রাজনীতির দৃশ্যপট বদলের বছর|114396|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
বিদায় ২০১৮
রাজনীতির দৃশ্যপট বদলের বছর
রায়ান বণিক

রাজনীতির দৃশ্যপট বদলের বছর

ক্ষণে ক্ষণে রাজনীতিতে রং ছড়ানো নতুন একটি বছর পার করল বাংলাদেশ। বছর যতই শেষের দিকে এগিয়েছে, রাজনীতির শঙ্কা আর উত্তেজনা ততই বেড়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে অক্টোবর থেকে বেশ জমাট বাঁধতে থাকে রাজনৈতিক উত্তেজনা। বছরের শেষ দুদিন রাজনীতির উত্তেজনা মিশেছে ভোটকেন্দ্রে, ভোটের ফলাফলে। ২৯৯ আসনের মধ্যে এককভাবে ২৫৯টিতে জয় পাওয়া আওয়ামী লীগ বছরের শেষ দিনে নির্বাচনী উত্তেজনায় পানি ঢেলে দিয়েছে।

বিদায়ী বছরের প্রথম দিন আদালতে একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবরসহ ৪৯ আসামির মৃত্যুদ- চায় রাষ্ট্রপক্ষ। তখন থেকেই রাজনীতিতে বাঁক বদলের ঘটনা ঘটে বছরজুড়ে। দুর্নীতির মামলায় পাঁচ বছরের কারাদন্ডাদেশ নিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি নাজিমউদ্দিন রোডের কারাগারে যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। বছরের প্রথমার্ধে খালেদা জিয়ার কারাগারে যাওয়ার ঘটনাই ছিল সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। তখন থেকেই তার জামিন পাওয়া-না পাওয়া নিয়ে চায়ের কাপে ঝড় উঠে দেশজুড়ে। বছরের মাঝামাঝি থেকে সে ঝড় ছাপিয়ে যায় খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে সরকার এবং বিএনপির মত-ভিন্ন পথে হাঁটার ঘটনায়। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা নেন খালেদা জিয়া, এক মাস চিকিৎসা শেষে গত ৮ নভেম্বর আবার কারাগারে নেওয়া হয় তাকে।

গত এপ্রিল মাসে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এক বক্তব্যে ঝড় উঠে রাজনীতিতে। তিনি বলেন, ২০১২ সালে তারেক জিয়া তার বাংলাদেশি পাসপোর্ট লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে জমা দিয়ে তার বাংলাদেশি নাগরিকত্ব সারেন্ডার করেছেন। তার ওই বক্তব্য নিয়ে রাজনীতিতে ঝড় উঠে। বিএনপির পক্ষ থেকে তারেক রহমানের নাগরিকত্ব বর্জন করার কথা নাকচ করা হয়।

২০১৮ সালে বরিশাল, সিলেট, রাজশাহীসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশনে নির্বাচন হয়। ওইসব নির্বাচনে ভোটে কারচুপি, বিরোধীপক্ষকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠে। তাতে সিলেট ছাড়া সব সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।

অক্টোবরে রাজনীতিতে নতুন মোড়ের সঞ্চার করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশ। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে এই জোট থেকে বিকল্পধারার মহাজোটে যোগ দেওয়াও ট্রল হতে থাকে রাজনীতিতে। ১ নভেম্বর থেকে দু’দফা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপে স্থিতিশীল রাজনীতির আভাস দেয়। অবশ্য শেষ পর্যন্ত সংলাপ সফল না হওয়ার অভিযোগ করে ঐক্যফ্রন্ট। সরকারের তরফ থেকে বলা হয় অসাংবিধানিক দাবি নিয়ে আসছে তারা, যা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে ইসির সংলাপও দেশজুড়ে আলোচনার সৃষ্টি করে। ৫ নভেম্বর ইসির সঙ্গে বৈঠকে ঐক্যফ্রন্ট নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘এই নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই।’ পাল্টা বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা বলেন, ‘আপনাদের ওপরও তো জনগণের আস্থা নেই।’ তখনই গলা চড়া করে মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গুয়েজ।’ ২৫ নভেম্বর ইসির সঙ্গে বৈঠকে বাক-বিতন্ডায় জড়ান সিইসি ও ড. কামাল হোসেন।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে বড় দুটি ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। এর একটি কোটাবিরোধী আন্দোলন, অন্যটি সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে সরকার সরকারি চাকরিতে বিভিন্ন ধরনের কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। তবে আগস্টে সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে চলা বড় ধরনের আন্দোলনের পরও সড়ক পরিবহনে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

আগস্টে ছাত্র আন্দোলন চলাকালে তথ্য ও প্রযুক্তি আইনে গ্রেপ্তার হন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোসাংবাদিক শহীদুল আলম। আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সরকারের সমালোচনা করার পর তার ওই গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে বাড়তি আলোচনার সৃষ্টি করে। নভেম্বরে তিনি জামিন পান।

নির্বাচনী বছর হলেও ২০১৮ সাল ছিল হরতালবিহীন। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে এই প্রথম কোনো নির্বাচনী বছর হরতাল-অবরোধসহ বড় ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা ছাড়াই পার করেছে। ফলে অন্য নির্বাচনী বছরগুলোতে যেভাবে বিনিয়োগ-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এবার তা হয়নি।

বছরটিতে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার রেকর্ড ছুঁয়েছে। দারিদ্র্য কমেছে। বছরটিতে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতির সঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায় থেকেও সুখবর পেয়েছে বাংলাদেশ। মার্চে জাতিসংঘের কাছ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক স্বীকৃতি মিলেছে। বিদায়ী বছরেই ৫৭তম দেশ হিসেবে মহাকাশে পৌঁছেছে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট। এই সময়ে ব্যাংকের সিআরআর কমানো, ঋণ-আমানতের সুদহার কমানো নিয়ে আর্থিক খাতের কয়েকটি ঘটনা দেশজুড়ে বড় ধরনের আলোচনার সৃষ্টি করে।

বিদায়ী বছরে বেশ কয়েকজন গুণিজনকে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে রয়েছেন জনপ্রিয় পপসংগীত তারকা আইয়ুব বাচ্চু। গত অক্টোবরে মারা যান তিনি। আগস্টে মারা যান সিনিয়র সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার মৃণাল সেন মারা গেলেন ৩০ ডিসেম্বর।