অনুদার গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা|115250|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৪:৫২
অনুদার গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা

অনুদার গণতন্ত্র ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনা

উন্নয়ন একটা বহুমাত্রিক প্রক্রিয়া। তার কেন্দ্রে অবস্থিত হচ্ছে মানুষ। যখন সমাজের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক উন্নয়ন হয় এবং সামগ্রিকভাবে সর্বজনের (চঁনষরপ) স্বাধীনতা ও সক্ষমতা ভারসাম্যপূর্ণভাবে বিকাশ লাভ করে, তখন তাকে আমরা ‘আদর্শ উন্নয়ন’ বলতে পারি। কিন্তু বিশ্বে সাধারণত এ রকম আদর্শ উন্নয়ন খুব কমই আছে। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজে এবং চীনে আমরা একসময় দেখেছি বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রচলিত অর্থে ‘গণতন্ত্র’ না থাকলেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সর্বজনের সুষম উন্নয়ন হয়েছিল। আবার সেসব দেশে বিশেষত রাশিয়ায় একটা পর্বে এসে বাজারকে এবং ব্যক্তিগত প্রণোদোনাকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করা হলো। দেখা দিল কেন্দ্রীভূত আমলাতন্ত্র ও দুর্নীতি। সময়োচিত সংস্কারের ঘাটতির কারণে সেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন স্থবির হয়ে গিয়েছিল। তাই আমরা বলতে পারি প্রাথমিক পর্বে গণতন্ত্র ছাড়াও সুষম অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে তা টেকসই থাকতে পারেনি।

বর্তমানে এ দেশে মিশ্র অর্থনীতি বিদ্যমান। রাষ্ট্রীয় খাত ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের ক্রমবর্ধমান ভারসাম্যপূর্ণ উদ্যোগ এবং প্রত্যেকের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের সুযোগ ও সংস্কার ছাড়া উন্নয়নটা এ দেশে টেকসই হবে না। বাংলাদেশের প্রাথমিক পর্বে ধীরলয়ে (৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে) অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০০০ সালের পর তা বাড়তে বাড়তে প্রথমে ৫, পরে ৬ এবং অবশেষে ৭ শতাংশে উপনীত হয়েছে। সামাজিক নির্ণায়কের ক্ষেত্রে যেমন নারীর অগ্রগতি, মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি এই ধরনের মানব উন্নয়ন, কৃষি উন্নয়ন, রেমিট্যান্স ও পোশাকশিল্পে লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। এসব কেউ অস্বীকার করতে পারবে না।

তবে এখানে দুটো স্থায়ী ঘাটতি থাকছে ১. এই উন্নয়নের ফল সব মানুষ সুষমভাবে পাচ্ছে না। ২. ধনী-গরিবের আয়-সম্পদ-শিক্ষা-চিকিৎসা বৈষম্য দৃষ্টিকটুভাবে বাড়ছে। তা ছাড়া দারিদ্র্যের আপেক্ষিক হার হ্রাস পেলেও মোট দরিদ্র লোকের সংখ্যা এখনো প্রায় চার কোটির সমান। এই সংখ্যা বিশ্বের অনেক দেশের মোট জনসংখ্যার চেয়ে কম। শুধু তাই নয়, ৪০ বছর ধরে সব সরকারের আমলেই দেখছি ধনী ও গরিবের মধ্যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য বেড়েছে এবং ক্ষমতা ধনীদের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। রাষ্ট্র তাদেরই সেবা করছে। তাই ভবিষ্যতে সুশাসন ও গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নতির ধারা টেকসই নাও হতে পারে।

বর্তমান উন্নয়ন ধারায় গরিবের একদম কিছু হচ্ছে না তা আমি বলছি না। গরিবও এগোচ্ছে, ধনীও এগোচ্ছে। কিন্তু ধনী এগোচ্ছে খরগোশের গতিতে আর গরিব এগোচ্ছে শামুকের গতিতে। বাংলাদেশে অতি ধনীদের সম্পদ বৃদ্ধির হার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বেশি (১৭.৪%)। গড় আয়ও অনেক বেড়েছে! যদি বলি আমার অর্ধেক শরীর ফ্রিজে, অর্ধেক শরীর চুল্লির মধ্যে আছে আর সব মিলিয়ে আমি গড়ে নাতিশীতোষ্ণ আছি ব্যাপারটা অনেকটাই সে রকম। সে জন্য মানুষ এত উন্নতির পরও সুশাসনের অভাবে অসন্তুষ্ট।

মানুষ বাস্তবে দেখছে, সে পরিশ্রম অনুযায়ী ফল পাচ্ছে না। কিন্তু আরেকজন পরিশ্রমের তুলনায় অনেক বেশি পাচ্ছে। আসলে উন্নয়ন হচ্ছে সবারই। তবে নিচের দিকে উন্নয়ন হচ্ছে তুলনামূলক অনেক কমমাত্রায়। ওপরের দিকে বেশিমাত্রায় হচ্ছে। তার ফলে আয়বৈষম্য বেড়ে যাচ্ছে। সব জায়গাতেই বৈষম্য লক্ষণীয়। আমরা যে গড় আয়ু বৃদ্ধির কথা বলছি, সেখানেও গরিবের গড় আয়ু অতটা বাড়েনি। শিক্ষার হারের কথা যদি বলি, গরিবের ঘরে শিক্ষার মান যতটা বেড়েছে ধনী ও মধ্যবিত্তের ঘরে, তা বেড়েছে অনেক বেশি। আগে অনেকেই প্রাইমারি স্কুলে পড়তে পারত না। এখন পারছে। কিন্তু গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের মান আর শহরের প্রাইমারি স্কুলের মানে অনেক তফাত। শহরের সরকারি প্রাইমারি স্কুলের মান আর বেসরকারি ইংলিশ মিডিয়ামের স্কুলের মানেও অনেক বৈষম্য।

স্বাস্থ্য খাতেও বৈষম্য আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বৈষম্যটা হয়তো পরিমাণগতভাবে দেখা যাবে না। কিন্তু গুণগতভাবে দেখতে পাব। যেমন স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হয়তো অনেকেই বলবেন, কমিউনিটি ক্লিনিক অনেক হয়েছে। সবাই স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে। কিন্তু অল্পসংখ্যক ধনী স্কয়ার হাসপাতাল বা সিঙ্গাপুরে গিয়ে যে মানের সেবা পাচ্ছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের বারান্দায় যে রোগীটি আছে সে তো তা পাচ্ছে না। তার মানে প্রতিটি স্তরে আমরা একটা বৈষম্য সৃষ্টি করে ফেলেছি। সমাজটা আর ঐক্যবদ্ধ থাকছে না। সমাজে হিংসা বা ঈর্ষার প্রতিযোগিতা চলছে। তাই উন্নয়ন বলা যাবে গড়ে কিন্তু বণ্টনের দিক থেকে এটাকে আদর্শ অবস্থা বলা যাবে না।

অধিকসংখ্যক মানুষ যদি দেখে তারা যে রকম কাজ বা কষ্ট করছে কিন্তু সে রকম কিছু পাচ্ছে না, আর অল্পসংখ্যক মানুষ যদি দেখে কোনো কাজ ছাড়াই অনেক কিছু পাওয়া যাচ্ছে, যেমন চাইলেই ব্যাংক থেকে টাকা পাচ্ছে, তা আবার বিদেশেও পাঠিয়ে দিতে পারছে। কর ফাঁকি দিতে পারছে, ঋণ শোধ না করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সেই সমাজটা তো মসৃণভাবে চলার কথা নয়। অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র থাকলে অধিকাংশ মানুষ ভোট দিয়ে এমন সরকার আনত, যে সরকার লুঠেরাদের প্রশ্রয় না দিয়ে জনগণের সেবাকে অধিকতর গুরুত্ব দিত। কিন্তু আমাদের দেশে যে ভোটের গণতন্ত্র ১৯৯০ সালের পরে জন্ম নিয়েছে, তার কতক নেতিবাচক দিক রয়েছে। এর আগে ১৯৭১-৭৫ কালপর্বেও ন্যূনতম উদারনৈতিক এক ধরনের গণতন্ত্র ছিল। আবার ১৯৭৫-৯০ কালপর্বে ছিল লেবাসি গণতন্ত্র। সব মিলিয়ে আমাদের ভোটের গণতন্ত্র অল্পদিনের গণতন্ত্র।

তবে ভোটের গণতন্ত্র সর্বদা আদর্শ গণতন্ত্র নয়। অনেক দেশে ভোটের গণতন্ত্রকেও Illiberal Democracy বা Authoritarian Rule বলে। অর্থাৎ এমন ‘গণতন্ত্র’ আছে যাকে ‘অনুদার গণতন্ত্র’ বা ‘কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন’ বলা হয়। এখানে যে কর্তা গণতন্ত্রের চর্চা করছেন বা যে দল গণতন্ত্রের চর্চা করছে, সেই দল বা তিনি নিজে তার দলের ভেতর থেকেই কর্তৃত্বপরায়ণ একজন কর্তা হিসেবে নানা কারণে উঠে আসেন। তার কর্তৃত্বের অধীনে অনেকেই আছেন। বাংলাদেশে সম্প্রতি এ ধরনের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অসুবিধা হয়ে গেছে এই কারণে যে, এখানে প্রধান বিরোধী দল বা সরকারি দল উভয়ই এ দেশে কর্তৃত্বপরায়ণ দুটি দল। উভয়েই দেশে অনুদার গণতন্ত্র চালাতে ইচ্ছুক। তাই মানুষের কাছে ‘চয়েস’ হচ্ছে এই কর্তৃত্ব বা ওই কর্তৃত্ব। তাই এখানে অনুদার গণতন্ত্র স্থায়ী হয়ে গেছে। একজনের কর্তৃত্বপরায়ণ রাজত্ব যদি মানুষ অস্বীকার করে, তবে আরেকজনের কর্তৃত্বপরায়ণ রাজত্ব আসে। কে এমপি পদে মনোনীত হবে, কাকে উচ্চপদ দেওয়া হবে, সব নির্ধারিত হচ্ছে অগণতান্ত্রিকভাবে, কখনো কখনো টাকা-পয়সা, স্বজনপ্রীতি ও সচরাচর শীর্ষ কর্তৃত্ব দ্বারা। তবে এই দুই দলে কর্তৃত্বে যে দুজন আছেন, তাদের মধ্যে কে বেশি উদার এসব বিচার করে কখনো কখনো মানুষ একটি দলে আসে, আবার অসহ্য হয়ে গেলে আরেকটি দলে যায়। এভাবেই এত দিন চলে আসছে। ফলে ১৯৯০ সালের পর থেকে কর্তৃত্বপরায়ণ অনুদার গণতন্ত্র থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ কখনোই রক্ষা পায়নি।

এই ট্র্যাজেডির মধ্য থেকেই বাংলাদেশের যতটা উন্নতি হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি উন্নয়ন কিন্তু সম্ভব ছিল। এমনকি এ অবস্থায় বৈষম্যহীন উন্নয়নও সম্ভব হতে পারে যদি কর্তৃত্ব কিছুটা আলোকিত হয়। আমাদের সামনে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামের উদাহরণ আছে। একদলীয় রাজনৈতিক কঠোর কর্তৃত্ব যদি সুষম বণ্টনের দিকটা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত পরিবর্তনে আগ্রহী হয়, যদি অন্ধ দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে তার কর্তৃত্ব কিছুটা বিকেন্দ্রীভূত গণতান্ত্রিক পথে খাটিয়ে সাধারণ মানুষকে অংশগ্রহণমূলক প্রবৃদ্ধির মধ্যে নিয়ে আসতে ইচ্ছুক হয় এবং কর্তৃত্বপরায়ণ শাসকটি নিজে যদি অসৎ ও লুটেরাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে সক্ষম হয়, তাহলে কর্তৃত্বপরায়ণতা যে জনপ্রিয় ও ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারে, তা এসব দেশের উদাহরণ দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে।

চীনের শি-পিং বা সিঙ্গাপুরের লি কুয়ান বা মালয়েশিয়ার মাহাথিরের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তটি দেখুন। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমানে যে কর্তৃত্বপরায়ণ গণতন্ত্রের ধারা বিরাজমান, তা সুশাসন ও সমতাকে একেবারে বাদ দিয়ে নিছক অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা ক্ষমতায় থাকতে চাইছেন, সেটা মুশকিল। সেটাও হয়তো পারবেন যদি দেখাতে পারেন, নিজস্ব কর্তৃত্বের চেয়ে অপর বিকল্পটি মোটেও উন্নততর নয়। বরং আরও খারাপ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু এর পরও এ কথা অধিকাংশ পন্ডিত এখন মানেন, দীর্ঘ মেয়াদে কর্তৃত্বপরায়ণতা বা অনুদার গণতন্ত্রসচেতন সচ্ছল নাগরিকরা মানবে না। কারণ যেকোনো জায়গায় যখন সাধারণ জীবনমানের উন্নয়ন একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে চলে যাবে, তখন মানুষের সামনে গণতান্ত্রিক অধিকার ও Civil Rights-এর প্রশ্নগুলো আসবে। বৈষম্য কেন হচ্ছে? লুটপাট কেন হচ্ছে? স্বজনপ্রীতি কেন হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো উঠবে। এখন হয়তো এত চিন্তা করছে না বা ভাবছে এসব তো হবেই। কিন্তু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠলে তারা বলবে, আমি কেন বঞ্চিত হব?

অনুদার গণতন্ত্র নিছক স্বৈরতন্ত্রেও পরিণত হতে পারে। আমার শিক্ষক আনিসুর রহমানের উদাহরণটা আমি দিতে পারি। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন একটা মানুষকে গলা কামড়ে ধরেছে একটা নেকড়ে বাঘ, আর আরেকটা বাঘ খানিক দূরে দাঁড়িয়ে জিভ চাটছে, মানুষটা তখন কী করবে? সে নিশ্চয়ই নেকড়ে বাঘটাকে সরাতে চেষ্টা করবে কিন্তু সে জানে নেকড়েটাকে সরালে বাঘটা তাকে এসে ধরবে। তাই বাঘটার বিরুদ্ধেও তাকে একই সঙ্গে লড়তে হবে। এটা খুবই কঠিন অবস্থা কিন্তু এটাই সত্য বলে বাংলাদেশের অনেকেরই ধারণা। নির্বাচনের মাধ্যমে এ অবস্থার পরিবর্তন করা খুবই দুরূহ। বলা হয়ে থাকে, নির্বাচনে কালো টাকার ব্যাপক ব্যবহার হয়, যে কালো টাকা দিয়ে এক শ্রেণির ভোটারকে প্রভাবিত করা যায়। আগামী সব নির্বাচনেই এমন আশঙ্কা থাকছে।

যতক্ষণ পর্যন্ত না আদর্শভিত্তিক গণতান্ত্রিক শক্তির অভ্যুদয় হচ্ছে, একদম তলা থেকে মানুষের ক্ষমতায়ন হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো উপায় নেই। মূলত কর্তৃত্বপরায়ণ দলগুলো তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য সমাজে অসংখ্য এজেন্ট তৈরি করেছে। বিষয়টা এমন যে, তুমি কালো টাকা করবে বা করেছো আমি জানি, তুমি টাকা বিদেশে পাচার করবে বা করেছো তা-ও আমি জানি। কিন্তু আমার নির্বাচনী খরচটা যদি দাও, আমার কর্তৃত্ব যদি বহাল রাখতে সাহায্য করো তাহলে তোমাকে কিছু বলব না এবং ক্ষমতায় এলে তোমাকে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। সুতরাং কালো টাকা একটা সিস্টেমের অংশ এবং ক্ষমতারও অংশ হয়ে গেছে। ফলে একটা এলাকায় এমপি ইলেকশনে বর্তমানে নাকি ১০০ কোটি টাকাও ব্যয় হয়! আইনে তো আছে, ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। কিন্তু আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে তারা অংশগ্রহণ করছে। অর্থাৎ আইনটা আছে, যা প্রণয়ন করেছে শাসক দল। কিন্তু আইনটা যেন বাস্তবায়িত না হয় সে জন্য জুডিশিয়ারির মাধ্যমে একটা পদ্ধতিও তৈরি করে রেখেছে। তার মানে আমি মানুষকে দেখাচ্ছি যে, আমি সৎ কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি অসৎ।

অনেক সময় কখনো কখনো সিস্টেমের মধ্যে কোনো ব্যক্তি একটা ব্যতিক্রমী রোল প্লে করে। যদি দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান ব্যক্তিটি ঝুঁকি নেন। যেমন তিনি যদি স্থির করেন, ‘আমি সরকারের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও ন্যায় এবং সত্যের পক্ষে লড়াই করব। ওই যে ম্যাজিস্ট্রেট রোকনুজ্জামান খান ঝুঁকি নিয়ে সব ভেজাল ধরল। ওই রকম কোনো শক্তিশালী লোক কোথাও থাকলে ভূমিকা রাখতে পারে। তখন কোনো কোনো খাতে আংশিক ও স্থানীয় পরিবর্তনের একটি ধারা সৃষ্টি হয়। এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধারা উপধারা মিলে বিশাল একটি সম্মিলিত স্রোতধারা সৃষ্টি করতে পারলে হয়তো কোনো একদিন মৌলিক পরিবর্তন সম্ভব হতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বর্তমানে তার শিল্পের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হবে। আর শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য তার দক্ষতা বাড়াতে হবে। আর নতুন প্রযুক্তি আনতে হবে। রপ্তানি বহুমুখীকরণ করতে হবে। ১০ বছর পরের বাংলাদেশ আরেকটু উন্নত হয়ে হয়তো মধ্যম আয়ের কাছাকাছি চলে যাবে এবং গণতন্ত্রের ইস্যুটা আরেকটু গুরুত্বপূর্ণ হবে। কারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন যখন অগ্রসর হয়ে যায়, তখন রাজনৈতিক উন্নয়নটা বেশিদিন পিছিয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু এই ১০ বছরে যদি রাজনৈতিক কোনো বড় অস্থিতিশীলতা হয়, গণতন্ত্রের সঙ্গে কর্তৃত্বপরায়ণতার দ্বন্দ্বটা যদি শান্তিপূর্ণভাবে সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান না হয় এবং উল্টো নৈরাজ্য ও বিস্ফোরণ ঘটে, তবে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থাৎ যদি পিসফুল রিফরমেশন না হয়, যদি সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া না হয় অর্থাৎ সেলফ রিভিশন ও রিমিশন না হয়, তাহলে বাংলাদেশ হয়তো মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে ব্যর্থ হবে। কোনটা যে হবে তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ও কলামনিস্ট