কৃষির সাফল্য নিবেদিত হোক কৃষকের কল্যাণে|114688|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০
কৃষির সাফল্য নিবেদিত হোক কৃষকের কল্যাণে
এস এম মুকুল

কৃষির সাফল্য নিবেদিত হোক কৃষকের কল্যাণে

কৃষি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম সারিতে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৭৫ ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে বসবাস করে। গ্রামে যারা বসবাস করে, তাদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৬০ ভাগ লোকের এখনো কৃষিখামার বা চাষাবাদ রয়েছে। অন্যদিকে শহরেও শতকরা প্রায় ১১ ভাগ মানুষ সরাসরি কৃষির সঙ্গে যুক্ত। মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবে জিডিপিতে এখন কৃষি খাতের অবদান শতকরা ১৫.৩৩ ভাগ। এ ছাড়া এই কৃষি খাতে কর্মসংস্থান হচ্ছে শতকরা ৪৮.১ ভাগ কর্মজীবী মানুষের। কৃষি এখন শুধু ফসলের মাঠে নয়Ñ মৎস্য, গবাদি পশু পালন, সবজি ও ফলের বাণিজ্যিক চাষাবাদ থেকে শুরু করে ব্যতিক্রম এবং নতুন নতুন কৃষিজ বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহ ও সাফল্য দেশের সামগ্রিক কৃষি উন্নয়নে আশার আলো দেখাচ্ছে। ছাদ-কৃষিতেও ব্যাপক সাফল্য, আগ্রহ ও জনপ্রিয়তা আশাব্যঞ্জক।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও, জনসংখ্যা বৃদ্ধির দ্রুতগতির সঙ্গে সীমিত ও সংকোচিত হয়ে আসা জমি নিয়েও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে, যা অভাবনীয়। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার এবং যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান উজ্জীবক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। তার সঙ্গে বিশেষ অবদান রয়েছে আমাদের কৃষিবিজ্ঞানীদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর নিবিষ্ট গবেষণায় উচ্চফলনশীল, কম সময়ে ঘরে তোলা যায় এমন জাত ও পরিবেশসহিষ্ণু নতুন জাত উদ্ভাবন। ধান, পাটের পাশাপাশি খাদ্যশস্য, শাকসবজি, রকমারি ফল, সমুদ্র ও মিঠাপানির মাছ, গবাদি পশু, পোলট্রি মাংস ও ডিম, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি, দুগ্ধ উৎপাদন অনেক বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ব উৎপাদন তালিকায় শীর্ষত্বের লড়াই করছে বাংলাদেশের কৃষি।

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতি ও জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় রাখতে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার আগে যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হতো, কালপরিক্রমায় স্বাধীনতার চার দশক পর ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সংগ্রামে নিয়োজিত বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা। সময়ের বিবর্তনে এসেছে নতুন নতুন ফসল, প্রসারিত হচ্ছে নব নব প্রযুক্তি। কৃষিকে বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ এখন বেশ অগ্রগামী। কৃষি সেক্টরে ধান, পাটের পাশাপাশি মৎস্য ও পশু পালন, দুগ্ধ উৎপাদন, হাঁস-মুরগি পালন, নার্সারি, বনায়ন এবং কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্রশিল্পের দ্রুত প্রসার ঘটছে বাংলাদেশে। কাজেই কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও সময়োপযোগী বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার নিশ্চিতের পদক্ষেপ গ্রহণ করায় খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে রেকর্ডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল চাষের দিক থেকেও বিশ্বে পথিকৃৎ বাংলাদেশ। কৃষি উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষির আনুপাতিক অবদান কমলেও মোট কৃষি উৎপাদন বাড়ছে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি, বীজ, সার এবং যন্ত্রের ব্যবহার উৎপাদন বাড়ার পেছনে প্রধান কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে উচ্চফলনশীল জাতের বীজ এবং পরিবেশসহিষ্ণু বিভিন্ন ফসল।

কৃষক ও প্রযুক্তি-প্রজন্মের মেলবন্ধন : এখন অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগ। তথ্যই বদলে দিতে পারে গ্রামীণ চেহারা, গতি-প্রকৃতি, সূচনা করতে পারে আর্থিক সমৃদ্ধির নবদিগন্ত। চীনের কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে তথ্য প্রকাশ এ মুহূর্তে চীনের শতকরা ৯৯ ভাগ শহরে ইন্টারনেট সংযোগ আছে। অন্যদিকে তাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ সুবিধাসহ তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের ফলে কৃষকরা অনলাইনের মাধ্যমে পণ্য বিক্রিতে ছয় গুণ বেশি লাভ করতে পারছেন। অবাধ তথ্যপ্রবাহের এ সুযোগটি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার মাধ্যমে সম্ভব হতে পারে। এর ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্যের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য পেয়েও সমৃদ্ধ ও সচেতন হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রযুক্তির মেলবন্ধন ঘটলে তরুণরাও হয়ে উঠবে কর্মোদ্দীপক। দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে বিদেশে গিয়ে মেধা, শ্রম, পুঁজি ও সময় খাটিয়ে যতটুকু লাভবান হবে তার চেয়ে বহু গুণে দেশের মাটিতে কম টাকা বিনিয়োগ করে গ্রামীণ এলাকা থেকেও বিপুল আয় করা সম্ভব।

বাঁচাতে হবে দেশীয় ধানের অস্তিত্ব : প্রকৃতিবান্ধব ৫০ জাতের দেশীয় ধান হারিয়ে যাচ্ছে। দেশীয় এসব প্রকৃতিবান্ধব ধানে উৎপাদন খরচ অনেক কম ছিল অথচ এগুলো ছিল মানব দেহের জন্য উপকারী। এসব ধান আবাদে জমির মাটি সমান করতে হয় না। সার, কীটনাশক, সেচের বেশি প্রয়োজন হয় না এবং নিড়ানি কম লাগে। এসব ধানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি থাকায় পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন হয় না। হারানো জাতের ধানের মধ্যে রয়েছেÑ দুধকলম, কাজলদীঘি, পঙ্খিরাজ, টেপা, সোনামুখি, জাদুফলা, বাদশাভোগ, আউশ, গৌরিকাজল, বালামকাপো, রাজাশাল, কাটারিভোগ, দুধমণি, দেবমণি, আশ্বিনা মালভোগ, আশ্বিনা দীঘা, খিরকুনি, খাসকুলি, কালিজিরা, সোনারগাঁ প্রভৃতি। যশোরসহ বেশ কিছু অঞ্চলে অভিজ্ঞ কৃষকরা সীমিত পরিসরে হলেও সুগন্ধি ধানের চাষাবাদ করছেন এটি একটি ইতিবাচক দিক। কৃষি গবেষণায় এসব ধানের নতুন প্রজাতি সৃষ্টির মাধ্যমে এর অস্তিত্ব রক্ষার পাশাপাশি চাষাবাদে কৃষকদের আগ্রহী করে তোলতে হবে।

তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা : যুবসমাজের মেধা ও শ্রমকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলেই খুলে যাবে উন্নয়নের দুয়ার। সফল আবাদের পাশাপাশি এখন হাঁস, মুরগি, গরু মোটাতাজাকরণ, মৎস্য, দুগ্ধ খামারের দিকে তাদের আগ্রহী করে তোলতে হবে। তাদের সামনে এসব ক্ষেত্রের সাফল্য সম্ভাবনাগুলোর তথ্য তুলে ধরতে হবে। তাহলে তরুণরা চাকরিনির্ভর না হয়ে আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রকল্প স্থাপনে আগ্রহী হবে। তরুণদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে কাজে লাগাতে হবে। আমাদের তিন তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবাবা ইসলাম, সিফাত সারোয়ার ও সাজ্জাদুর রহমান মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত এইচএসবিসি ইয়াং এন্ট্রিপেনিউর অ্যাওয়ার্ড ২০১০-এর দ্বিতীয় সেরার পুরস্কার অর্জন করে। তাদের বিষয় ছিল ইউরিয়া সারের অপচয় রোধে কাঁচাবাজারের পরিত্যক্ত শাকসবজি সীমিত অক্সিজেনে পুড়িয়ে পরিবেশবান্ধব সার ‘বায়োচার’ তৈরি করা। তরুণ প্রজন্মের এসব ভাবনাকে দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

গ্রামের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক বাড়াতে চীনের উদ্যোগ : গ্রামীণ জীবন সম্পর্কে ধারণা নিতে এবং জীবনযাত্রার পার্থক্য অনুধাবনের জন্য চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় চংকিং শহর কর্তৃপক্ষ শহরের শিক্ষার্থীদের গ্রামে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের মতে, এর ফলে প্রজন্মগত ও ভৌগোলিক দূরত্ব কমানো সম্ভব হবে। তরুণ বয়সেই তারা ব্যয়বহুল-অভিজাত জীবনযাপনের পাশাপাশি গ্রামীণ জীবন সংগ্রাম এবং তাদের বাবা-মা-স্বজন-সহোদর ও পূর্বপুরুষদের জীবনযুদ্ধ সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা পাবে। চকিং পৌর প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গ্রামে অবস্থানের সময় চকিং অঞ্চলের প্রায় সাড়ে ৭ লাখ শিক্ষার্থীর প্রত্যেককেই ১০০টি করে চারা গাছ রোপণ করতে হয়। এক মাসের সামরিক প্রশিক্ষণ নিতে হয়। কারখানায় কাজ করতে হয়। চীনে এই প্রক্রিয়ায় স্নাতক পড়া প্রায় ২ লাখ শিক্ষার্থীকে গ্রাম কর্মকর্তা হিসেবে ভাড়া করা হয়েছে। এর ফলে তারা ধারণা করছেÑ এই শিক্ষার্থীদের জীবনবোধ হবে মানবীয়। তারা জীবনের কঠিন সংগ্রামকে শক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে পরিশ্রম করে জয় করতে সমর্থ হবে। বাংলাদেশে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় চীনের মতো একটি উদ্যোগ গৃহীত হলে কৃষিক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন আসবে। জীবনবোধ, পারিবারিক সম্পর্ক ও দেশীয় সংস্কৃতিতে উজ্জীবিত হয়ে উঠবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম।

কৃষিক্ষেত্রে সৌরবিদ্যুৎ : বোরো মৌসুমে দেশে প্রায় ২০ লাখ একর চাষযোগ্য জমিতে প্রায় সাড়ে ১৬ লাখ সেচপাম্প ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে ১৬ লাখ একর জমি চাষে ব্যবহার হয় ১০ লাখ ৮০ হাজার বিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প। বাকি ১১ লাখ ৫৮ হাজার সেচপাম্প ব্যবহৃত হয় ডিজেলচালিত। সারা দেশে বিদ্যুৎ ও ডিজেলচালিত সেচপাম্পগুলোকে সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা সম্ভব হলে বছরে ৭৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও ৮০ কোটি লিটার ডিজেল সাশ্রয় হবে। ফলে ডিজেল ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে সরকারের ৮৫৩ কোটি টাকা ভর্তুকি বেঁচে যাবে। এই ভর্তুকির টাকাটা পরপর তিন থেকে চার বছর সৌরবিদ্যুতের পেছনে ভর্তুকি হিসেবে ব্যয় করলে সরকার পরবর্তী ২০ বছরের জন্য ভর্তুকি দেওয়া থেকে বেঁচে যাবে। পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ তো সাশ্রয় হবেই।

বাড়াতে হবে গ্রামীণ বিনিয়োগ : গ্রামের মানুষদের উপেক্ষা করে প্রকৃত উন্নয়ন অসম্ভব। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। গ্রাম এলাকায় অন্তত উপজেলা পর্যায়ে কৃষিভিত্তিক শিল্প-কারখানা স্থাপনে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে। গ্রামীণ বিনিয়োগ বাড়লেই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। এলাকায় কাজ পেলে মানুষ আর শহরমুখী হবে না। শহরে মানুষের অযাচিত চাপ কমবে।

কৃষিপণ্য রপ্তানি : কৃষি এবং কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে রপ্তানি জাতীয় অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। কিন্তু রপ্তানি আয়ের সুবিধা কৃষকের ঘরে যাচ্ছে না। রপ্তানি খাতকে আরো জোরদার করতে হলে কৃষকদের রপ্তানি আয়ের সুফল পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত কৃষিজপণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিশ্বের ভোক্তার টেবিলে পৌঁছে দিয়েছে প্রাণ আরএফএল গ্রুপ। এ রকম আরো উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রয়োজন। ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, মানসম্মত ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অতিরিক্ত শতকরা ৩০ ভাগ সবজি উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এক হিসাবে জানা যায়, দেশের প্রতিটি পরিবার যদি প্রতিদিন এক কেজি করে সবজি উৎপাদন করে, তাহলে দেড় কোটি বসতভিটায় বছরে প্রায় ৫৫ লাখ টন সবজি পাওয়া যেতে পারে, যা আমাদের চাহিদার ৬৯ ভাগ পূরণ করতে পারে।

কৃষিজ গবেষণা : বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট নতুন নতুন উন্নত জাতের ধান বাজারে উন্মুক্ত করেছে। এরই মধ্যে খরা, বন্যা ও লবণাক্ততাসহিষ্ণু ধান উৎপাধিত হয়েছে। সোনালি আঁশখ্যাত পাটের জিনোম আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম ও তার সহযোগীরা। আবার ফিরে আসছে হারানো পাটের ঐতিহ্য। চালু হবে পাটকল, সৃষ্টি হবে ব্যাপক কর্মসংস্থান। বাড়বে রপ্তানি আয়। বাংলাদেশে কৃষিপণ্যের চেয়ে কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় সেচব্যয় ও উৎপাদন খরচ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। পাশের দেশ ভারতে এ খরচ ১৩ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৮ শতাংশ ও ভিয়েতনামে ৬ শতাংশ। অথচ আমাদের দেশে এই খরচ ২৭ শতাংশ। কৃষি গবেষণা ছাড়া আমাদের কোনো উপায় নেই। কৃষিকে লাভজনক করতে হবে। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাঠের চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে হবে।

কৃষকের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিতে হবে : কৃষকরা স্বভাবগতভাবে উদ্ভাবক। তারা অসীম সৃজনীক্ষমতার অধিকারী। কৃষকের জ্ঞানকে স্বীকৃতি দিতে হবে। কৃষকরাই বড় ও প্রকৃত প্রকৃতি বিজ্ঞানী। গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা তাত্ত্বিক সূত্র না জানলেও নিবিষ্ট চিন্তাচর্চা ও প্রকৃতির গতিবিধির সঙ্গে সখ্যের খেলায় খেলায় উদ্ভাবন করেন নতুন পদ্ধতি-প্রক্রিয়া। জ্ঞান গবেষণা ছাড়াই প্রাকৃতিক চর্চায় নতুন জাতের ‘হরি ধান’ উদ্ভাবন করেন আমাদের হরিপদ কাপালি। তিনি যেমন চ্যানেল আইয়ের স্বীকৃতি পেয়েছেন, তেমনি অনেকে নিবিষ্ট মনে কাজ করে যাচ্ছেন, উদ্ভাবন করছেন নতুন নতুন জাতের ফসল এবং কৃষিবান্ধব প্রযুক্তি, যা আমাদের কৃষিব্যবস্থায় এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। বেড়েছে উৎপাদন। কৃষি আমাদের সমৃদ্ধির অন্যতম উৎস। এই কৃষিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন গ্রামবাংলার কৃষক। বন্যা, খরাসহ কত প্রাকৃতিক দুর্যোগ ধুয়ে-মুছে নিয়ে গেছে স্বপ্নমিশ্রিত ঘাম ঝরানো সোনার ফসল। কোনো বিপর্যয়ই দমাতে পারেনি কৃষকদের। নিঃস্ব, শূন্য অবস্থান থেকেও বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলার কৃষক। ফলিয়েছে সোনার ফসল। হাড়ভাঙা পরিশ্রমে উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নেই। তবু তারা অভিযোগহীন কাজ করেই যাচ্ছেন নিরন্তর। নিজেদের অভাব, অনটন, দুর্গতি ভুলে তারা নতুন করে কাজে নামেন। অকৃত্রিম ভালোবাসা আর দেশপ্রেমে কৃষকের জুড়ি নেই।

কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে প্রকৃতি ও জনসংখ্যার সঙ্গে সমন্বয় রাখতে যুদ্ধ করে এগিয়ে চলেছে। স্বাধীনতার আগে যেখানে সাড়ে সাত কোটি মানুষের খাদ্য উৎপাদন চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেতে হতো, কালপরিক্রমায় স্বাধীনতার চার দশক পর ১৭ কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর সংগ্রামে নিয়োজিত বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা। সময়ের বিবর্তনে এসেছে নতুন নতুন ফসল, প্রসারিত হচ্ছে নব নব প্রযুক্তি। কৃষিকে বহুমুখীকরণে বাংলাদেশ এখন বেশ অগ্রগামী

লেখক

কৃষি ও অর্থনীতিবিষয়ক লেখক