসে ভোটকেন্দ্র দখল, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া এবং ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধার সৃষ্টি অভিযোগ তুলে নীলফামারী-২ ও নীলফামারী-৩ আসনের বিএনপি প্রার্থী ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে সরে দাঁড়ান।

সারাদিন নীলফামারীর ৪টি সংসদীয় আসনে সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে,  প্রত্যেকটি ভোট কেন্দ্রে  ভোটরা নির্দিষ্ট লাইনে উপস্থিত হয়ে অপেক্ষামান ছিলেন ভোট প্রদানে। 

সকাল আটটা ৩০ মিনিটে নীলফামারী-২ আসনে জেলা শহরের আলিয়া মাদ্রাসা ভোট কেন্দ্রে দেখা গেছে ভোটারদের দীর্ঘ লাইন। এসময় পুরুষের চেয়ে মহিলা ভোটারদের উপস্থিতি দেখা গেছে বেশি। ওই ভোট কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা রাজ্জাকুল ইসলাম জানান, কেন্দ্রটির ২টি পুরুষ এবং ৩টি মহিলা বুথে আধা ঘণ্টায় ভোট পড়েছে ৩০০টি। কেন্দ্রটিতে ভোট সংখ্যা ২ হাজার ৫২০।

সকাল ৯টার দিকে শহরের উদয়ন শিশু বিদ্যাপিঠ ভোটকেন্দ্রে দেখা গেছে একই অবস্থা। সেখানে ভোটার সখ্যা ২ হাজার ৯৫৪। ওই কেন্দ্রে সকাল ১০টায় সাধারণ ভোটারদের সাথে লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট প্রদান করেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। জেলা শহরের পুলিশ লাইনস স্কুলে ভোটকেন্দ্রেও উৎসব মুখর পরিবেশ দেখা গেছে ভোটারদের মধ্যে। একইভাবে জেলার অন্যান্য আসনে শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠানের খবর পাওয়া গেছে।

শহরের উদয়ন শিশু বিদ্যাপিঠ কেন্দ্রে ভোট প্রদান করে সন্তোষ প্রকাশ করে নতুন ভোটার লিপি আক্তার বলেন, ‘প্রথম ভোট শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দিতে পেরে আমার খুব ভালো লাগছে। ভোট দেওয়ার পর নিজেকে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে মনে হচ্ছে।’

অপর ভোটার রোখসানা আনজুম লিজা বলেন, ‘দীর্ঘ ১০ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট হচ্ছে। তাই সকাল সকাল এসেছি ভোট কেন্দ্রে। কেন্দ্রে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ দেখে ভালো লাগছে।’

ওই কেন্দ্রে সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে ভোট প্রদান করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী ও নীলফামারী-২ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী আসাদুজ্জামান নূর।

ভোট প্রদান শেষে তিনি বলেন,‘সারা দেশের ন্যায় নীলফামারীতেও শান্তিপূর্ণ ভোট অনিুষ্ঠিত হচ্ছে। নারী ভোটারদের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক।’

এদিকে সকাল ১১টার দিকে নীলফামারী-৩ আসনের শিমুলবাড়ি ইউনিয়নের বেরুবন্দ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে দখলের চেষ্টা চালায় ধানের শীষ প্রতীকের লোকজন। এসময় পুলিশ পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেখানে হতাহতের কোনো ঘটনা না ঘটলেও আধা ঘন্টা ভোট গ্রহণ বন্ধ থাকে ওই কেন্দ্রে। ঘটনাস্থল থেকে ধানের শীষ প্রার্থীর পক্ষে খয়রাত হোসেন (৪০) নামে এক ব্যক্তিকে  আটক করেছে পুলিশ। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুণরায় ভোট গ্রহণ শুরু হয় সেখানে।

ওই কেন্দ্রের প্রিজাইডিং কর্মকর্তা হাসানুর রহমান শাহিন ঘটনা নিশ্চিত করে বলেন, ‘কেন্দ্রের বাহিরে ধানের শীষ প্রতীক ও লাঙ্গল প্রতীকের লোকজন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। পরে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এসময় এক ব্যক্তিকে আটক করা হয়। ভোট গ্রহণ শেষে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।’

সকাল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ভোট গ্রহণ চললেও মাঝপথে এসে ভোট বর্জণের ঘোষণা দেন নীলফামারী-২ ও নীলফামারী-৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দুই জামায়াত নেতা। দুপুর একটার দিকে নিজ নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে এবং মুঠোফোনের মাধ্যমে ভোট বর্জন করে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। এরা হলেন নীলফামারী- ২ (সদর) আসনের ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর মনিরুজ্জামান মন্টু ও নীলফামারী-৩ (জলঢাকা) আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী কেন্দ্রীয় সুরা কমিটির সদস্য আজিজুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে মনিরুজ্জামান মন্টু বলেন,‘সুষ্ঠ নির্বাচনের পরিবেশ নেই। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্র দখল করে বাক্স ভর্তি করেছেন। তারা ধানের শীষের এজেন্টদের  কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন। ধানের শীষের ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধার সৃষ্টি করেছেন। এ অবস্থায় আমি ভোট বর্জন করলাম। এটি আমার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত।’

ওই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী আব্দুস সাত্তার, শহর জামায়াতের আমীর আল ফারুক, বিএনপি নেতা আলমগীর হোসেন, জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আখতারুজ্জামান জুয়েল, জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মারুফ পারভেজ প্রিন্স প্রমুখ।

অপরদিকে কেন্দ্র দখল, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি, ভোটারদের কেন্দ্রে আসতে বাধা সৃষ্ঠি ও ভোটকেন্দ্র থেকে এজেন্ট বের করে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন নীলফামারী-৩ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী কেন্দ্রীয় জামায়াতের সুরা সদস্য আজিজুল ইসলাম। তিনি বেলা ১টার দিকে সাংবাদিকদের মুঠোফোনে ওই ভোট বর্জনের কথা জানান।

অভিযোগ অস্বীকার করে নীলফামারী-২ আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘সকাল থেকে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে এসে ভোট প্রদান করেছেন। সেটি কর্তব্যরত সাংবাদিকসহ সকল মানুষ দেখেছেন। নৌকার গণজোয়ার দেখে ভয়ে ভীত হয়ে নীলফামারী-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী মনিরুজ্জামান মন্টু ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন, এটি তাদের নৈতিক পরাজয়। অপরদিকে এটি চাতুরীও হতে পারে, ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়ে কেন্দ্র ফাঁকা করে জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ খুঁজছেন।’

জেলা রিটানিং কর্মকর্তা জেলা প্রশাসক নাজিয়া শিরিন বলেন,‘নীলফামারীর ৪টি সংসদীয় আসনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরেপেক্ষ ভাবে নির্বাচনের ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে জেলার সংসদীয় আসন নীলফামারী-৩ এ একটি ভোট কেন্দ্রে দখলের চেষ্ঠা করে সন্ত্রাসীরা। কিন্তু সেখানে পুলিশ ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা। কেউ ভোট বর্জন করেছে কিনা তা আমার জানা নেই।

এবার নীলফামারী জেলার চারটি সংসদীয় আসনে  মোট ভোটার ছিল ১২ লাখ ৯২ হাজার ৪৪০ জন। চারটি সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও অন্যান্য দলের মোট ২০ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।