গ্যাসের চুলা, কয়েল থেকে বাসায় আগুন লাগছে বেশি|114493|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
গ্যাসের চুলা, কয়েল থেকে বাসায় আগুন লাগছে বেশি
ইমন রহমান

গ্যাসের চুলা, কয়েল থেকে বাসায় আগুন লাগছে বেশি

রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মাতুয়াইল উত্তরপাড়ায় টিনশেডের ছোট ঘর। নেই বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা ওয়াসার পানি। সেখানে তিন ছেলে পলাশ (১২), তুষার (৭), আল ইসলাম (৩) ও স্ত্রী বৃষ্টি আক্তারকে (৩৫) নিয়ে বাস করতেন মোটর মেকানিক ইকবাল হোসেন (৪৫)। ছেলেদের মধ্যে পলাশ বড় ও তুষার মেজো। অভাবের সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আর্থিক অনটনে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ মেলেনি পলাশের। গরিব বাবাকে সহায়তা করতে মাঝেমধ্যেই রিকশা চালাত সে। নিজে পড়ালেখা করার সুযোগ না পেলেও ছোট দুই ভাইকে পড়ালেখা শেখানোর স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু সেই স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল।

গত শুক্রবার গভীর রাতে ওই ঘরে মশার কয়েল থেকে আগুন লেগে দগ্ধ হয় পলাশ, তুষার ও তাদের বাবা ইকবাল হোসেন। ফায়ার সার্ভিসের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পলাশ ও তুষারকে মৃত ঘোষণা করেন। ইকবাল হোসেনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছেন হাসপাতালের শয্যায়। তার শ্বাসনালি পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

গত সোমবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের চতুর্থ তলায় এক্সট্রা বেডে পড়ে ছিলেন ইকবাল। তার শরীরে রক্ত দেওয়া হচ্ছিল। ছোট ছেলেকে বুকে জড়িয়ে স্বামীর পাশে বসে ছিলেন ঘটনার সময় বাড়িতে না থাকা স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার। দুই সন্তান হারিয়ে বাকরুদ্ধ তিনি।

প্রতিদিনই বাসা-বাড়িতে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এগুলোর বেশির ভাগই হচ্ছে গ্যাসের চুলা ও মশার কয়েল থেকে। বাসা-বাড়ির পাশাপাশি কারখানাতেও অগ্নিকাণ্ডে প্রতিদিনই ঝরছে প্রাণ। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই আসছে অগ্নিদগ্ধ মানুষ। বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। শুধু বার্ন ইউনিটেই প্রতিদিন গড়ে ৪০ জনের বেশি অগ্নিদগ্ধ রোগী আসছে। মৃত্যু হচ্ছে তিন থেকে চারজনের। অগ্নিকাণ্ডের পর করণীয় না জানায় বাড়ছে প্রাণহানি।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিস্ফোরক পরিদপ্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, পাইপলাইনের গ্যাসের চুলার চাবির লিকেজ আর এলপি গ্যাসের রেগুলেটর থেকে ঘটছে অধিকাংশ দুর্ঘটনা। এ ছাড়া মশার কয়েল থেকেও বাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটছে।

পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রান্নার তেল পাইপলাইনের গ্যাসের চুলার সংযোগ চাবিতে লেগে পিচ্ছিল হয়। ফলে চাবির গোড়া দিয়ে গ্যাস লিকেজ হয়। সারা রাত চাবির লিকেজ দিয়ে গ্যাস বের হয়ে জমতে থাকে। ভোরে চুলা ধরাতে গেলেই ঘটে দুর্ঘটনা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মুহূর্তেই সমস্ত ঘরে ছড়িয়ে পড়ে আগুন। বিশেষ করে শীতকালে ফ্ল্যাট বাসার জানালা বন্ধ থাকায় লিকেজ দিয়ে নির্গত গ্যাস বাসার বাইরে বের হতে পারে না। ফলে চুলা ধরাতে গেলেই বাতাসে ছড়িয়ে থাকা গ্যাসে অগ্নিকাণ্ড হয়। এ ছাড়া এলপি গ্যাসের চুলা বন্ধের পরও রেগুলেটর বন্ধ না করায় দুর্ঘটনা ঘটছে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুর্ঘটনারোধে পাইপলাইনের গ্যাসের চুলার চাবি সাবান পানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।’ ঢামেকের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্তলাল সেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমানে পোড়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অগ্নিকাণ্ডের বেশির ভাগই গ্যাস আর মশার কয়েল থেকে হচ্ছে।

বার্ন ইউনিটের আবাসিক সার্জন ডা. পার্থ শংকর পাল দেশ বলেন, ‘বর্তমানে গ্যাস থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গ্যাসের অগ্নিকাণ্ডের রোগী আসছে, যাদের বেশির ভাগই বাঁচার সম্ভাবনা থাকে না।’

প্রাণহানি কমানোর উপায় : অগ্নিদগ্ধ রোগীকে উদ্ধারের পর তাৎক্ষণিক জামা খুলে প্রচুর ঠান্ডা পানি ঢেলে প্রাণহানি কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। আগুনে পোড়ার পর প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে আক্রান্ত স্থানে প্রচুর পানি ঢালতে হবে। গা পুড়ে গেলে ঝরনার পানির নিচে দাঁড়াতে হবে। তবে পোড়া অংশ বরফের পানি, ফ্রিজের পানি বা বরফ দেওয়া যাবে না। গরম পানিও ঢালা যাবে না। ডিম, টুথপেস্ট, মাখন ও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ধরনের মলম ব্যবহার করা যাবে না। গুরুতর পুড়ে যাওয়া রোগীর শরীর থেকে যতটা সম্ভব পরিধেয় কাপড় খুলতে হবে। তবে এটা যেন টানা-হেঁচড়া না করে করা হয়। এতে আক্রান্ত স্থান আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শরীরে আগুন লাগলে শুয়ে পড়ে বারবার মাটিতে গড়াগড়ি দিতে হবে।

অগ্নিকাণ্ড থেকে বাঁচার উপায় নিয়ে কথা হয় ঢাকায় পাইপলাইনের গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে থাকা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিজিটিডিসিএল) প্রধান নির্বাহী মোস্তফা কামালের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া অগ্নি দুর্ঘটনারোধ সম্ভব না। আমরা গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করছি। ’