গণতন্ত্র কেবল একদিন নয় প্রতিদিন চর্চার বিষয়|114142|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
গণতন্ত্র কেবল একদিন নয় প্রতিদিন চর্চার বিষয়
রোবায়েত ফেরদৌস

গণতন্ত্র কেবল একদিন নয় প্রতিদিন চর্চার বিষয়

গণতন্ত্র কেবল একটি সরকারব্যবস্থা নয়, গণতন্ত্র হচ্ছে একটি মূল্যবোধ, একটি দৃষ্টিভঙ্গি, একটি জীবনব্যবস্থা। গণতন্ত্র বা এই মূল্যবোধের মূল কথা হলো সহনশীলতা, পরমতসহিষ্ণুতা; অন্যের মতামতকে সম্মান করা অন্যের মতামতকে শ্রদ্ধা করা। ভোটের মধ্য দিয়ে একদল জয়ী হবে, এক দল পরাজিত হবে। ইশতেহার অনুসারে নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারল কি না জনগণের পক্ষ থেকে সেটার একটি চূড়ান্ত জবাব পাওয়া যায় এই ভোটে। কিন্তু আমরা দেখি যে, ক্ষমতার চেয়ারের হাতলে হাত রাখলেই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কর্পূরের মতো উড়ে যায়, রাজনৈতিক দলগুলো ভুলে যায় যে, কেন তাদের পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল। পাঁচ বছরের অপেক্ষা শেষে জনগণ এই ভোটে রাজনৈতিক দলগুলোকে জানিয়ে দেয়, আমি তোমাদের চাই কিংবা চাই না, এই কারণে গণতন্ত্রে এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এখন পর্যন্ত আমরা দেখছি যে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে। এটুকু আমরা সবাই মেনে নিচ্ছি এবং এটা খুবই আনন্দের জায়গা। কিন্তু নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হচ্ছে, কতটা গ্রহণযোগ্য হচ্ছে সেটা আরেকটা প্রশ্ন। গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নটি দেশে এবং বিদেশে দুই জায়গাতেই উঠবে। আর নির্বাচন কতটা বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে, ভোটারদের অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে কি না সেটা একটা বড় প্রশ্ন। কেননা রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ এক কথা আর ভোটারদের অংশগ্রহণমূলক হওয়া আরেক কথা। আমার মনে হয় সেখানে অনেকখানি ব্যত্যয় আছে, অনেকখানি ঘাটতি আছে।

এই নির্বাচন একটা পরীক্ষা

আমার মনে হয় এই সব মিলিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি অনেকভাবেই একটা ‘টেস্ট কেইস’ হিসেবে হাজির হয়েছে। কেননা একটা দলীয় বা রাজনৈতিক সরকারের অধীনে একটা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব কি না সেই প্রশ্নটি এখানে সামনে চলে এসেছে। আমি মনে করি সেটা আসলে সম্ভব না।

প্রথমত, তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত একুশ দিনে কিন্তু সেটা একভাবে প্রমাণিত হয়েছে। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা থেকে শুরু করে সবখানে সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করাসহ নানা ক্ষেত্রেই নির্বাচন কমিশন ব্যর্থ হয়েছে। শাসকবর্গের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, পুলিশ থাকে, র‌্যাব থাকে এবং অনেকখানি ‘মাসল পাওয়ার’ বা পেশিশক্তি থাকে, টাকাপয়সাও থাকে অনেকখানি। এসব মিলিয়ে কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা নির্বাচনী প্রচারটা একপক্ষীয় করতে সক্ষম হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, শুধু প্রচার-প্রচারণা না, শাসকদল কিন্তু আদালতকেও ব্যবহার করেছে। উপজেলা চেয়ারম্যানদের যে আসনগুলোতে প্রার্থিতা বাতিল হয়ে গেল তার কথাই ধরুন। নির্বাচন কমিশন তাদের প্রার্থিতা অনুমোদন দিয়েছিল কিন্তু আদালতের কাছে আবার যেয়ে তাদের প্রর্থিতা বাতিল করাটা ঠিক হয়নি। এটা কিন্তু পুরোপুরি ক্ষমতাসীনদের পক্ষে গেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান বা নির্বাচিত মেয়রদের প্রার্থিতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কেননা আওয়ামী লীগের শাসনামলেই এই প্রশাসন, এই পুলিশ এগুলোকে উপক্ষো করে এসব পদে নির্বাচিত হওয়াটাই প্রমাণ করে তাদের বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে। কাজেই তাদের এই আসনগুলো একদম সাচ্চা কাটা গেছে বলা যায়।

তৃতীয়ত, শাসক দল ছাড়া বাকিদের অনেকেই এমনকি পোলিং এজেন্ট দিতে পারেননি, পোলিং এজেন্টদের বিষয়ে খোঁজখবর করা, বিরোধী প্রার্থীদের দমনপীড়ন, তাদের এবং তাদের কর্মী-সমর্থকদের ওপর মামলা-হামলার অনেক ঘটনা ঘটেছে। ফলে নির্বাচনী পরিবেশ বলতে আমরা যেটা বুঝি, সবার জন্য সমান সুযোগ এবং উৎসবমুখর পরিবেশের কিন্তু একটা অনেক বড় ঘাটতি আমরা দেখেছি। এসব মিলিয়ে অনেকেই মনে করছেন এটা আসলে একটা সাজানো নির্বাচন হচ্ছে। কারা কতটা আসন পাবে সেটা যেন ঠিক করাই আছে। বিএনপিকে আর তাদের শরিকদের কয়টা আসন দেওয়া হবে, আওয়ামী লীগ আর তার শরিকরা কতটা আসন পাবে এসব হয়তো আগেই নির্ধারণ করা হয়ে গেছে। এই কারণেই কি ভোটকেন্দ্রে মানুষ কম গেছে, যে গিয়ে কী হবে, ভোট দিয়ে কী হবে এই প্রশ্ন কি মানুষের মনে এসেছে। কাজেই সব মিলিয়ে আমরা আরেকটি বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখলাম।

গণতন্ত্র বনাম দলতন্ত্র সমাচার

নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর জয় কিংবা পরাজয় মেনে নেওয়ার যে সাংস্কৃতিক যোগ্যতা সেটা আমাদের তৈরি হয়নি। এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার পরও ফল মেনে নেওয়ার যোগ্যতার ঘাটতি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রয়েই গেছে। কারণ দলগুলোর ভেতরে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের ঘাটতি আছে। আমরা দেখছি যে, ‘প্যাট্রিয়ার্কি’ বা ‘পুরুষতন্ত্র’-এর মতোই ‘পার্টিয়ার্কি’ বা ‘দলতন্ত্র’ বলে একটা বিষয় এখন সামনে চলে এসেছে। পুরুষতন্ত্র চায় সমস্ত জায়গায় নারীর অধিকারকে সংকুচিত করে পুরুষের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে, সেটা চর্চা করতে। তেমনি এই ‘দলতন্ত্র’ সমস্ত জায়গাগুলোকে খেয়ে ফেলতে চায়। এই কথাগুলো বলতে গেলে তা হয়তো এখন ক্ষমতাসীন দলের বিপক্ষে যাবে, কিন্তু বিশ্লেষক হিসেবে এগুলো আমাকে বলতেই হচ্ছে। আমরা দেখলাম যে, সরকারি দল কিন্তু সবাইকেই তাদের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করেছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ব্যবহার করেছে, শিল্পীদের ব্যবহার করেছে, ক্রিকেটারদের ব্যবহার করেছে। এটা না করলেও হতো। শিক্ষকের কাজ শিক্ষকতা করা, শিল্পীর কাজ ছবি আঁকা, সাংবাদিকের কাজ সাংবাদিকতা করা। তারা রাজনীতি সচেতন হবেন সেটা এক কথা আর তাদের রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা আরেক বিষয়। এবারের নির্বাচনী প্রচারে কিন্তু আওয়ামী লীগকে প্রায় সকল পেশাজীবীদের এভাবে ব্যবহার করতে দেখলাম আমরা। এই প্রবণতা কিন্তু কেবল আওয়ামী লীগের না, সব দলেরই আছে। আমি যেমন দেখেছি আওয়ামী ভাঙারি লীগ আছে, আওয়ামী শিশু লীগ আছে; তেমনি জাতীয়তাবাদী সাপুড়ে দল আছে, জাতীয়তাবাদী মৎস্যজীবী দলও আছে। এগুলোই হচ্ছে দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দৃষ্টান্ত।

সক্রিয় সংসদের সোনার হরিণ

এখন প্রশ্ন হচ্ছে এমন একটা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কি আমরা একটা সক্রিয় সংসদ দেখতে পাব? আমার তা মনে হয় না। গতবারের সংসদকে আমরা বলতাম ‘হাঁসজারু’, অর্থাৎ ‘যেটা হাঁস সেটাই সজারু’। জাতীয় পার্টি বিরোধী দল আবার তারাই সরকারে আছে, তারাই সরকারি দল। কিন্তু সংসদ তো হলো রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য, আইন প্রণয়নের জন্য বিতর্কের জায়গা। ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ার যেমন বলেছিলেন, ‘আমি তোমার সঙ্গে দ্বিমত করতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলতে দেওয়ার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত দিতে পারি’। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এখনো সেখানে উন্নীত হয়নি। আমরা একদলকে আরেক দলের সঙ্গে খালি কাদা ছোড়াছুড়ি করতেই দেখি। পরিস্থিতি আরো ভয়ঙ্কর। এখানে একদল আরেক দলের ধ্বংস কামনা করে, এমনকি নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চায়। যেটা বিএনপির পক্ষ থেকে দেখা গেছে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায়। আরো আগে থেকেও আমাদের এখানে এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সংস্কৃতি আছে, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে জাতীয় চারনেতা হত্যাকাণ্ডসহ অনেক বড় বড় দৃষ্টান্তই রয়েছে। আর এখনো দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হামলা-মামলা দিয়ে ঘায়েল করার সংস্কৃতি। ফলে আমরা কিন্তু গণতন্ত্রের পরমতসহিষ্ণুতার পথে হাঁটতে পারছি না। গণতন্ত্র তো আসলে কেবল নির্বাচন বা একদিনের বিষয় না। এটা প্রতিদিন চর্চা করার বিষয়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই নির্বাচনের ফল ঘিরে নতুন কোনো রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছি? আমরা কি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, হরতাল-অবরোধ, সংসদ বর্জন এই সব ঘটনাপ্রবাহের দিকে এগুচ্ছি?

এককেন্দ্রিক ক্ষমতা কিংবা স্বৈরাচার

রাজনৈতিক দার্শনিকরা বলেন, যে কোনো ক্ষমতারই একটা ধরন হচ্ছে ‘স্বৈরাচারী’ হওয়া। বাসায় তিনটা কাজের লোক রাখলে যেমন আমরা দেখি, যে বয়োজ্যেষ্ঠ সে বাকি দুজনের ওপর প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। সামান্য ক্ষমতা পেলেই আমরা স্বৈরাচারী হয়ে উঠি। এটা পরিবারে, অফিসে, সব জায়গাতেই হয়। এ জন্য ক্ষমতাকে পাহারা দেওয়া বা একটা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’-এর মধ্যে রাখতে হয়। যে কারণে আমরা পশ্চিমা গণতন্ত্রকে এই ক্ষমতার ভারসাম্যের রাজনীতির মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে দেখি। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার একটা ভারসাম্য থাকবে। আদালতের সঙ্গে সংসদের ক্ষমতার ভারসাম্য থাকবে। কিন্তু আমাদের এখানে সেই ভারসাম্যটা নেই। সবখানেই এককেন্দ্রিক ক্ষমতা। যিনি দলের প্রধান, তিনিই সংসদের প্রধান, তিনিই প্রধানমন্ত্রী হন এবং সংবিধানের সব ক্ষমতাই তাকে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্রপতির কোনো ক্ষমতা সেই অর্থে নেই, মন্ত্রিপরিষদের হাতেও তেমন কোনো ক্ষমতা নেই।

ফলে রাষ্ট্রক্ষমতার যে ভারসাম্য, সেটা কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানেই  নেই। আর এটা কেবল সংসদ বা সরকারের বিষয় না, আমাদের সামাজিক-সংস্কৃতিতেও কিন্তু এই একই চিত্র দেখা যায়। সংসদে যেমন আমরা ৭০ অনুচ্ছেদের কথা বলি, যেখানে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সংসদের সদস্য পদই বাতিল হয়ে যাবে। কিন্তু সংসদের বাইরে কি কোনো নেতা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কথা বলতে পারছেন? রাজনৈতিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র না থাকার এই প্রভাবটা দল থেকে সংসদ, সংসদ থেকে সমাজ সব জায়গাতেই সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আওয়ামী লীগে যেমন কেউ শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে দলে কোণঠাসা হয়ে পড়বেন, তেমনি বিএনপিতেও কেউ খালেদা জিয়া বা তারেক জিয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করলে কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। ফলে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সংসদ যাত্রা শুরু করবে তা নিয়ে আমি খুব একটা আশাবাদী না।

উন্নয়ন আর গণতন্ত্র

আরেকটা বিষয় হলো আমরা এখানে ইদানীং উন্নয়ন আর গণতন্ত্রকে একসঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে দেখছি। এই দুইয়ের মধ্যে কোনো বিরোধ যেমন থাকার কথা না, তেমনি এই দুটোকে গুলিয়ে ফেলারও কোনো সুযোগ নেই। অনেকে মালয়েশিয়ার উদাহরণ দেন। বলেন যে, মাহাথির মোহাম্মদ একটু স্বৈরাচারী ছিলেন কিন্তু তিনি মালয়েশিয়ার উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্র না থাকলে কি হয় তারও একটা বড় উদাহরণ কিন্তু মাহাথির নিজেই। মাহাথিরকে যে ৯২ বছর বয়সে এসে আবার নির্বাচনে অংশ নিতে হয়, আবার তাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হয়। কেননা তিনি বুঝতে পারলেন যে, এখানে উন্নয়ন দিতে পেরেছেন কিন্তু গণতন্ত্র দিতে পারেননি। এটাই ট্র্যাজেডি।

আমরা অতীতে দেখেছি যে, সামরিক শাসক এরশাদ বিভিন্ন সময়ে তাকে স্বৈরাচার বলা নিয়ে কথা বলেছেন। উনি বলতেন যে, ‘স্বৈরশাসক’ কথাটার মধ্যে উনি কোনো সমস্যা দেখেন না। ওনার ভাষায় জনগণ বোঝে আসলে স্বৈরশাসক মানে কি। অর্থাৎ এভাবে শব্দের আসল অর্থটা পাল্টে ফেলার চেষ্টা করা। স্বৈরশাসক অভিধার নেতিবাচক ব্যবহারটাকে পাত্তা না দিয়ে তারা এটাকে ইতিবাচক হিসেবে সামনে আনতে চায়। কিন্তু সামরিক শাসক এরশাদের এই চিন্তা আজকের কোনো গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে থাকাটা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা জানি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ঐতিহ্য আছে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের, নির্বাচনের, দেশ স্বাধীন করবার নেতৃত্বদানের। অনেক অর্জন আছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের। এখন আওয়ামী লীগ যদি উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে ‘স্বৈরশাচারী শাসন’ বিষয়ে একই রকম আচরণ করে তাহলে তা হবে অত্যন্ত দুঃখজনক।

বিশ্বের নানা দেশের অভিজ্ঞতায় আমরা উন্নয়ন আর গণতন্ত্রের এই বিতর্কটা দেখেছি। চিলিতে এমন হয়েছিল কিন্তু তা ভেঙে পড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় এমন হয়েছিল, কিন্তু পরে তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে এটাকে ভারসাম্যে আনতে সক্ষম হয়েছে। গণতন্ত্র দিতেই হবে। আর সত্যি কথা কি, যত বেশি উন্নয়ন হবে গণতন্ত্রের দাবি ততটাই জোরদার হবে, এটাই নিয়ম। কারণ যখন মানুষের পেটে ভাত থাকবে, পরণে কাপড় থাকবে, হাতে সময় থাকবে তখন আপনি কথা বলতে চাইবেন। যত উন্নয়ন হবে তত বেশি স্বাধীনতা চাইবে মানুষ। পশ্চিমা বিশ্বে মানুষের স্বাধীনতার ধারণাটা এত প্রবল হওয়ার কারণ, তাদের মৌলিক অধিকারগুলো পূরণ হওয়া, রাষ্ট্র ও সমাজের সাধারণ সব কাঠামো অনেকটাই ঠিকঠাক থাকা। এই কারণেই তারা স্বাধীনতা চায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়, পত্রিকার স্বাধীনতা চায়, টেলিভিশনের স্বাধীনতা চায়। ফলে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র দুটোকে ভারসাম্যে না আনতে পারলে আখেরে এই উন্নয়ন কিন্তু টিকবে না।

জবাবদিহিতা ছাড়া গণতন্ত্র চলে না

একটা সরকার চালানোর জন্য দুই ধরনের জবাবদিহি লাগে। একটা হলো ‘ভার্টিক্যাল’ বা উল্লম্ব জবাবদিহিতা, আরেকটা হলো ‘হরাইজন্টাল’ বা সমান্তরাল জবাবদিহিতা। সংসদ, আদালত এবং নির্বাহী বিভাগের পরস্পর পরস্পরকে চোখে চোখে রাখবে এটা হলো সমান্তরাল জবাবদিহিতা। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য তৈরি হবে। আরেকটা হলো সরকারকে সিভিল সোসাইটি, গণমাধ্যমকে এরা চোখে চোখে রাখবে, প্রশ্ন করবে, যে কারণে গণমাধ্যমকে যে কোনো রাষ্ট্রে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়ে থাকে। সিভিল সোসাইটি সরকারকে বলবে, আপনারা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ইশতেহারে সেটা পূরণ হচ্ছে না, আপনাদের সেটা পূরণ করতেই হবে। এর মধ্য দিয়েই কিন্তু পশ্চিমা গণতন্ত্র টিকে আছে।

আর আমাদের মতো দেশগুলোর ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে দো-আঁশলা গণতন্ত্র বা হাইব্রিড গণতন্ত্র। আমরা গণতন্ত্রের ভাণ করব কিন্তু গণতন্ত্র থাকবে না। আমরা নির্বাচন দেব কিন্তু সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। সংসদ থাকবে কিন্তু সেই সংসদ সক্রিয় হবে না। আমাদের একটা আদালত থাকবে কিন্তু দেশে আইনের শাসন থাকবে না। আমাদের পুলিশ প্রশাসন থাকবে কিন্তু তা ক্ষমতাবানদের হয়ে কাজ করবে। গণতান্ত্রিক সমাজের সব নমুনাই থাকবে কিন্তু সেগুলো কার্যকর থাকবে না। মুশকিল হলো এসব ন্যূনতম গণতন্ত্রটুকু না থাকলে কিন্তু শেষ বিচারে রাষ্ট্র আর এগুতে পারবে না।

আমরা কিন্তু গণতন্ত্রের পরমতসহিষ্ণুতার পথে হাঁটতে পারছি না। গণতন্ত্র তো আসলে কেবল নির্বাচন বা একদিনের বিষয় না। এটা প্রতিদিন চর্চা করার বিষয়। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই নির্বাচনের ফল ঘিরে নতুন কোনো রাজনৈতিক অচলাবস্থার দিকে যাচ্ছি? আমরা কি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা, হরতাল-অবরোধ, সংসদ বর্জন এই সব ঘটনাপ্রবাহের দিকে এগুচ্ছি?
লেখক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ও কলামনিস্ট