মুক্ত স্বদেশভূমিতে বিকশিত আমাদের নাট্যচর্চা|114514|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
মুক্ত স্বদেশভূমিতে বিকশিত আমাদের নাট্যচর্চা
আতাউর রহমান

মুক্ত স্বদেশভূমিতে বিকশিত আমাদের নাট্যচর্চা

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের সাতচল্লিশ বছর পেরিয়ে আমাদের মঞ্চনাটকের অর্জনের দিকে তাকিয়ে দেখা যাক। প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি মিলিয়ে আমাদের বর্তমান মঞ্চনাটকের হালচাল আশাব্যঞ্জক। স্বাধীনতার মতো দীপ্র একটি শব্দের জন্য আমাদের নাট্য অভিপ্রায়কে অপেক্ষা করতে হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে মঞ্চনাটক এখন নিয়মিতভাবে চর্চিত একটি শিল্পমাধ্যম। এই সাতচল্লিশ বছরে অনেক ভাঙাগড়ার মধ্য দিয়ে মঞ্চনাটককে এগোতে হয়েছে। অনেক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও মঞ্চনাটক আমাদের দেশে গর্ব করার মতো একটি সার্থক প্রয়োগ শিল্পমাধ্যম। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিঃসন্দেহে এই উচ্চারণ করা যায় যে, স্বাধীনতা অর্জনের পর মঞ্চনাটক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অন্যতম সেরা ফসল। বাংলা নাটক তথা স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নাটচর্চার পালাবদলের ইতিহাসের দিকে দৃষ্টিপাত করা যাক।

স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের নাটচর্চা সার্বিকভাবে বাংলা থিয়েটারের ধারাবাহিকতাকে অনুসরণ করে আজকের রূপ পরিগ্রহ করেছে। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালে বাংলা থিয়েটারের যাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামে দু’টো রাষ্ট্রের জন্ম হলো। আমরা পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসী হলাম। ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বরে পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে আমাদের বিজয় সূচিত হলো, আমরা স্বাধীন একটি দেশ পেলাম, যার নাম হলো বাংলাদেশ। ভৌগোলিক সীমারেখার অবয়ব পরিবর্তিত হলেও বাংলা নাটকের তথা থিয়েটার চর্চার স্রোতধারা প্রবাহিত ছিল, কখনো তা শীর্ণ হয়েছে, কখনো হয়েছে বেগবান, কখনো বা নানা টানাপোড়েন হয়েছে ম্রিয়মাণ। সার্বিকভাবে বাংলা নাটকের পালাবদলের ইতিহাসকে সংক্ষিপ্ত পরিভ্রমণে এভাবে দেখা যেতে পারেÑ আদিপর্বে প্রথম পদক্ষেপ লেবেদ্যেভের, তারপর উজ্বল নক্ষত্র গিরিশ ঘোষের যুগ, সেই থেকে শিশির যুগ। এদিকে সাধারণ রঙ্গালয়, চল্লিশের দশকে গণনাট্য সংঘ এবং সাম্প্রতিক কালে গ্র“প থিয়েটারের নাট্যচর্চা।

মঞ্চনাটককে ঠিক আজকের দৃষ্টিকোণ থেকে আগে কখনো দেখা হয়নি। বিশেষ উপলক্ষে এক সন্ধ্যা কি দু’সন্ধ্যা নাটক মঞ্চস্থ হতো। নাটককে মনে করা হতো নিছক চিত্তবিনোদনের উপকরণ। পূজা-পার্বণে জমিদারবাড়ির অঙ্গনেই ছিল নাটকের স্থান। আমরা আধুনিক হলাম। পূজা-পার্বণ উঠে গেল, জমিদারের বিলুপ্তি হলো, তার অঙ্গনও মুছে গেল। মঞ্চনাটক ঠাঁই নিল অফিসার ও অফিস কর্মচারীদের বিনোদন ক্লাবে, মফঃস্বল শহরের অতি উৎসাহী নাট্যমোদী ও নাট্যরসিকদের আনুকূল্যে লালিত কিছু ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানে, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোর ছাত্র ইউনিয়নে এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক নাট্যানুষ্ঠানে। এইসব ক্লাব ও প্রতিষ্ঠানগুলো সাড়ম্বরে বছরে এক সন্ধ্যা বা পর পর দু’সন্ধ্যা নাটক মঞ্চায়ন করত। বলাবাহুল্য অভিনেত্রীরা তখন ছিলেন সবাই পেশাদার অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে তারা অভিনয় করতেন।

এ ছাড়া কিছুটা ভিন্ন ধরনের নাট্যচর্চার স্বাদও আমরা পেয়েছি। যেমন কোনো রাজনৈতিক বা ছাত্র সংগঠন তাদের বিভিন্ন সম্মেলনের শেষ দিনে রাজধানী শহর, মফঃস্বল শহর এমনকি গ্রামে-গঞ্জে শ্রমিক, কৃষক ও সংগঠন কর্মীদের মাঝে রাজনৈতিক বক্তব্যপ্রধান নাটক মঞ্চায়ন করত। এ ধরনের মঞ্চায়নের জন্য যেসব পা-ুলিপি বাছাই করা হতো, স্বভাবতঃই সে সব পা-ুলিপি কম-বেশি প্রত্যেক সংগঠনের নিজ নিজ রাজনৈতিক বিশ্বাস ও ধ্যান-ধারণার পরিপূরক হতো। এ ধরনের প্রযোজনায় সাধারণ দর্শকদের কাছে থেকে বেশ সাড়াও পাওয়া যেত। এই কার্যক্রমের ফিরিস্তি থেকে স্বাধীনতা-পূর্বাকালের মঞ্চনাটকের অবস্থান হয়তো কিছুটা বোঝা যায়। তখনকার নাট্যপ্রয়াস ছিল বিক্ষিপ্ত, বিচ্ছিন্ন এবং নিছক বিনোদনমূলক। এককথায় দলগত অভিনয়, মঞ্চ, আলো পোশাক, রূপসজ্জা, আবহ সঙ্গীত, নাটক রচনা, অনুবাদ, রূপান্তর ইত্যাদি বিষয়ে এর আগে ঠিক আজকের মতো করে চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়নি।

বাংলাদেশে কালান্তরের সূত্রপাত একাত্তরের ডিসেম্বরে। বলাবাহুল্য, মুক্ত স্বদেশভূমি উন্মোচিত করে দিল সুকুমার মানসচর্চার নানা দিগন্ত। আমাদের তখন সবারই স্বপ্ন সুন্দরের; কল্যাণের। সেটা ছিল স্বাভাবিক। মুক্ত মানুষ স্বপ্ন দেখে, আকাক্সক্ষা করে মহৎ জীবনের, জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চায়। মানুষের এই সহজ-সুন্দর প্রবৃত্তিগুলোর বিকাশ এবং লালন সম্ভব শুধুমাত্র স্বাধীন দেশেই যার অবকাশ ছিল না ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনকালে। নিজ নিজ কর্মযজ্ঞে নাটক-নিবেদিত উদ্যমীরা এগিয়ে এলেন নতুন উদ্দীপনা নিয়ে। এদের লক্ষ্য নাটকাভিনয়কে শুধুমাত্র বিনোদন-মাধ্যম নয়, মঞ্চনাটককে একটি বেগবান শিল্পে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মঞ্চনাটক হবে সকল সামাজিক অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নাট্যকর্মীদের হাতিয়ার। এরা কারা? এরা সেই আবেগতাড়িত বাঙালি যাদের ছিল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শৌখিন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, টেলিভিশান ও বেতারে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা।

নতুনরাও এগিয়ে এলো। এ নতুনদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তারা অস্ত্র ছেড়ে নাটক করতে এগিয়ে এলো কারণ মঞ্চনাটকের মধ্যে তারা খুঁজে পেল তাদের সংগ্রামী চেতনার আশ্রয়। বেশ কয়েকটি নাট্যগোষ্ঠীর জন্ম হলো। পুরোনোরা নতুন প্রত্যয়ে কাজ শুরু করল। দর্শনীর বিনিময়ে এদেশে নাটকের চর্চা নতুন নয়। এবার তার সঙ্গে যুক্ত হলো আর একটি অভিপ্রায় । তা হলো দর্শনীর বিনিময়ে নাট্যচর্চাকে একটি নিয়মিত অভ্যেস হিসেবে গড়ে তোলা। ১৯৭৩-এর প্রথম দিক থেকে শুরু হলো একটি নাটকের সপ্তাহে একবার করে মাসে চারবার মঞ্চায়ন। একনাগাড়ে একটি নাটকের ১৬ থেকে ২০টি প্রদর্শনী হলো। এ নাট্যপ্রক্রিয়াকে ঘিরে শুরু হলো গ্র“প থিয়েটার অন্দোলনের। সবার ওপরে অসাধ্য সাধিত হলো দর্শকের দিক থেকে। দর্শনীর বিনিময়ে নিয়মিত নাটক দেখার অভ্যেস ধীরে ধীরে গড়ে উঠল। নাট্য প্রক্রিয়া এগিয়ে চলল এভাবে।

একালের সূচনাপর্বে আমাদের মঞ্চ অভিষিক্ত হলো, ‘প্রজাপতির লীলা লাস্য’, ‘সম্রাট ও প্রতিদ্বন্দ্বিগণ’ ও ‘সংবাদ কার্টুনের’ মতো নাটক দিয়ে। তারপর একে একে আমরা মঞ্চে দেখলাম, ‘সাড়ে সাতশ সিংহ’, ‘জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন’, ‘এখন দুঃসময়’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসী’, ‘ওরা কদম আলী’, ‘কিত্তনখোলা’, ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘কেরামত মঙ্গল’ ও ‘নূরলদীনের সারাজীবন’-এর মতো মঞ্চসফল নাটক। আমাদের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, নূরুল মোমেন, মুনীর চৌধুরী আর সাঈদ আহমদ আগে থেকে ছিলেন। এবার পেলাম সেলিম-আল-দীন, মমতাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মামুনুর রশীদ, সৈয়দ শামসুল হক, মান্নান হীরা প্রমুখকে। নাটকের পা-ুলিপির ক্ষেত্রে আর একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো বিদেশি নাটকের রূপান্তর, ভাবানুবাদ ও অনুবাদ।

আমাদের মঞ্চে আমরা একের পর এক দেখলাম অ্যাডওয়ার্ড অ্যালবি, ফ্যারেঙ্ক মলনার, মঁলিয়ের, নিকোলাই গোগোল, কার্ল স্যুখমায়ার, বের্টল্ট ব্রেশট, স্যামুয়েল বেকেট, শেক্সপিয়ার, ডারিয়ে ফো, ইবসেন, এরিয়েল ডর্ফম্যান, তাওফীক আল হাকীম প্রমুখ বিশ্বনন্দিত নাট্যকারদের বাংলা ভাষায় রূপান্তরিত বা অনূদিত নাটকের অত্যন্ত সফল মঞ্চায়ন। বাংলা ভাষায় রচিত বেশ কিছু বিখ্যাত মৌলিক নাটকও গ্র“প থিয়েটারগুলোর প্রযোজনা তালিকায় স্থান পেল। এ পর্যায়ে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, বাদল সরকার, মনজ মিত্র ও বনফুলের নাটক উল্লেখযোগ্য। বিলম্বে হলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাটকের সফল মঞ্চায়ন আমরা দেখলাম। একের পর এক মঞ্চে এলো রবীন্দ্রনাথের ‘অচলায়তন’, ‘রক্তকরবী’, ‘মুক্তধারা’, বিসর্জন ও ‘চিরকুমার’ সভা। মঞ্চে আমরা আরো দেখলাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কৃষণ চন্দর এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের সার্থক রূপায়ণ।

মঞ্চনাটক সভ্যতার সমবয়সী একটি জীবন্ত ও জঙ্গম শিল্পমাধ্যম যা জীবন্ত মানুষের সামনেই অভিনীত হয়, সুতরাং এই প্রয়োগ শিল্পের বিলুপ্তির কথা অকল্পনীয়। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের মতো হয়তো মঞ্চনাটকের সার্বিক জনপ্রিয়তা নেই কিন্তু শিল্পমূল্যের দিক থেকে মঞ্চনাটক সবসময় এগিয়ে ছিল, আজও আছে। গ্রিসীয় সভ্যতার স্বর্ণযুগে বলা হতো, একটি জাতিকে চেনা যায় তার মঞ্চ-ক্রিয়া দিয়ে; এই সুবচনের এখনো কোনো ব্যত্যয় হয়নি।

আমাদের দেশে অনেক টানাপোড়েনের মধ্যেও নাটকের ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন বিস্ময়কর। দেশের প্রধান চারটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিষয় হিসেবে পৃথক বিভাগে পড়ানো হয়। কোনো কোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিষয় হিসেবে পড়ানো হয়। দেশে আজ তিনশটির বেশি নাট্যদল সক্রিয় আছে। আছে নাটকের প্রাইভেট একাধিক বিদ্যালয়। নিয়মিতভাবে দেশের সর্বত্র নাট্যবিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সর্বোপরি বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউটের পৌরোহিত্য করছে, যে ইনস্টিটিউটের সদস্য সংখ্যা বর্তমানে একশটি দেশ।

পরিশেষে, মঞ্চনাটকের বিকল্প টেলিভিশান নাটক অথবা চলচ্চিত্র নয়। মঞ্চনাটক শৈল্পিক বিবেচনায় আজও অগ্রগামী এবং গণশিক্ষারও মাধ্যম বটে। মঞ্চনাটকের সঙ্গে যুক্ত সব কলাকুশলী এই বোধ সম্পর্কে সজাগ এবং সে কারণেই অন্যান্য অর্থকরী পেশাকে অবহেলা করে তারা মঞ্চের কাছে ফিরে আসেন। তারা জানেন যে, মঞ্চনাটক আত্মশুদ্ধি ও সম্মানদানের ক্ষেত্রে সেরা প্রয়োগ শিল্প, এই শিল্পের মৃত্যু নেই আর সে কারণেই এই দেশের মঞ্চকর্মীরা মঞ্চকে মাতৃভূমির মতোই ভালোবাসে। একথা অনস্বীকার্য যে, আমাদের দেশপ্রেম ও মঞ্চনাটক পরস্পর সম্পূরক।

মুক্ত মানুষ স্বপ্ন দেখে, আকাক্সক্ষা করে মহৎ জীবনের, জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে চায়। মানুষের এই সহজ-সুন্দর প্রবৃত্তিগুলোর বিকাশ এবং লালন সম্ভব শুধুমাত্র স্বাধীন দেশেই যার অবকাশ ছিল না ঔপনিবেশিক পাকিস্তানি শাসনকালে

লেখক

অভিনেতা ও নাট্যনির্দেশক