নতুন সময়ে জরুরি জিজ্ঞাসা|114687|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
নতুন সময়ে জরুরি জিজ্ঞাসা
ড. নাদির জুনাইদ

নতুন সময়ে জরুরি জিজ্ঞাসা

আরেকটি বছর শুরু হলো। নতুন বছর মনে স্বাভাবিকভাবেই তৈরি করে নতুন উদ্দীপনা। শুভত্ব, শান্তি আর আনন্দ আমাদের জীবনে স্থায়ী হোক এমন প্রত্যাশা নিয়েই আমরা কাটাতে শুরু করি নতুন সময়। শুভ প্রত্যাশার পাশাপাশি কিছু জরুরি জিজ্ঞাসার মুখোমুখিও হওয়া প্রয়োজন। এই জিজ্ঞাসাগুলো আমাদের বর্তমান সমাজের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক রূপ সম্পর্কে। যে সামাজিক পরিবেশে আমরা এখন বসবাস করছি তার সুন্দর এবং ভালো দিকগুলো আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন দুর্বল দিক সম্পর্কেও নাগরিকদের সচেতনতা অর্জন জরুরি। এমন সচেতনতা থাকলেই কেবল সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন অসঙ্গতি এবং ক্ষতিকর দিকের সমালোচনা করা সম্ভব। আর নেতিবাচক দিক প্রতিরোধ করার মাধ্যমেই সমাজকে আমরা প্রকৃতঅর্থে শান্তিময় এবং সবার জন্য মঙ্গলজনক করে তুলতে পারব।

প্রযুক্তিগত উন্নতি আমরা দেখতে পাচ্ছি। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট এখন সহজলভ্য। কেবল টেলিভিশনে আমরা দেখছি বহু চ্যানেল। হাতের মোবাইল ফোনেই তাকিয়ে অনলাইন সংবাদপত্রের মাধ্যমে জানতে পারছি ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা। সকালের সংবাদপত্রের জন্য এখন আর অপেক্ষা করে থাকতে হয় না। ইউটিউব বা বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে চলচ্চিত্র দেখা এখন সহজ। সিনেমা হলে যাওয়ার দরকার পড়ে না।  আবার চলচ্চিত্র তৈরি করাও সহজ। এখন মোবাইল ফোন দিয়েও চলচ্চিত্র তৈরি করা যায়।

প্রশ্ন করতে হয় এমন সামাজিক পরিস্থিতি আমাদের তথ্য দিচ্ছে বটে, এবং আমাদের যোগাযোগ সহজতর করেছে। কিন্তু তা কি মানুষের মনে এই বোধ তৈরি করতে পারছে যে তাদের সামাজিক এবং রাজনৈতিক সচেতনতা অর্জন করা প্রয়োজন? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা অনলাইন ভিডিও কথোপকথনের সাহায্যে আমরা যে যোগাযোগ করছি প্রতিনিয়ত, কিন্তু সরাসরি মানুষের সাথে দেখা করছি না, কিংবা দীর্ঘসময় কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে সময় কাটানোর জন্য আমরা যে অতীতের মতো বাইরে খোলা মাঠে বা কোনো খোলা প্রাঙ্গণে অনেকের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছি না এর ফলে আমরা কি অসামাজিক হয়ে উঠছি না এবং আমাদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে না?

গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞ লেভ ম্যানোভিচ বলেছিলেন, আমাদের সমাজ এখন একটি স্ক্রিন বা পর্দার সমাজে পরিণত হয়েছে। বাজার করার জন্য, টাকা তোলার জন্য, দোকান থেকে খাবার বাড়িতে আনার জন্য, চিঠি লেখার জন্য, গল্প করার জন্য আমরা এখন তাকাই মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে। এখনকার কমবয়সীরা বড় হচ্ছে এমন পরিবেশেই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শহরে খোলা মাঠের সংখ্যা কমছে আর তৈরি হচ্ছে বাসস্থান আর বিপণি বিতান। বিকেলে খেলাধুলা করা কেন মনের এবং শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি তা কি এখনকার কমবয়সীদের জানানো হচ্ছে?

কমবয়সীদের কি বাড়িতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে ইন্টারনেট ব্যবহার করে তাদের দেখা উচিত বিভিন্ন চিন্তাশীল চলচ্চিত্র এবং নাটক যা তাদের মনে তৈরি করবে নান্দনিক এবং শৈল্পিক অনুভূতি, চিন্তার গভীরতা এবং সমাজ সচেতনতা? প্রযুক্তি ব্যবহার করে তথ্য পাওয়া এখন সহজ। কিন্তু যে প্রশ্নটি জরুরি হয়ে ওঠে তা হলো তথ্য কি আমাদের মধ্যে প্রজ্ঞা, সুরুচি এবং বিচারবুদ্ধি সৃষ্টি করতে পারছে? একজন ইংরেজ কবির লেখা কয়েকটি কথা মনে পড়ে : ‘বিচক্ষণতা এবং মননশীলতা কোথায় যা আমরা জ্ঞানের মধ্যে হারিয়ে ফেলেছি? আর জ্ঞান কোথায় যা আমরা হারিয়ে ফেলেছি তথ্যের মধ্যে?’

বহু মানুষের বিশেষ করে কমবয়সীদের চিন্তাভাবনার ওপর টেলিভিশন নাটকে এবং চলচ্চিত্রে দেখানো বিভিন্ন দিকের প্রভাব আমরা দেখতে পাই। নাটক, চলচ্চিত্র চিন্তাসমৃদ্ধ হলে তা দর্শকের উপকার করবে। মানুষ শিখবে রুচিশীল, মার্জিত আচরণ। মানুষের যৌক্তিকভাবে চিন্তা করার সক্ষমতা তৈরি হবে। নাটক, চলচ্চিত্রে সমাজসচেতন উপাদান সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন অন্যায়, দুর্নীতি, এবং অসুন্দর দিকের বিরুদ্ধে দর্শকদের প্রতিবাদী করে তোলে। আমাদের প্রশ্ন করা উচিত বর্তমান সময়ের টেলিভিশন নাটক এবং চলচ্চিত্রের বক্তব্য এবং বিষয়বস্তু নিয়ে।

উনিশশ সত্তর এবং উনিশশ আশির দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যে বক্তব্যধর্মী, সমাজসচেতন, নান্দনিকভাবে আকর্ষণীয় নাটক তৈরি হতো সেই একই মানের টেলিভিশন নাটক কি বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে তৈরি হচ্ছে? অতীতের সেই সব নাটকে আমরা দেখেছি শক্তিশালী অভিনয়। তেমন উঁচু মানের অভিনয় কি এখন আমরা দেখতে পাই? জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩), সূর্যকন্যা (১৯৭৬) বা রূপালি সৈকতে (১৯৭৯), মসিহ্উদ্দিন শাকের এবং শেখ নিয়ামত আলীর সূর্য দীঘল বাড়ী (১৯৮০), সৈয়দ সালাহ্উদ্দীন জাকীর ঘুড্ডি (১৯৮০), তারেক মাসুদের মাটির ময়না (২০০২) প্রভৃতি সমাজসচেতন, চিন্তাশীল এবং নির্মাণশৈলীর দিক দিয়ে আকর্ষণীয় চলচ্চিত্র কি এখন নিয়মিত তৈরি হচ্ছে আমাদের দেশে? নাকি নাটক, চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কেবল বিনোদন প্রদানই এখন মুখ্য উদ্দেশ্য?

মানুষের রুচিবোধ এবং নীতিবোধ উন্নত করতে হলে প্রয়োজন সুন্দর এবং চিন্তাশীল সংস্কৃতি। ইদানীং বড় শহরে কাজের জন্য বসবাস করে বহু মানুষ যারা খুব বেশি লেখাপড়া করার সুযোগ পায় না। গ্রামের অনেক সাধারণ অধিবাসীও উন্নত শিক্ষা অর্জন করতে পারে না। গ্রামের এবং শহরের শ্রমজীবী সাধারণ মানুষরা কোন ধরনের চলচ্চিত্র দেখে বেশির ভাগ সময়? এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে এই ধরনের মানুষরা চটকদার বিনোদনধর্মী ছবি দেখতেই পছন্দ করে। শৈল্পিক ছবি তারা বুঝতে পারবে না।

অথচ এই মানুষরা যদি সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী (১৯৫৫), অশনি সংকেত (১৯৭৩), ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা (১৯৬০), সুবর্ণ-রেখা (১৯৬২), জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া বা তারেক মাসুদের মাটির ময়না দেখার সুযোগ পেতেন নিশ্চয়ই তারা এই ছবিসমূহের অর্থ অনুধাবন করতে পারতেন। এবং এমন মননশীল চলচ্চিত্র তাদের রুচি এবং যুক্তিবোধ দুইই উন্নত করতে সহায়ক হতো। কিন্তু এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বাংলা চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ কি সাধারণ মানুষের জন্য তৈরি করা হচ্ছে?

প্রশ্ন করতে হয় সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন প্রমুখ বিখ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রকারের ছবি দেখার জন্য কি শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রছাত্রীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে? সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা প্রায়ই সমাজে সংঘটিত বিভিন্ন অন্যায় নিয়ে আলোচনা করি। ফেইসবুকে বা ব্লগে করা সেই আলোচনা কিন্তু বহু শ্রমজীবী মানুষের কাছে পৌঁছায় না কারণ তারা ফেইসবুক ব্যবহার করে না এবং সংবাদপত্রও তারা পড়ে না। অন্যায়, অন্ধচিন্তা আর শোষণের বিভিন্ন রূপ সম্পর্কে তাদের সচেতন করার জন্য দরকার এমন নাটক, চলচ্চিত্র তাদের দেখানো যা তাদের মধ্যে চিন্তার গভীরতা সৃষ্টি করতে পারে।

গণমাধ্যম এখন তৈরি করছে বিভিন্ন নায়ক। গণমাধ্যম-সৃষ্ট এই নায়করা খ্যাতি পেয়েছেন মূলত ব্যাপক প্রচারের জন্য। প্রচারের কারণে এই নায়করা সমাজের বহু মানুষের কাছে পরিচিত। কিন্তু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা শহরে যে তরুণরা গেরিলাযোদ্ধা হিসেবে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অসীম সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের এবং আরও অনেক মুক্তিযোদ্ধার নাম কি জানা আছে বর্তমান সময়ের বেশির ভাগ কমবয়সীদের?

প্রকৃত নায়ক আর গণমাধ্যমের প্রচারের কারণে তৈরি হওয়া নায়কের মধ্যে পার্থক্য কী তা অনুধাবন করার মতো সচেতনতাবোধ কি এই সমাজে মানুষের মধ্যে তৈরি করতে আমরা সক্ষম হয়েছি? নিজেদের ইতিহাস সম্পর্কে যথেষ্ট এবং সঠিক ধারণা অর্জন করাও যে সুনাগরিক হওয়ার জন্য জরুরি এই বোধও কি সমাজে তৈরি করা হচ্ছে? নাকি অর্থনৈতিক উন্নতি অর্জনের ভাবনা নিয়েই আচ্ছন্ন এই সময়ের মানুষের মন?

অর্থনৈতিক উন্নতির ছাপ আমরা দেখছি। কিন্তু একই সঙ্গে আমরা দেখছি শহরের পথে সৃষ্টি হচ্ছে অসহনীয় ট্রাফিক জ্যাম। কখনো গাড়িতে যাতায়াতের পরিবর্তে পায়ে হেঁটেই কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়। বাড়ছে তীব্র শব্দদূষণ যা নাগরিকদের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। শব্দদূষণ হয় এমন কাজ করা যে কোনোভাবেই উচিত নয় সেই বোধও কি আমরা দেখি বহু মানুষের মধ্যে? শপিং মল আর ফাস্ট ফুডের দোকানের সংখ্যা অতি দ্রুত বাড়ছে রাজধানীতে। কিন্তু প্রায় দুই কোটি মানুষ যে রাজধানীতে বসবাস করে সেখানে চিন্তাশীল বই পাওয়া যায় এমন দোকানের সংখ্যা খুবই কম। তাহলে এই শহরে কোন দিকগুলো বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে বর্তমান সময়ে?

কী প্রকৃতঅর্থে মঙ্গলজনক আর কল্যাণকর সেই ব্যাপারে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি না হলে সমাজে চাকচিক্য আর জাঁকজমক বাড়লেও সমাজ সত্যিকারভাবে সুন্দর আর শান্তিময় হয়ে উঠবে না। মানুষের মধ্যে শুভচেতনা সৃষ্টি করতে পারলেই মান বাড়বে রাজনীতি, সংস্কৃতি এবং সমাজের। নতুন সময়ে এই প্রশ্নটিই জরুরি হয়ে ওঠে, আমাদের সমাজে মানুষের মধ্যে শুভবোধ, সুরুচি এবং সচেতনতা কি আমরা সৃষ্টি করতে পারছি? নতুন সময়ে এমন জিজ্ঞাসা আমাদের সঠিক, যৌক্তিক এবং ন্যায়সংগত কাজ করতে অনুপ্রাণিত করুক, সেটাই প্রত্যাশা। 

আমাদের সমাজ এখন একটি স্ক্রিন বা পর্দার সমাজে পরিণত হয়েছে। বাজার করার জন্য, টাকা তোলার জন্য, দোকান থেকে খাবার বাড়িতে আনার জন্য, চিঠি লেখার জন্য, গল্প করার জন্য আমরা এখন তাকাই মোবাইল বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে। এখনকার কমবয়সীরা বড় হচ্ছে এমন পরিবেশেই। কিন্তু দেশের বিভিন্ন শহরে খোলা মাঠের সংখ্যা কমছে আর তৈরি হচ্ছে বাসস্থান আর বিপণি বিতান। বিকেলে খেলাধুলা করা কেন মনের এবং শরীরের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি তা কি এখনকার কমবয়সীদের জানানো হচ্ছে?

লেখক

অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।