শেখ হাসিনা ও উত্তর-পূর্ব ভারত|114333|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
শেখ হাসিনা ও উত্তর-পূর্ব ভারত
রাখি ভট্টাচার্য

শেখ হাসিনা ও উত্তর-পূর্ব ভারত

গত এক দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এক যুগান্তকারী অবস্থায় পৌঁছেছে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ‘দিন বদলে’র স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসীন হয়। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তারা শান্তি, সংহতি, প্রগতি এবং সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। তারা তাদের পূর্ববর্তী ধর্মাশ্রয়ী এবং সেনাসমর্থিত শাসনামলের স্থলে রাজনৈতিক গণতন্ত্র এবং উদারনৈতিক নীতির প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার জন্য শেখ হাসিনা যে গুরুত্ব দিয়েছেন তাতে ভারত গভীর কৃতজ্ঞতায় আপ্লুত। এর জন্য ভারত উত্তর-পূর্ব অঞ্চলকে কেন্দ্রে রেখে তাদের বাংলাদেশ নীতিকে পুনর্গঠন করতে পেরেছে। দশকের পর দশক ধরে সীমান্তকেন্দ্রিক সৌহার্দ্য উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের জন্য বিনষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে ইতিবাচক দিকে মোড় নেয়। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক এবং বাণিজ্যিক দ্বিপাক্ষিকতা আন্তঃসংযুক্তি এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ওপর ভিত্তি করে উন্নত হতে থাকে।

১৯৪৭ সালের পর সমতলের যাত্রাপথ বন্ধ এবং অমীমাংসিত রাজনৈতিক সীমানার কারণে অনেক ছিটমহল তৈরি হওয়ার ফলে এই দুই প্রতিবেশীর মধ্যে একটি অস্বস্তির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যদিও ১৯৭২ সালে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সৌহার্দ্য এবং শান্তিচুক্তির ফলে এক ধরনের কৃত্রিম দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গড়ে ওঠে, কিন্তু তা কখনো সীমান্ত বিতর্কের সমাধান করতে পারেনি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অস্থিরতার কারণে ভারতের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অবৈধ অনুপ্রবেশ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এই দীর্ঘ, উন্মুক্ত, অঘনীভূত এবং বিতর্কিত কিন্তু নির্ধারিত সীমান্তের কারণে আন্তঃসীমান্তের অবৈধ কর্মকা-, লোকেদের ও মালামালের অবৈধ যাতায়াত, নিয়মিবহির্ভূত সীমান্তকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকা- অব্যাহত ছিল। এসব কারণে সংঘাত লেগেই থাকত, এমনকি অনেক সময় সীমান্তের সামরিকীকরণও ঘটত।

১৯৮০-এর দশকে উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে গোপন জঙ্গি তৎপরতা শুরু হয়, যার একটি প্রধান কারণ ছিল এই অবৈধ অনুপ্রবেশ। শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক শাসনামলে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ এসব জঙ্গিদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। ২০০৮-এ এক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচিত হয়। শেখ হাসিনা তার দেশের মাটি থেকে যেন কোনো গোপন জঙ্গি তৎপরতা ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে সে জন্য দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ে, একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ফলে ভারত তার এবং বাংলাদেশের দীর্ঘ ও উন্মুক্ত সীমান্তের জিরো লাইনে আন্তর্জাতিক আবদ্ধ তারের সীমান্ত পরিবেষ্টনী (আইবিডব্লিউবিএফ) তৈরি করতে সক্ষম হয়। গত এক দশকে যেসব প্রতিবেদন পাওয়া গেছে, তাতে দেখা যায় যে আইবিডব্লিউবিএফের ফলে অনেক ধরনের সীমান্তবর্তী অবৈধ কার্যকলাপ অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১২ সালে ত্রিপুরায় শেখ হাসিনার ঐতিহাসিক সফর উত্তর-পূর্ব ভারতে বাংলাদেশের ভূমিকাকে ব্যাপক পরিবর্তন করতে সহায়ক হয়েছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি চুক্তি করেন যা দীর্ঘ দুই দশকের সংঘাতের অবসান ঘটায় এবং ৬২,০০০ উদ্বাস্তুকে ভারতের মাটি থেকে তার দেশে প্রত্যাবর্তনে উৎসাহিত করে। আন্তঃসীমান্তের নিরাপত্তার ব্যাপারে এ ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ একটি গুণগত পরিবর্তন আনে এবং দুই জাতিই এর নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখে। বাণিজ্য এবং বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাস্তবে রূপ পায়। বাংলাদেশ অনেক ধরনের আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং তাকে এখন কেউ আর ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলতে পারবে না। দেশটি গত দশ বছরে দারিদ্র্য হ্রাসকরণের কর্মসূচি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গ্রহণ করেছে, যার ফলে ২২% দারিদ্র্য হ্রাস পেয়েছে। প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৭ %, যা সামাজিক সূচকের দিক থেকে খুবই প্রশংসাজনক। অনেক ধরনের সুযোগ সৃষ্টি এবং বিশাল শ্রমশক্তির কারণে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। দেশটি অনেক ধরনের কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সীমান্ত পথের জন্য তারা অনেক ধরনের অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে উত্তর-পূর্ব ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।

১৯৭১ সালের আগে অর্থাৎ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগে অনেক সড়কপথ এবং ট্রানজিট বন্ধ ছিল যা উত্তর-পূর্ব ভারতকে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন করেছিল। যার জন্য এই অঞ্চলের সীমান্ত বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক অর্থনীতি অনেক বাধাগ্রস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ট্রানজিট ছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর জনগণের ভারতের মূল ভূখন্ডে ঢুকতে অনেক সমস্যা হতো। ২০১৫ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে সমতল সীমান্ত চুক্তি আইন (এলবিএবি) পাস হয় এবং বাংলাদেশ ভারতকে ট্রানজিট অধিকার প্রদান করে। এটাকে ২০০৮ এর পরে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অর্জন বলা হয়।

এর আগের রাজনৈতিক শাসনামলগুলোতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি এই ট্রানজিট অধিকারকে হুমকি হিসেবে প্রতিপন্ন করে কঠোর আপত্তি জানানো হয়েছিল। এজন্য ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন উত্তর-পূর্ব ভারতের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প এবং সংযুক্তি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। ট্রানজিট অধিকারের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করে অনেক হারানো সড়কপথকে পুনরুদ্ধার করেছে এবং নতুন সড়কপথও সৃষ্টি হয়েছে। জনগণ এবং পণ্যদ্রব্য এখন বৈধভাবে যাতায়াত করতে পারছে এবং চূড়ান্তভাবে স্থানীয়, আঞ্চলিক এবং জাতীয় অর্থনীতির উন্নতি ঘটছে। এই ট্রানজিট অধিকারে সড়ক, নদী, সাগর, রেলপথ যুক্ত হয়েছে। যার জন্য পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন, খাদ্যশস্য সরবরাহ এবং ডিজিটাল সংযোগের মতো বৃহৎ বাণিজ্যিক প্রকল্প বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছে। দুদেশের মধ্যে সড়কপথ, রেলপথ, বন্দর এবং সেতুগুলোর সংযোগ তৈরি হওয়ায় শিল্প সমৃদ্ধ হচ্ছে এবং দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যোগাযোগে প্রভূত উন্নতি হচ্ছে।

বর্তমানে কলকাতা-ঢাকা-আগরতলা এবং ঢাকা-শিলং-গোয়াহাটি বাসসেবা চলমান ও কার্যকরী। ভারত এবং বাংলাদেশ মিজোরামের খাটালাংটুইপাই নদীর ওপরে সেতু তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে যার মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সঙ্গে ভারতের পূর্ব-পশ্চিম রেলপথকে সংযুক্ত করবে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য সহযোগী মনোভাবাপন্ন, স্থিতিশীল এবং নিরাপদ বাংলাদেশ প্রয়োজন। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে নবযাত্রা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সূচিত হয়েছে তার ফলে লাভবান হয়েছে ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ।