সেই কানাডীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক এখন অনুতপ্ত|118624|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৯:৩৭
সেই কানাডীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক এখন অনুতপ্ত
প্রিন্ট সংস্করণ

সেই কানাডীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক এখন অনুতপ্ত

৩০ ডিসেম্বরের ভোটকে কানাডার মতো ‘খুবই সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক’ হিসেবে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরেছিলেন যে বিদেশি পর্যবেক্ষক, কানাডার নাগরিক সেই তানিয়া ফস্টার এখন নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নেওয়ায় অনুশোচনাগ্রস্ত বলে জানিয়েছেন।

পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতাসীন জোটকে অভাবনীয় বিজয় এনে দেওয়া এই নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন বলে গতকাল মঙ্গলবার বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।    

তানিয়া সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন নামের সেই সংস্থার স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে এসেছিলেন।

ওই সংস্থার প্রেসিডেন্ট সাবেক বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুস সালামও বলেছেন, ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরানো এবং ভয়ভীতি দেখানোর কথা ভোটার ও প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের মুখ থেকে শোনার পর এখন তিনি বিশ্বাস করেন যে, নতুন করে নির্বাচন হওয়া উচিত।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি এখন সবকিছু জানতে পেরেছি। তাই এ কথা বলতে পারি যে, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি।’

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন কানাডা, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা থেকে যাদের নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে বাংলাদেশে এনেছিল, তারা ৩০ ডিসেম্বর ভোটের দিন ও পরদিন গণমাধ্যমের সামনে নির্বাচন নিয়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন।

নির্বাচনের ফল ঘোষিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার সরকারি বাসভবনে সাংবাদিক ও বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের উদ্দেশে বলেন, ‘মানুষ খুব উৎসাহ নিয়ে ভোট দিয়েছে, বিশেষ করে নারী ও তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা। আপনারা আমার দেশে আসায় গণতন্ত্র এদেশে কীভাবে কাজ করছে সেটা দেখানোরও ভালো সুযোগ পেয়েছি আমরা।’

উপস্থিত পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনে জয়লাভ করায় শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দেন। সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনসহ ওআইসির পর্যবেক্ষকরাও প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। সেদিন পর্যবেক্ষকদের মধ্যে প্রথম বক্তব্যে কানাডার তানিয়া ফস্টার বলেছিলেন, ‘খুব সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন হয়েছে। কানাডার মতোই ভোটের পরিবেশ এখানে।’

সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনায় আসা পর্যবেক্ষকদের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রীপুত্র ও তার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ও একাধিক টুইট করেছিলেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের আঞ্চলিক এই জোট সার্কের নাম ও একই আদলের লোগো ব্যবহার করলেও তার সঙ্গে সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের কোনো সম্পর্ক নেই।

সংস্থাটির মহাসচিব আবেদ আলী রয়টার্সকে বলেন, সার্কের অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়েছে। আশা করছেন, শিগগিরই সার্ক তাদের অনুমোদন দেবে। তবে কাঠমান্ডুতে সার্কের একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেন, এই সংগঠনের ব্যাপারে তারা কিছুই জানেন না। এই সংগঠন সার্কস্বীকৃত নয়। তাদের সঙ্গে সার্কের কোনো সম্পর্ক নেই।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাকেন্দ্রিক সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা কমিটিতে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও এর জোটসঙ্গী জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য। বিএনপি সরকারের আমলের একজন সাবেক মন্ত্রীর নামও রয়েছে এই তালিকায়।

আইন অনুযায়ী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন এমন কোনো সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে অনুমোদন দিতে পারে না নির্বাচন কমিশন। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, এই পর্যবেক্ষক সংস্থার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার কথা তারা জানতেন না।

আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের যুক্ত রাখার ব্যাপারে সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আবেদ আলী বলেন, ‘তারা শুধু আমাদের মানবিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন।’ তার দাবি, দেশের কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

৩১ ডিসেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন বলেছিল, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের চেয়ে অনেকাংশে ভালো, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের ৫ হাজার ৭৬৫ সদস্য নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। বিদেশি পর্যবেক্ষকরা তিনটি দলে ভাগ হয়ে রাজধানীর ২৪টি কেন্দ্র পরিদর্শন করেন।

সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আবদুস সালাম এখন বলছেন, তার সংস্থার ব্যবস্থাপনায় যে পর্যবেক্ষকরা এসেছিলেন তারা অল্প কয়েকটি ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করেছিলেন। তাই নির্বাচন কতটুকু সুষ্ঠু হয়েছে সে ব্যাপারে তারা সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন করার মতো অবস্থায় নেই।

তিনি জানান, কয়েকজন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তাকে জানিয়েছেন তাদেরকে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভরতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি সত্য বলতে চাই। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য আমি এ কথা বলছি না।’ তবে প্রেসিডেন্টের এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আবেদ আলী রয়টার্সকে বলেন, কেউ কিছু বললেই তার ওপর ভিত্তি করে আপনি কিছু লিখতে পারেন না।

বাংলাদেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে কানাডার সাসকারার প্রাদেশিক সরকারের নীতি বিশ্লেষক তানিয়া ফস্টার রয়টার্সকে বলেন, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন নামের একটি সংস্থা বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক খুঁজছে এমন তথ্য তিনি প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন।

তিনি বলেন, ‘এটা মজার একটা অভিজ্ঞতা হবে ভেবে আমি নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্যতা জানতে চাই। সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন ও নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করার পর তারা আমাকে পর্যবেক্ষক হওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।’

তানিয়ার সঙ্গে তার কন্যা ক্লোয়ি ফস্টারও পর্যবেক্ষক প্যানেলে যুক্ত হন, যারা বিদেশে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে ছিলেন পুরোপুরি অনভিজ্ঞ। এ বিষয়ে ক্লোয়ি ফস্টারের কোনো বক্তব্য নিতে পারেনি রয়টার্স। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে অনভিজ্ঞতার কথা তানিয়া ফস্টার নিজে বললেও, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিবের দাবি, ওই নারীদের (তানিয়া ও ক্লোয়ি) কানাডায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা ছিল। সেই সঙ্গে কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থার পক্ষে সব কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে যাওয়াও অসম্ভব।

তানিয়ার দাবি, সার্ক হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের সঙ্গে সার্কের সম্পর্ক না থাকা কিংবা ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। সবকিছুর পর এখন তার বক্তব্য, ‘ব্যাপারটি নিয়ে আমি সন্তুষ্ট নই। আমার মনে হচ্ছে, আমি খুব অর্বাচীনের মতো কাজ করে ফেলেছি।’

রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘শুধু ঢাকায় ৯টি নির্বাচন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছিলাম আমরা। আমরা জানতামই না যে আমাদের প্রতিবেদন এতটা গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। অপেক্ষাকৃত গোলোযোগপূর্ণ এলাকাগুলো পরিদর্শনে যাইনি আমরা। নির্বাচন কমিশনসহ পোলিং এজেন্ট, প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের আগের কর্মকাণ্ডও আমরা যাচাই করে দেখিনি।’

তবে ফাউন্ডেশনের সব বিদেশি পর্যবেক্ষক অনুতপ্ত নন। কলকাতার আইনজীবী গৌতম ঘোষ, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির হাকিমুল্লাহ মুসলিম ও নাজির মিয়া বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু বলে প্রথমে তারা যে বিবৃতি দিয়েছিলেন, এখনো তাতেই অটল আছেন।

নাজির বলেন, ‘আমরা সহিংসতার ঘটনা শুনেছি। কিন্তু কখনো নিজেদের চোখে দেখিনি। অন্যত্র কী ঘটেছে, তা নিয়ে আমরা মন্তব্য করতে পারব না।’ গৌতম বলেন, তিনি এমন সুন্দর নির্বাচন কখনো দেখেননি।

গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে। গত সপ্তাহে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৫০ আসনে জরিপ চালিয়ে ৪৭টিতেই অনিয়ম দেখতে পেয়েছে তারা। বিশেষ করে জাল ভোট, জোর করে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরা, ভোটকেন্দ্রে বিরোধীদলীয় এজেন্ট ও ভোটারদের ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি জানায়, তাদের জরিপ করা সব এলাকাগুলোতে নির্বাচনী প্রচারে কেবল ক্ষমতাসীন দলটিই সক্রিয় ছিল। কখনো কখনো স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি সম্পদের সহায়তা নেওয়া হয়েছে। টিআইবির প্রতিবেদন নাকচ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সংস্থাটিকে বিরোধী দল বিএনপির ‘পুতুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আওয়ামী লীগ ও দলটির জোট সদস্যরা ৯৫ শতাংশ আসন নিশ্চিত করার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ভোট জালিয়াতি ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের তদন্তের দাবি জানিয়েছে আসছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সময়সীমার মধ্যে ভিসা ইস্যু না করায় ভোট পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন তহবিলের বেশকিছু পর্যবেক্ষক। ভিসা বিলম্বের অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ সরকার বলেছে, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলেন, নির্বাচনে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনে পর্যবেক্ষকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। গত এক দশকের মধ্যে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল পুরোপুরি অংশগ্রহণমূলক। এর আগে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট।