স্বজনদের নামে রমিজের ৫ বাড়ি, শত শত একর জমি|118423|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৯:৪৫
কার সম্পদ কার নামে
স্বজনদের নামে রমিজের ৫ বাড়ি, শত শত একর জমি
এস এম নূরুজ্জামান

স্বজনদের নামে রমিজের ৫ বাড়ি, শত শত একর জমি

মিরপুরের মল্লিকা আবাসিক এলাকায় রমিজ উদ্দিনের চারতলা বাড়ি, মিরপুরের পূর্ব মনিপুরে পাঁচতলা ভবন ও রামপুরা মহানগর হাউজিংয়ে পাঁচটি দোকান (ঘড়ির কাঁটার দিকে)। ছবি: মহুবার রহমান

কোনো ভবনের মালিক বানিয়েছেন শ্যালিকাকে,  কোথাও মেয়েকে  আবার কোথাও মেয়ের জামাইয়ের নামে ভবনের নামফলক ঝুলিয়ে নিজে রয়ে গেছেন লোকচক্ষুর আড়ালে। তিনি হলেন ডিপিডিসির নির্বাহী পরিচালক রমিজ উদ্দীন। তার মালিকানাধীন একাধিক দোকানের ভাড়াটে কিংবা একাধিক বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের কেউ তার নাম জানে না।  গতকাল রবিবার রাজধানীর মিরপুর, মনিপুর ও রামপুরা মহানগর প্রজেক্ট এলাকায় রমিজ উদ্দীনের মালিকানাধীন ভবন ও দোকানপাট সরেজমিন ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

গতকাল দুপুরে  হাতিরঝিল দিয়ে রামপুরা মহানগর প্রজেক্টের ৮ নম্বর রোডে ঢুকতেই বাঁ পাশে ছোটখাটো একটি বিপণিকেন্দ্র দেখা গেছে। যেটি ২০২ নম্বর প্লটের প্রায় সাড়ে চার কাঠা জমির ওপর গড়ে উঠেছে। দোকানের পেছনে একটি টিনশেডের বাড়ি দেখা গেলেও সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। তবে রোডসংলগ্ন দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড় দেখতে পাওয়া যায়। দোকানগুলোর একটি ফাস্টফুড, একটি জেনারেল স্টোর ও একটি দোকানে চা-সিগারেট বিক্রি হচ্ছিল। প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে কথা বলতেই অপূর্ব নামে এক দোকানদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, মালিক রমিজ উদ্দীন এখানে থাকেন না। 

আক্তার নামে একজন কেয়ারটেকার এসব দোকানের ভাড়া তোলেন। আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি তো এখন তাদের চাকরি করি না। এক বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছি। তবে মালিক হিসেবে রমিজ উদ্দীনের ‘ঘনিষ্ঠ’ আত্মীয় আমেরিকা প্রবাসী ইভা ওরফে সেলিনার নাম ব্যবহার করা হলেও রমিজ উদ্দীনের গাড়িচালক এসব দোকানের ভাড়া তুলে নিয়ে যান। প্রতিটি দোকানের জন্য প্রায় ২ লাখ টাকা অগ্রিম নিয়ে মাসিক ৫ হাজার টাকা ভাড়ায় এসব দোকান চালাচ্ছেন বলে দোকানদাররা জানিয়েছেন।

মিরপুর মিল্ক ভিটা রোডের মল্লিকা আবাসিক এলাকার ২৮ নম্বর বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের কাছে রমিজ উদ্দীনের নাম বলতেই তারা কেউ চেনেন না বলে জানান।

বাড়ির মালিক কে? এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নারী ভাড়াটে দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাড়ির মালিক হান্নান। এখন স্ট্রোক করে বিছানায় পড়ে আছেন। তার চার মেয়ে বেবী, মলি, রোজী, রুবি এই ভবনের ভাড়া তোলেন। তারা তৃতীয় তলায় থাকেন। সেখানে যেতেই একজন নারী বেরিয়ে আসেন। নাম বলেন ফেরদৌসী বেগম। হান্নানের স্ত্রী পরিচয়ে তিনি বলেন, রমিজ উদ্দীন তার বোনের স্বামী। ভবনটি তার ভগ্নিপতির হলেও তিনি এখানে আর থাকেন না। রমিজ উদ্দীনের অবস্থান জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিরপুরের বাসায় গিয়ে খোঁজ করেন। মিরপুরের পূর্ব মনিপুরের ১৩০৭/ডি নম্বরের ছয় তলা  ভবনে গিয়েও বাড়ির মালিক কিংবা তার স্বজনদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ভবনের মালিক সম্পর্কে ভাড়াটেদের কেউ কথা বলতেও রাজি হননি।  বাড়ি ভাড়ার টু-লেটে যেসব মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে, তার সবই বন্ধ পাওয়া গেছে। ভবনের  কেয়ারটেকার মোহাম্মদ আলী দেশ রূপান্তরকে জানান, এই বাড়ি রমিজ উদ্দীনের হলেও তিনি এখানে থাকেন না। তার মেয়ে থাকেন। তিনি (রমিজ উদ্দীন) থাকেন উত্তরা ৫ নম্বর সেক্টরের ৮ নম্বর রোডের ১৩ নম্বর ভবনে।
 
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ঢাকা পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানির নির্বাহী পরিচালক (প্রকৌশল) রমিজ উদ্দিন সরকারের নামে উত্তরা ও পূর্ব রামপুরাতেও তার বহুতল ভবন রয়েছে। তিনি  দুর্নীতির মাধ্যমে শতকোটি টাকার সম্পদ অর্জন করেছেন। এ ছাড়া রমিজ দম্পতির বিরুদ্ধে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ রয়েছে। ঢাকার পাঁচটি বাড়ির বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর ও কুমিল্লায় রয়েছে কয়েক শ একর জমি এবং বিদেশে অর্থপাচারও করেছেন।

ওই ‘বিপুল’ পরিমাণ অবৈধ সম্পত্তির সন্ধান পেয়ে তাদের সম্পদের বিবরণী দাখিলের জন্য নোটিশ পাঠিয়েছে দুদক। রবিবার  দুদকের উপপরিচালক ঋত্বিক সাহা স্বাক্ষরিত নোটিশে আগামী সাত দিনের মধ্যে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করতে বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) প্রণব কুমার ভট্টাচার্য্য।

দুদকে অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, এই কর্মকর্তা ও তার স্ত্রী সালমা পারভীনের নামে ঢাকাসহ দেশে বিদেশে অবৈধ সম্পদ রয়েছে। শেয়ারমার্কেটে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ ছাড়াও নামে-বেনামে আরও বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে তাদের।

এ ছাড়া গাজীপুরে জায়গা বিক্রি করে হুন্ডির মাধ্যমে সেই টাকা দেশের বাইরে পাঠিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে আনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে দুদক সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসে। আর এই অভিযোগের অনুসন্ধানী কর্মকর্তা হিসেবে আছেন সংস্থার উপসহকারী পরিচালক শহিদুর রহমান।

অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, পুঁজিবাজারে এই দম্পতির নামে বড় অঙ্কের বিনিয়োগ রয়েছে। সেটি খতিয়ে দেখছে দুদক। এ ছাড়া বেনামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা আছে বলে জানিয়েছেন ওই কর্মকর্তা।