মৃণালদার সেই এক্সপ্রেশন কোনোদিন ভুলব না|114165|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০
মৃণালদার সেই এক্সপ্রেশন কোনোদিন ভুলব না
মাসিদ রণ

মৃণালদার সেই এক্সপ্রেশন কোনোদিন ভুলব না

 

 

ববিতা
চলচ্চিত্র অভিনত্রেী

আহা, মৃণাল দা আর নেই! আমার চারপাশটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ক’দিন আগেই আমাদের সবার প্রিয় আমজাদ হোসেনকে হারালাম। সেই কষ্ট মনের মধ্যে দগদগে হয়ে থাকতে থাকতেই আরেক প্রিয় মানুষকে হারালাম। খবরটা শুনে বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যতা আস্তে আস্তে এতটাই বেড়ে যাচ্ছে, জানি না কতদিন এর ভার বহন করতে পারব। শুধু আমাদের এখানে না, কলকাতা থেকেও যেসব কালজয়ী শিল্পী, পরিচালক চলে যাচ্ছেন তার কোনো বিকল্প আমরা আর পাচ্ছি না। জায়গাটা চিরদিনের জন্যই শূন্য হয়ে পড়ছে। আর এজন্য এখনকার চলচ্চিত্রের এই বেহালদশা! অনেক ছবি হচ্ছে, বাজেট অনেক বেশি তা ছবির গান, লোকেশন, শিল্পীর সাজ-পোশাক দেখে বুঝতে পারি। কিন্তু ছবির মান কোথায় গেছে। আগের ছবি একইসঙ্গে মানুষ হলে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত, আবার সেই ছবিগুলোই সারা বিশ্বেও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের প্রশংসা কুড়াত। আর এখন কিছু ছবি সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ দেখছে, আর কিছু ছবি শুধুই পুরস্কার পাচ্ছে।

কিন্তু মৃণাল দা’র মতো পরিচালক আর্ট অ্যান্ড কমার্স দুটোই সমানভাবে ডেলিভারি দিতেন তার ছবিতে। তিনি সবার প্রিয় পরিচালক, আমারও প্রিয়। তার সঙ্গে তোলা একটি ছবি আমার ঘরের দেয়ালে বাঁধাই করা আছে। আমার চোখে খুবই সম্মানের মানুষ তিনি। কারণ তার চোখে নিজের জন্য যে সম্মান দেখেছি তা আমাকে বাধ্য করেছে তাকে আরো বেশি সম্মান দিতে। আমি দেশের বাইরে একটি মাত্র ছবি করেছি, তাও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি পরিচালক অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ছবি। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিও লাভ করি। এরপর মুম্বাই ও কলকাতা থেকে অসংখ্য ছবির প্রস্তাব পেয়েছি। অগ্রদূত মৃণাল সেনের মতো পরিচালকরা আমাকে নিয়ে ছবি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমি চেয়েছি ‘অশনি সংকেত’-এর অর্জনটাই সারা জীবনের জন্য তোলা থাক। তবে পরে অবশ্য মৃণাল দার ছবিতে কাজ না করতে পারার কিঞ্চিত অপ্রাপ্তিও তৈরি হয়েছিল আমার। কিন্তু আমি গর্বিত তার মতো পরিচালক আমার অভিনয় পছন্দ করতেন। আমাকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। শুধু আমারই নয়, আমাদের দেশের ভালো ভালো ছবিও তিনি দেখতেন। অশনি সংকেত করার পর আমি বিশে^র প্রায় সব বড় বড় ফেস্টিভ্যালে গিয়েছি, রেড কার্পেটে হেঁটেছি, ইন্টারভিউ দিয়েছি বাংলাদেশের প্রথম কোনো অভিনেত্রী হিসেবে। তখন বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মৃণাল দার সঙ্গে দেখা হতো। তিনি কলকাতার ছবির মাধ্যমে বিশ্বের কাছে পরিচিতি পেলেও তার জন্মভিটা তো আমাদের দেশেই। এ জন্যই হয়তো আমাদের দেশ বা দেশের চলচ্চিত্রের প্রতি তার আলাদা আগ্রহ ছিল। এখনো মনে আছে, মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তিনি আমার অভিনীত আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিটি দেখার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আমাকে বলেছিলেন, ‘আরে, তোরাও তো খুব ভালো ছবি করছিস’। শুধু তাই নয়, একজন পরিচালক হয়ে আরেকজন পরিচালককে (আমজাদ হোসেন) সে কী প্রশংসা করলেন। সেদিন তার কাছ থেকে শিখেছিলাম, কখনো কাউকে হিংসা করা ঠিক নয়। কারো ভালো কাজে তার প্রশংসা করা উচিত।

মৃণাল দার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ৯০-এর দশকে ঢাকায়। তিনি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন। সেদিন তিনি এত মানুষের ভিড়ে আমাকে খুঁজে বের করে পাশে বসালেন। অনেক গল্প হয়েছিল সেদিন। এক পর্যায়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা এক সময় আপনারা কি সব ছবি নির্মাণ করতেন! এক একটা মাইলস্টোন হয়ে আছে। কিন্তু আপনাদের ওখানে এখন যেসব ছবি হয় তা যখন টেলিভিশনে দেখি, খুব কষ্ট লাগে। অথচ সেসব ছবি নিয়েই ইন্টারভিউতে শিল্পী, পরিচালকরা কত প্রশংসা করে! কেন এমন হলো?’ এর উত্তরে মৃণাল দা যে এক্সপ্রেশন দিয়েছিলেন তা কোনোদিন ভুলব না। তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেছিলেন, ‘সব কথা বলা যায় না। আমি কী বলতে চাচ্ছি তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।’ দোয়া করি, মৃণাল দার আত্মা শান্তিতে থাকুক।

কথা বলেছেন মাসিদ রণ

 

আহা, মৃণাল দা আর নেই! আমার চারপাশটা কেমন ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। ক’দিন আগেই আমাদের সবার প্রিয় আমজাদ হোসেনকে হারালাম। সেই কষ্ট মনের মধ্যে দগদগে হয়ে থাকতে থাকতেই আরেক প্রিয় মানুষকে হারালাম। খবরটা শুনে বুকের মধ্যে একটা শূন্যতা কাজ করছে। এই শূন্যতা আস্তে আস্তে এতটাই বেড়ে যাচ্ছে, জানি না কতদিন এর ভার বহন করতে পারব। শুধু আমাদের এখানে না, কলকাতা থেকেও যেসব কালজয়ী শিল্পী, পরিচালক চলে যাচ্ছেন তার কোনো বিকল্প আমরা আর পাচ্ছি না। জায়গাটা চিরদিনের জন্যই শূন্য হয়ে পড়ছে। আর এজন্য এখনকার চলচ্চিত্রের এই বেহালদশা! অনেক ছবি হচ্ছে, বাজেট অনেক বেশি তা ছবির গান, লোকেশন, শিল্পীর সাজ-পোশাক দেখে বুঝতে পারি। কিন্তু ছবির মান কোথায় গেছে। আগের ছবি একইসঙ্গে মানুষ হলে দেখার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ত, আবার সেই ছবিগুলোই সারা বিশে^ও চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের প্রশংসা কুড়াত। আর এখন কিছু ছবি সমাজের খেটে খাওয়া মানুষ দেখছে, আর কিছু ছবি শুধুই পুরস্কার পাচ্ছে।

কিন্তু মৃণাল দা’র মতো পরিচালক আর্ট অ্যান্ড কমার্স দুটোই সমানভাবে ডেলিভারি দিতেন তার ছবিতে। তিনি সবার প্রিয় পরিচালক, আমারও প্রিয়। তার সঙ্গে তোলা একটি ছবি আমার ঘরের দেয়ালে বাঁধাই করা আছে। আমার চোখে খুবই সম্মানের মানুষ তিনি। কারণ তার চোখে নিজের জন্য যে সম্মান দেখেছি তা আমাকে বাধ্য করেছে তাকে আরো বেশি সম্মান দিতে। আমি দেশের বাইরে একটি মাত্র ছবি করেছি, তাও সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি পরিচালক অস্কারজয়ী সত্যজিৎ রায়ের ছবি। ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিও লাভ করি। এরপর মুম্বাই ও কলকাতা থেকে অসংখ্য ছবির প্রস্তাব পেয়েছি। অগ্রদূত মৃণাল সেনের মতো পরিচালকরা আমাকে নিয়ে ছবি করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু আমি চেয়েছি ‘অশনি সংকেত’-এর অর্জনটাই সারা জীবনের জন্য তোলা থাক। তবে পরে অবশ্য মৃণাল দার ছবিতে কাজ না করতে পারার কিঞ্চিত অপ্রাপ্তিও তৈরি হয়েছিল আমার। কিন্তু আমি গর্বিত তার মতো পরিচালক আমার অভিনয় পছন্দ করতেন। আমাকে নিয়ে কাজ করতে চেয়েছেন। শুধু আমারই নয়, আমাদের দেশের ভালো ভালো ছবিও তিনি দেখতেন। অশনি সংকেত করার পর আমি বিশে^র প্রায় সব বড় বড় ফেস্টিভ্যালে গিয়েছি, রেড কার্পেটে হেঁটেছি, ইন্টারভিউ দিয়েছি বাংলাদেশের প্রথম কোনো অভিনেত্রী হিসেবে। তখন বিভিন্ন ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে মৃণাল দার সঙ্গে দেখা হতো। তিনি কলকাতার ছবির মাধ্যমে বিশে^র কাছে পরিচিতি পেলেও তার জন্মভিটা তো আমাদের দেশেই। এ জন্যই হয়তো আমাদের দেশ বা দেশের চলচ্চিত্রের প্রতি তার আলাদা আগ্রহ ছিল। এখনো মনে আছে, মস্কো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে তিনি আমার অভিনীত আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ ছবিটি দেখার পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আমাকে বলেছিলেন, ‘আরে, তোরাও তো খুব ভালো ছবি করছিস’। শুধু তাই নয়, একজন পরিচালক হয়ে আরেকজন পরিচালককে (আমজাদ হোসেন) সে কী প্রশংসা করলেন। সেদিন তার কাছ থেকে শিখেছিলাম, কখনো কাউকে হিংসা করা ঠিক নয়। কারো ভালো কাজে তার প্রশংসা করা উচিত।

মৃণাল দার সঙ্গে আমার সর্বশেষ দেখা হয়েছিল ৯০-এর দশকে ঢাকায়। তিনি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন। সেদিন তিনি এত মানুষের ভিড়ে আমাকে খুঁজে বের করে পাশে বসালেন। অনেক গল্প হয়েছিল সেদিন। এক পর্যায়ে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘দাদা এক সময় আপনারা কি সব ছবি নির্মাণ করতেন! এক একটা মাইলস্টোন হয়ে আছে। কিন্তু আপনাদের ওখানে এখন যেসব ছবি হয় তা যখন টেলিভিশনে দেখি, খুব কষ্ট লাগে। অথচ সেসব ছবি নিয়েই ইন্টারভিউতে শিল্পী, পরিচালকরা কত প্রশংসা করে! কেন এমন হলো?’ এর উত্তরে মৃণাল দা যে এক্সপ্রেশন দিয়েছিলেন তা কোনোদিন ভুলব না। তার ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলেছিলেন, ‘সব কথা বলা যায় না। আমি কী বলতে চাচ্ছি তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।’ দোয়া করি, মৃণাল দার আত্মা শান্তিতে থাকুক।

কথা বলেছেন মাসিদ রণ