বর্তমান সময় এবং সাংস্কৃতিক ক্ষয়|118453|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৫:২০
বর্তমান সময় এবং সাংস্কৃতিক ক্ষয়

বর্তমান সময় এবং সাংস্কৃতিক ক্ষয়

নতুন যোগাযোগ প্রযুক্তির সময় এখন। ফেইসবুক-ইউটিউব-মোবাইল ফোন নিয়ে আমাদের দেশেও মেতে আছে অজস্র মানুষ, বিশেষ করে কমবয়সীরা। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা, কথোপকথন চলছে প্রতিনিয়ত। দেওয়া হচ্ছে নতুন ছবি, প্রকাশ করা হচ্ছে নিজেদের আনন্দ, দুঃখ, আশা, ক্ষোভের কথা। যোগাযোগ সহজতর এখন আগের চেয়ে। বাড়িতে বসে কি-বোর্ড চাপলেই পাওয়া যায় বহু তথ্য। খুব দ্রুত ডাউনলোড করে নেওয়া যায় দুষ্প্রাপ্য বই আর চলচ্চিত্র, খুঁজে পাওয়া যায় অনেক পুরনো নাটক। সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি বিভিন্ন দিকে জ্ঞানচর্চার সুযোগ যখন প্রযুক্তি এতই সহজ করে দিয়েছে, তখন মানুষের মধ্যে চিন্তার গভীরতা বাড়বে, সংস্কৃতি হয়ে উঠবে আরও চিন্তাশীল এমন প্রত্যাশা করাই তো যৌক্তিক। কিন্তু যখন আমরা নির্মোহভাবে আমাদের সমাজের অতীত আর বর্তমানের সাংস্কৃতিক স্তর এবং মানের তুলনা করি, আমরা কি বলতে পারি সাহিত্য, নাটক, চলচ্চিত্র প্রভৃতি দিকে অতীতে যে গভীরতা আর চিন্তাঋদ্ধতা আমরা দেখতে পেতাম, এখনো আমরা তাই দেখতে পাচ্ছি? আমাদের কি মনে হয় অতীতের চেয়ে বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক সৃষ্টির রূপ পৃথক হলেও মানের দিক থেকে বর্তমান সময়ের সাংস্কৃতিক উপাদান মোটেও দুর্বল নয়? নাকি আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে বর্তমান সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি সাংস্কৃতিক ক্ষয় আর অধঃপতন? আমরা কি দেখতে পাচ্ছি যে মানুষকে বিনোদন দেওয়ার মাধ্যমে মুনাফা অর্জনের আর প্রচারের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার ঝোঁকই এখন মুখ্য গণমাধ্যম আর সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রিত এই সময়ে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর অনুধাবনের জন্য আমাদের তাকাতে হবে অতীত আর বর্তমানের সাংস্কৃতিক সৃষ্টিকর্মের দিকে। আমাদের দেশে ১৯৫০-এর দশকে আমরা পেয়েছি শামসুর রাহমান, সিকান্দার আবু জাফর, শহীদ কাদরী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমানের মতো কবি। ১৯৬০-এর দশকে বাংলাদেশের কবিতা সমৃদ্ধ হয়েছে নির্মলেন্দু গুণ, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ, আবুল হাসান, হুমায়ুন কবির এবং আরও অনেকের শক্তিশালী রচনার মাধ্যমে। ১৯৭০-এর দশকে এসেছেন রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, দাউদ হায়দার, খান মোহাম্মদ ফারাবী, আবিদ আজাদ, শিহাব সরকার, মুহাম্মদ সামাদ প্রমুখ যাদের কবিতা ঔজ্জ্বল্য টিকিয়ে রেখেছে বাংলাদেশের সাহিত্যের। আমাদের দেশের দীপ্তিমান ঔপন্যাসিকদের তালিকা দীর্ঘ। আমরা উল্লেখ করব বিভিন্ন নামÑ শহীদুল্লাহ্ কায়সার, শওকত ওসমান, আবু ইসহাক, আলাউদ্দিন আল আজাদ, সত্যেন সেন, আনোয়ার পাশা, আবু জাফর শামসুদ্দীন, রশীদ করীম, সৈয়দ শামসুল হক, রশীদ হায়দার, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আহমদ ছফা, সেলিনা হোসেন, হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ। অতীতে বিভিন্ন দশকেই শক্তিমান কবি এবং ঔপন্যাসিকদের কাজ আমাদের সাহিত্যের উজ্জ্বলতা বাড়িয়ে তুলেছে। এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়, আমাদের দেশে ১৯৯০-এর দশক থেকে কি নিয়মিতভাবে বিভিন্ন নতুন লেখক এবং কবির সাহিত্যকর্ম আমরা পেয়েছি যা অতীতের গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক কাজগুলোর মতোই শক্তিশালী?
 
পশ্চিম বাংলার কবি এবং ঔপন্যাসিক নবারুণ ভট্টাচার্য তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন একটি গান যা তুলে ধরেছে রাজবংশী সমাজের বর্তমান রূপÑ “আগের ভাওয়াইয়া গান নাই, ভাওয়াইয়া গানের কথা নাই, উদাস করা সুর নাই, ভাওয়াইয়া চটকার দরদ নাই যে, আজি ভাওয়াইয়া গান হামার হারেয়া গেইছে রে।” জ্যোতির্ময় রায়ের ‘রাজবংশী বৃত্তান্ত’ বই থেকেও নবারুণ উল্লেখ করেছেন রাজবংশীদের বর্তমান সমাজ সম্পর্কে কয়েকটি লাইনÑ “মাটি, বাঁশ, কাঠের খেলনাপাতি উধাও। দখল নিয়েছে স্বয়ংক্রিয় ছুটে যাওয়া গাড়ি এবং ভিডিও গেমের অ্যানিমেশন বিশ্ব। কার্টুন আর রিয়েলিটি শো-র ছড়াছড়ি। লক্ষ্মীছানারা আর ঠাক্মার কোলে বসে ঝুলি খোঁজে না। কানে শোনা, চোখে দেখার সাথে অন্যরকম বিনোদনের হাতছানি।” আমরা দেখতে পাচ্ছি বিনোদন খুব বেশি মাত্রায় প্রাধান্য দেওয়াই হয়ে উঠেছে বর্তমান ভোগবাদী সমাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। যে সাংস্কৃতিক পণ্যে বিনোদনের মাধ্যমে দর্শককে তৃপ্তি দিয়ে ব্যবসায়িক লাভ অর্জন করার লক্ষ্যই প্রধান হয় সেখানে স্বাভাবিকভাবেই সৃজনশীলতা আর গভীর বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ থাকে না। কারণ দর্শককে বিনোদন দিতে হলে অনুসরণ করতে হয় নির্দিষ্ট ফর্মুলা। দর্শককে মজিয়ে রাখতে হয় চাকচিক্য, জৌলুশ আর চটকের মধ্যে। এই ধরনের সাংস্কৃতিক পণ্য তাই হয়ে ওঠে অত্যন্ত অগভীর।

প্রযুক্তির প্রসার যত বাড়ছে, তত বিস্তৃত হচ্ছে গণমাধ্যম। আর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রাধান্য পাচ্ছে দর্শককে হালকা বিনোদন দিয়ে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা। জনপ্রিয়-সংস্কৃতির প্রভাবও তাই এখন বেশি। সেই গানটির কথায় যেভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যেÑ এখন আর ভাওয়াইয়া গানের জন্য দরদ নেই, একইভাবে গণসংস্কৃতির প্রভাবে আমাদের সমাজেও চিন্তাশীল, সমাজসচেতন এবং নান্দনিকভাবে সমৃদ্ধ কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্পের প্রতি আগ্রহী মন আর হয়তো তৈরি হচ্ছে না। তৈরি হচ্ছে না এই ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদান কদর করার মানসিকতা।

সংস্কৃতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের রূপও কি আমাদের দেশে আগের মতোই আছে? জহির রায়হান, আলমগীর কবির, শেখ নিয়ামত আলী, মসিহউদ্দিন শাকের, সৈয়দ সালাহ্উদ্দীন জাকী, তানভীর মোকাম্মেল, তারেক মাসুদ, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান, আমজাদ হোসেন যে ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন, তেমন বক্তব্যধর্মী চলচ্চিত্রও নিয়মিতভাবে আমরা পাই না অনেক দিন। কখনো একটি বা দুটি চলচ্চিত্র হয়ে ওঠে বক্তব্য এবং নির্মাণশৈলীর দিক থেকে গভীর এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু সেই ছবিগুলোও যে গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে যথেষ্ট প্রচার পায় তা নয়। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন প্রমুখ বিশ্ববিখ্যাত চলচ্চিত্রকারের বিভিন্ন চলচ্চিত্র সম্পর্কে, জহির রায়হান, আলমগীর কবিরের বিভিন্ন ছবি নিয়ে আমাদের গণমাধ্যমে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আলোচনা এবং প্রচার কম। মানুষের চিন্তা এখন অনেক বেশি প্রভাবিত হয় গণমাধ্যম দ্বারা তাই গণমাধ্যম যে ধরনের সাংস্কৃতিক উপাদানে গুরুত্ব দেবে তাই আকর্ষণ তৈরি করবে মানুষের জন্য। তাই প্রশ্ন তৈরি হয়, আমাদের নতুন প্রজন্মের বেশির ভাগ মানুষ কি অতীতের গুরুত্বপূর্ণ এবং সুনির্মিত বাংলা চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে জানে? আমাদের দেশের পুরনো চলচ্চিত্রগুলোর নামও ছিল সুন্দরÑ কাঁচের দেয়াল, কখনো আসেনি, জীবন থেকে নেয়া, ধীরে বহে মেঘনা, সূর্যকন্যা, সীমানা পেরিয়ে, রূপালী সৈকতে, সূর্য দীঘল বাড়ী, মেঘের অনেক রং, চিত্রা নদীর পাড়ে, মাটির ময়না। এমন নামই কিন্তু নির্দেশ করে ছবিগুলোর বিষয়বস্তু এবং বক্তব্য অগভীর নয়। ইদানীং আমাদের চলচ্চিত্রের এমন সুষমাময় নামও দেখি না।
 
উল্লেখ করা যেতে পারে অতীতের টেলিভিশন নাটকের কথাও। ১৯৭০, ১৯৮০-এর দশকে এবং ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত কাহিনী, সমাজসচেতন বক্তব্য, অভিনয় শৈলী, উঁচু মানের কৌতুক প্রভৃতি দিক থেকেই আমাদের টেলিভিশন নাটকের যে উৎকর্ষ ছিল বর্তমান সময়ের টেলিভিশন নাটকে কি তেমন গভীরতা এবং নান্দনিকতা আমরা দেখতে পাচ্ছি? বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় অতীতের নাটকের কাহিনী, সংলাপ, আর শিল্পীদের অভিনয়ের কথা। গোলাম মুস্তাফা, মোহাম্মদ জাকারিয়া, আবদুল্লাহ্ আল মামুন, সৈয়দ আহসান আলী সিডনি, মামুনুর রশীদ, আবুল হায়াত, আবুল খায়ের, বুলবুল আহমেদ, হুমায়ুন ফরীদি, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আল মনসুর, আসাদুজ্জামান নূর, আফজাল হোসেন, তারিক আনাম, খালেদ খান, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, জহিরুদ্দিন পিয়ার, নাজমা আনোয়ার, ফেরদৌসী মজুমদার, সুবর্ণা মুস্তাফা, লাকী ইনাম, শম্পা রেজা, ডলি জহুর এবং আরও অনেক অভিনয়শিল্পী তাদের শক্তিশালী অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের প্রশংসা অর্জন করেছেন। গণসংস্কৃতি গুরুত্ব পাওয়ার পরিবেশে অভিনয় যে একটি শিল্প এই কথাটিই মনে রাখা হয় না। কারণ পরিশ্রম গণসংস্কৃতিতে প্রয়োজনীয় নয়। দরকার দর্শককে হালকা বিনোদন দিয়ে মুনাফা অর্জন। তাই যখন নাটক হয়ে ওঠে অগভীর এবং গতানুগতিক, সেই নাটকে অভিনয়ের জন্য পরিশ্রমের মাধ্যমে অভিনয়-দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনও হয় না। 

বর্তমান ভোগবাদী সমাজে ফেইসবুক, ইউটিউব, অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করছে অজস্র মানুষ। কিন্তু একইসাথে যখন দেখা যায় চিন্তাসমৃদ্ধ সাহিত্য, নাটক আর চলচ্চিত্রের কদর কমছে, সাংস্কৃতিক নির্মাণের মধ্যে চিন্তার গভীরতা, সৃজনশীলতা আর পরিশ্রম না খুঁজে মানুষ খুশি থাকছে বিনোদনমূলক উপাদানে তখন বর্তমান সময়ের সংস্কৃতির স্তর আর মান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে হয়। সমাজে যে রুচির দীনতা, সচেতনতার অভাব, স্বার্থপরতা, অন্ধ আর অসহিষ্ণু চিন্তা, ভালো-মন্দের পার্থক্য না বোঝা, যুক্তি দিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে না পারা প্রভৃতি বিভিন্ন সমস্যা মানুষের ওপর চিন্তাশীল সংস্কৃতির প্রভাব না থাকলেই তৈরি হয়। হালকা, চটকদার সংস্কৃতি আফিমের মতোই। মানুষকে তা স্থবির এবং নিষ্ক্রিয় করে তোলে। কারণ এমন সংস্কৃতি সচেতনতা, চিন্তার গভীরতা এবং যুক্তির প্রখরতা তৈরি করে না। রুশ নাট্যকার এবং লেখক আন্তন চেখভ একবার আরেকজন বিখ্যাত রুশ লেখক এবং নাট্যকার নিকোলাই গোগোলের নাম উল্লেখ করে বলেছিলেন- “You must not lower Gogol to the people, but raise the people to the level of Gogol.”

চেখভের এই মূল্যবান এবং যৌক্তিক কথা অনুযায়ী বলতে হয় রবীন্দ্রনাথ বা শেক্সপিয়ার বা লালন ফকির বা সত্যজিৎ রায়ের কাজ সাধারণ মানুষের কাছে যদি জটিল মনে হয় তাহলে তাদের কাজ অত্যন্ত মামুলি আর সহজভাবে সাধারণ মানুষের কাছে উপস্থাপন না করে বরং সাধারণ মানুষের চিন্তার মান এবং গভীরতা বাড়িয়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে যেন তারা বিভিন্ন চিন্তাশীল কাজের অর্থ অনুধাবন করতে পারে। তখনি উঁচু মানের সংস্কৃতির প্রতি মানুষের আকাক্সক্ষা এবং ভালোবাসা তৈরি হবে। আর চিন্তাঋদ্ধ সংস্কৃতির উপস্থিতিতে মানুষের মধ্যেও সৃষ্টি হবে সুরুচি, সচেতনতা আর যুক্তিবোধ। কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটলেই তৃপ্তি অনুভব করা এবং অর্থনৈতিক সাফল্য নিয়েই কেবল চিন্তা করা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটছে কি না ভাবতে হবে তা নিয়েও। কারণ মানুষের মন রুচিস্নিগ্ধ এবং বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন হয় মননশীল সংস্কৃতির মাধ্যমে। বর্তমান সময়ে আমাদের সমাজে তৈরি হওয়া সাংস্কৃতিক উপাদান বহু মানুষের মন কীভাবে প্রভাবিত করছে এবং এমন উপাদান একটি সাংস্কৃতিক ক্ষয় নির্দেশ করছে কি না সে সম্পর্কে সমাজের মঙ্গল নিশ্চিত করার প্রয়োজনেই আমাদের চিন্তা করা দরকার।

লেখক : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়