দুদকের চোখ অর্ধশত ডাক্তারে|118834|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৮:৪৬
দুদকের চোখ অর্ধশত ডাক্তারে
প্রতীক ইজাজ

দুদকের চোখ অর্ধশত ডাক্তারে

দেশের স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত সরকারের শেষের দিকে এ খাতে তদন্ত শুরু করে সংস্থার গোয়েন্দা ইউনিট। তদন্তে অর্ধশত শীর্ষ দুর্নীতিবাজ ও স্বেচ্ছাচারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম উঠে এসেছে। এদের মধ্যে অন্তত ৩৮ জনের অবৈধ সম্পদের সন্ধান মিলেছে। এসব ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকতে শুরু করেছে দুদক। অনেককে না ডেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে সুপারিশ করছে। ১০ কর্মকর্তার কাছে বিগত সময়ে কর্মকর্তা হিসেবে কেনাকাটা বাবদ ব্যয় ও বরাদ্দ অর্থের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে। এদের বিরুদ্ধেও কেনাকাটা ও ব্যয় বরাদ্দে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তথ্যে অসঙ্গতি দেখলে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের কর্মকর্তারা।

দুদকের সন্দেহের তালিকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, পরিচালক ও লাইন ডিরেক্টর (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন), পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ এবং লাইন ডিরেক্টর, হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট), পরিচালক (অর্থ) কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি), শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তা ও সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তাদের নাম রয়েছে।

সর্বশেষ গতকাল ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ‘দুর্নীতিবাজ ও স্বেচ্ছাচারী’ ২৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি তালিকা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে দুদক। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ওই তালিকা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্যত্র বদলি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও তার অধীনস্থ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী শক্ত সিন্ডিকেট তৈরি করে বছরের পর বছর ধরে আর্থিক দুর্নীতিসহ নানা অনিয়ম করে আসছেন। তারা যখন যে প্রতিষ্ঠানে ছিলেন সেখানেই চিকিৎসা সরঞ্জামাদি কেনাকাটা ও বরাদ্দ বণ্টনে অনিয়ম করেছেন। এভাবে তারা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন। প্রভাবশালী হওয়ায় কখনই এদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।

 

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমরা তৃণমূল পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে চাই। স্বাস্থ্য খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে চাই। এখানে কোনো আপস নেই।

সার্বিক বিষয়ে দুদকের মহাপরিচালক মুনীর চৌধুরী বলেন, স্বাস্থ্য সেক্টরে অবক্ষয় অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবসেবার চেতনা না থাকলে চিকিৎসাসেবা পরিত্যাগ করা উচিত। তবে দায়িত্বে অবহেলার বিষয়ে দুদক কঠোর অবস্থান নেবে। সারা দেশের স্বাস্থ্য সেক্টর দুদকের নজরদারিতে থাকবে।

ছয় কর্মকর্তার কাছে হিসাব চেয়েছে দুদক: গত ৯ জানুয়ারি দুদক ছয়টি পৃথক চিঠি দিয়েছে মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, তেজগাঁওয়ের সিএমএসডি ও শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ছয় কর্মকর্তাকে। চিঠিতে দুদক এসব বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছে বলে জানিয়েছে। এর মধ্যে একজন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

তিনি যখন অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সেন্টারের (এমআইএস) পরিচালক ছিলেন, সে সময় নিজ দপ্তর ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে আইটি অবকাঠামো উন্নয়নে যেসব কেনাকাটা করেছেন, সে সংক্রান্ত তথ্যাদি চাওয়া হয়েছে। পরিচালক থাকাকালীন এসব কেনাকাটায় তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

পরিচালক এবং লাইন ডিরেক্টর (চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. আবদুর রশিদের কাছে তার দপ্তর থেকে গত অর্থবছরে বরাদ্দ ও মঞ্জুরিকৃত ১৩২ কোটি ৯৬ লাখ ১৫৫০ টাকার হিসাবে চাওয়া হয়েছে। এ অর্থ তিনি কক্সবাজার, ফরিদপুর, গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন, রাজশাহী ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে কেনাকাটায় বরাদ্দ দিয়েছেন।

অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ এবং লাইন ডিরেক্টর হসপিটাল সার্ভিসেস ম্যানেজমেন্ট) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেনকে গত অর্থবছরে বরাদ্দ ১৬৭ কোটি ৩৬ লাখ ২৩ হাজার ৬২১ টাকার হিসাব চেয়েছে দুদক।

অধিদপ্তরের অর্থ বিভাগের পরিচালকের কাছে হিসাবে চাওয়া হয়েছে গত অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ৪০ কোটি ৬৩ লাখ ৬৫ হাজার ৮৮৫ টাকার। এই অর্থ তিনি তার দপ্তর থেকে গাইবান্ধা, সিলেট ও বগুড়া সিভিল সার্জন অফিস, বগুড়ার তত্ত্বাবধায়ক-২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল ও টাঙ্গাইলের ২৫০ শয্যার হাসপাতালে বরাদ্দ দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের পরিচালকের কাছেও গত অর্থবছরে পরিশোধকৃত ২৩৩ কোটি ১৫ লাখ ৭৩ হাজার ৯০৮ টাকার বিলের হিসাবে চাওয়া হয়েছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে গত অর্থবছরে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে যত বিল পরিশোধ করা হয়েছে সেসবের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছে দুদক।

এদের মধ্যে ডা. কাজী জাহাঙ্গীর হোসেন ও অধ্যাপক ডা. আবদুর রশীদকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গত ১৪ জানুয়ারি ডেকেছিল দুদক। অসুস্থতার কথা বলে তারা উপস্থিত হননি। এর বাইরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক (বাজেট) ডা. আনিছুর রহমানকে ১৪ জানুয়ারি জিজ্ঞাসাবাদ করেছে দুদক।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাহাঙ্গীর হোসেন কেনাকাটার বাইরে আউট সোর্সিং থেকে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও গাড়িচালকদের শূন্য পদে এখন আর নিয়োগ হচ্ছে না। দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে পাঁচ শতাধিক কর্মচারী ও গাড়িচালক কাজ করছেন। এখান থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া তিনি বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিককে নিবন্ধন দেওয়া ও নিবন্ধন নবায়নেও অনিয়ম করেছেন।

কর্মকর্তারা আরও বলেন, ডা. আবদুর রশীদ নব-সৃষ্ট সরকারি মেডিকেল কলেজগুলোতে ভৌত কাঠামো তৈরি ও শিক্ষা উপকরণ কেনাকাটা থেকে অনিয়ম করছেন। এ ছাড়া তিনি মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং সেন্টারগুলোর অনুমোদন দেওয়ার সময় অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

এই তিনজনের ব্যাপারে দুদকের অভিযোগে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সিন্ডিকেট করে সীমাহীন দুর্নীতির মাধ্যমে শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন তারা। এ ছাড়া বিদেশে অর্থ পাচার ও জ্ঞাত আয়-বহির্ভূত অর্জনের অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

এদের মধ্যে আনিছুর রহমান নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। ডা. আবদুর রশিদ হাজিরা দিয়ে সব বলবেন বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন। তিনিও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদকে ফোনে কথা বলার জন্য পাওয়া যায়নি।

কোটিপতি কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য: সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (মেডিকেল এডুকেশন) আবজাল হোসেন ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের স্টেনোগ্রাফার তার স্ত্রী রুবিনা খানমের অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধান করতে গিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ইপিআই বিভাগ ও কমিউনিটি ক্লিনিক বিভাগের চারজন কর্মচারীর নাম পাওয়া গেছে। এরাও বিপুল অবৈধ সম্পদের মালিক। এ ছাড়া বিভিন্ন কর্মচারী সমিতির নেতাদের নামও দুর্নীতিবাজদের তালিকায় রয়েছে।

১১ হাসপাতালের অনিয়মের তথ্য দেবে দুদক: ঢাকাসহ দেশের ১১ হাসপাতালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পরিচালিত অভিযানে প্রাপ্ত অনিয়ম সম্পর্কে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হবে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ থাকবে দুদকের। গত সোমবার দুদক এসব হাসপাতালে অভিযান চালায়।

দুদকের কাছে থেকে এসব তথ্য জেনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন পরিচালক গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুদক থেকে ফোন করা হয়েছিল। তারা আমাকে এ ধরনের কথাবার্তাই বলেছে।

গতকাল যাদের চিঠি দিয়েছে দুদক: গতকাল ২৩ কর্মকর্তাকে দুদক থেকে চিঠি দেওয়া হয়। তারা হলেন ঢাকা বিভাগের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের (স্বাস্থ্য) কার্যালয়ের সহকারী প্রধান (পরিসংখ্যানবিদ) মীর রায়হান আলী, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ফারুক হাসান, প্রধান সহকারী আশরাফুল ইসলাম, প্রধান সহকারী সাজেদুল করিম, উচ্চমান সহকারী তৈয়বুর রহমান, উচ্চমান সহকারী সাইফুল ইসলাম, চট্টগ্রাম স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী ফয়জুর রহমান, প্রধান সহকারী মাহফুজুল হক, কম্পিউটার অপারেটর আজমল খান, ময়মনসিংহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান, প্রধান সহকারী-কাম হিসাবরক্ষক আবদুল কুদ্দুস, সিলেটের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী নুরুল হক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা গোস আহমেদ, উচ্চমান সহকারী আমান আহমেদ, অফিস সহকারী-কাম কম্পিউটার অপারেটর নেছার আহমেদ চৌধুরী, খুলনা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের ব্যক্তিগত সহকারী ফরিদ হোসেন, অফিস সহকারী মো. মাসুম, প্রধান সহকারী আনোয়ার হোসেন এবং বরিশাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের প্রধান সহকারী মো. রাহাত খান, উচ্চমান সহকারী জুয়েল, রংপুর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী আজিজুর রহমান, স্টেনোগ্রাফার সাইফুল ইসলাম এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম।

দুদক চিঠিতে বলেছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনস্থ বিভিন্ন কার্যালয়ে কতিপয় দুর্নীতিবাজ স্বেচ্ছাচারী ও ক্ষমতা অপব্যবহারকারী কর্মকর্তা-কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করার সুবাদে দুর্নীতির শক্তিশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এসব কর্মকর্তা-কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। দুদকে তাদের বিরুদ্ধে এরমধ্যে অনেক অভিযোগ জমা হয়েছে, যা আমাদের গোয়েন্দা ইউনিটের অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে।