নির্বাচনী বছরে ব্যাংকের মুনাফায় মিশ্র ফল|114399|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
নির্বাচনী বছরে ব্যাংকের মুনাফায় মিশ্র ফল
নিজস্ব প্রতিবেদক

নির্বাচনী বছরে ব্যাংকের মুনাফায় মিশ্র ফল

নির্বাচনী অর্থনীতির ওপর তেমন কোনো চাপ সৃষ্টি হয়নি বিদায়ী বছরে। উল্টো ভালো পরিচালন মুনাফা অর্জিত হয়েছে ব্যাংক খাতে। গত ২৭ ডিসেম্বর ব্যাংকগুলো তাদের বছরের হিসাব ‘ক্লোজ’ করেছে। তবে বড় ব্যাংকগুলো গতকাল সোমবার (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত তাদের খরচের রসিদ বা ভাউচার মিলিয়ে পরিচালন মুনাফা চূড়ান্ত করার কাজ করেছে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। তবে প্রতিষ্ঠিত কিছু ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমেছেও।

বর্তমানে দেশে তফসিলি ব্যাংক রয়েছে ৫৯টি। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ৯টি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৪১টি এবং বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৯টি। প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৮ সালে সবচেয়ে বেশি পরিচালন মুনাফা করেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। বছর শেষে এই ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ২ হাজার ৪২০ কোটি টাকা।

এ ছাড়া পরিচালন মুনাফা বাড়ার কাতারে রয়েছে পূবালী ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ঢাকা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক লি., মার্কেন্টাইল ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। পরিচালন মুনাফা কমার তালিকায় রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ও মেঘনা ব্যাংক।

তবে পরিচালন মুনাফাই ব্যাংকের প্রকৃত মুনাফা নয়। এর থেকে ব্যাংকের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ শেষে এবং করের টাকা পরিশোধের পর নিট মুনাফা বেরিয়ে আসে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো ব্যাংক তাদের অনিরীক্ষিত পরিচালন মুনাফা প্রকাশ করতে পারে না। এ কারণে ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্র থেকে পরিচালন মুনাফার তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদায়ী বছরের শুরু থেকেই ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয় নিয়ে বড় ধরনের বেগ পেতে হয়েছে ব্যাংকগুলোকে। এ সময় সুদের হার নিয়েও ব্যাংকগুলোকে অনেক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও কমিয়ে আনা হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর পর্যন্ত এ খাতের ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৪.৭২ শতাংশ। অথচ বছরের শুরুতে বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯ শতাংশের বেশি। তবে বিদায়ী বছরে ব্যাংকগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ এসেছে বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, পূবালী ব্যাংক লিমিটেড বিদায়ী বছরে পরিচালন মুনাফা করেছে এক হাজার ২৫ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ৯১৫ কোটি টাকা। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ৯২২ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৫০ কোটি টাকা।

সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে এক হাজার দুই কোটি টাকা, ২০১৭ সালে যা ছিল ৯০৬ কোটি টাকা। ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৭৮০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ৭৫০ কোটি টাকা। ব্যাংক এশিয়ার পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮১১ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ৬৭১ কোটি টাকা। এনসিসি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৬৫৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ছিল ৫৩৫ কোটি টাকা। ঢাকা ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ৬৫০ কোটি টাকা।

জানতে চাইলে ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি ও সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর স্থিতিপত্রের স্বাস্থ্য ভালো দেখানোর জন্য পরিচালন মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর একটা প্রবণতা আছে। এর পরের ধাপে গেলেই প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা যাবে। প্রভিশন করলেই বোঝা যাবে কোন ব্যাংকের মুনাফা কেমন।’

 তবে এবার ২০১৪ সালের মতো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা না থাকায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক ভালো মুনাফা করতে পেরেছে বলে মনে করেন শীর্ষ এই ব্যাংকার।

প্রিমিয়ার ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ৬১৮ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৪৫০ কোটি টাকা। মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ৫১৫ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ৪১৭ কোটি টাকা। শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ২০১৮ সালে পরিচালন মুনাফা করেছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ৩৬০ কোটি টাকা।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালন মুনাফাও আগের বছরের চেয়ে বেড়েছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৬২৮ কোটি টাকা, ২০১৮ সালে হয়েছে ৬৬৮ কোটি টাকা। আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পরিচালন মুনাফা করেছে ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ছিল ৬৭২ কোটি টাকা। এক্সিম ব্যাংক ৭১০ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে ২০১৮ সালে। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ৬১০ কোটি টাকা।

এক্সিম ব্যাংকের এমডি ড. মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল ৮০০ কোটি টাকার বেশি পরিচালন মুনাফা করার। সুদের হার নয়-ছয় করতে গিয়ে আমরা কিছুটা পিছিয়ে গেছি। তবে আশা করছি, নতুন বছরে ভালো মুনাফা করতে পারব।’

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ২০১৮ সালে মুনাফা করেছে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে সোনালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল এক হাজার ২০৬ কোটি টাকা। অগ্রণী ব্যাংক করেছে ৯০০ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ৭১৭ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৩৬৯ কোটি টাকা।

সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড পরিচালন মুনাফা করেছে ২৭৫ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের জুন শেষে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ২৫৫ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেডের (বিডিবিএল) পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১১৭ কোটি টাকা। আগের বছর এটা ছিল ১১৫ কোটি টাকা। তবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ২২১ কোটি টাকা থেকে কমে ১২৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এ ছাড়া সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ২০৫ কোটি টাকা, ২০১৭ সালে ছিল ১৮২ কোটি টাকা। এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা ছিল ২০১ কোটি টাকা।

মধুমতি ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা হয়েছে ১৯৭ কোটি টাকা, যা ২০১৭ সালে ছিল ১৫১ কোটি টাকা। এনআরবি ব্যাংক লিমিটেডের ৯১ কোটি পরিচালন মুনাফা হয়েছে, ২০১৭ সালে যা ছিল ৮৫ কোটি টাকা। মেঘনা ব্যাংকের পরিচালন মুনাফা কমেছে। ২০১৭ সালে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা ছিল ১০২ কোটি টাকা, ২০১৮ সালে হয়েছে ৯৩ কোটি টাকা। বেসিক ব্যাংকের পরিচালন লোকসান হয়েছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে এই ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা হয়েছিল ৪৩ কোটি টাকা।