অতিধনী, ধনী ও হাভাতের দেশ|118860|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৫:৪৭
অতিধনী, ধনী ও হাভাতের দেশ

অতিধনী, ধনী ও হাভাতের দেশ

বাংলাদেশ সত্যিই এক বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশ। ছোট  আয়তনের কিন্তু বিশাল জনগোষ্ঠীর এই দেশের মতো এত বৈচিত্র্যময় বৈপরীত্য আর কোথায় পাবেন! এখানে সুরম্য অট্টালিকার ভদ্রলোকেরা জানালা খুলে একটু নিচে তাকালে অনায়াসেই দেখতে পারেন জরাজীর্ণ বস্তির নিরন্ন মুখ। এমন অঢেল বিত্তশালী ও বিত্তহীন নিঃস্ব মানুষের সহাবস্থান আর কোথায় পাবেন!

অতিধনী উৎপাদনে বিশ্বে আমরাই প্রথম। ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির হারে আমরা তৃতীয়। জিডিপি বৃদ্ধি নিয়েও আমরা ব্যাপক আমোদিত। আবার এই আমরাই হতদরিদ্রের দিক থেকেও বিশ্বের সেরা পাঁচের একটি! উচ্চশিক্ষিত বেকারের রেকর্ডেও আমরা দ্বিতীয়। আমাদের কিছু মানুষ টাকার পাহাড়ে ঘুমায়। দেশে বসেও বিদেশি পানি পান করে। আবার আমাদেরই ব্যাপক জনগোষ্ঠী অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে, দেশি মোটা চালের ভাত পর্যন্ত জোটাতে পারে না। সে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে আত্মহননের পথ পর্যন্ত বেছে নেন কেউ কেউ। সাম্প্রতিক কালে সংবাদ মাধ্যমে আলোচনায় আসা অতিধনী, ধনী ও হতদরিদ্রদের দিকে একটু দৃষ্টি দেওয়া যাক।

অতিধনীর দেশ

ওয়েলথ-এক্স নামের যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ৩ কোটি ইউএস ডলার বা ২৫২ কোটি বা তার চেয়ে বেশি টাকার সম্পদ থাকলে তাদের আলট্রা ওয়েলদি বা অতি ধনী হিসেবে গণ্য করে জানাচ্ছে, এ ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ সবার থেকে এগিয়ে। বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে ২০১২ সাল থেকে গত পাঁচ বছরে দেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে গড়ে ১৭ শতাংশ হারে। এ হার যুক্তরাষ্ট্র, চায়না, জাপান, ভারতসহ ৭৫টি বড় অর্থনীতির দেশের চেয়েও বেশি। একই প্রতিষ্ঠান ১০ লাখ থেকে ৩ কোটি ইউএস ডলার বা সাড়ে ৮ কোটি থেকে ২৫০ কোটি টাকার সম্পদের মালিককে বসিয়েছে ধনীর কাতারে। ধনী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধির হারের দিক থেকেও বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ৩ কোটি ডলার বা আড়াই শ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিকদের সংখ্যা বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি হারে বাড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রতিবেদনও বলছে, এ দেশে ধনীদের জন্য সুবাতাস বইছে। ধনী আরও ধনী হচ্ছে। আর দরিদ্র হচ্ছে হতদরিদ্র। বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০১৬ এর প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে দেশে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ পরিবারের আয় প্রায় ৫৭ শতাংশ বেড়েছে। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৮৮ হাজার ৯৪১ টাকায়। একই সময় সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ পরিবারের আয় কমেছে ৫৯ শতাংশ। তাদের মাসিক আয় দাঁড়িয়েছে ৭৩৩ টাকায়, যা ২০১০ সালে ১ হাজার ৭৯১ টাকা ছিল।

হতদরিদ্র হাভাতের দেশ

এতক্ষণে নিশ্চয়ই আমাদের মধ্যে একটা সুখ সুখ অনুভব হতে শুরু করেছে। যাক, এখন আর আমাদের কেউ গরিব দেশের লোক বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে পারবে না। উন্নয়নের একতরফা গল্পে মনের মধ্যে উঁকি দেওয়া সন্দেহ নিয়েও হয়তো প্রশ্ন উঠছে। এবার তবে আরেকটা ভিন্ন চিত্র দেখে নেওয়া যাক। এই মেকি আলোর ঝলকানির নিচের অন্ধকারের ব্যাপ্তি কতটা ভয়াবহ চলুন সেটা বোঝার চেষ্টা করি। এই দ্রুত বর্ধনশীল অতিধনী, ধনী ও জিডিপি বৃদ্ধির দেশটি হতদরিদ্র মানুষের দিক থেকেও কিন্তু পিছিয়ে নেই। অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেশি এমন দেশগুলোর মধ্যেও শীর্ষ পাঁচে থাকার গৌরব অর্জন করেছে বাংলাদেশ! বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশে ২ কোটি ৪১ লাখ হতদরিদ্র মানুষ আছেন যারা দিনে ৬১ টাকা ৬০ পয়সার বেশি রোজগার করতে পারেন না। বিশ্বব্যাংক ‘পোভার্টি অ্যান্ড শেয়ার প্রসপারিটি বা দারিদ্র্য ও সমৃদ্ধির অংশীদার-২০১৮’ শীর্ষক প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি হতদরিদ্র মানুষ আছে, এমন ১০টি দেশের তালিকা তৈরি করেছে। ক্রয়ক্ষমতার সমতা অনুসারে (পিপিপি) যাদের দৈনিক আয় ১ ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাদের হতদরিদ্র হিসেবে ধরা হয়। এটা আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যরেখা হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বব্যাংক ২০১৬ সালের মূল্যমান ধরে পিপিপি ডলার হিসাবে করেছে। বাংলাদেশে প্রতি পিপিপি ডলারের মান ধরা হয়েছে সাড়ে ৩২ টাকা। সেই হিসাবে বাংলাদেশের ২ কোটি ৪১ লাখ লোক দৈনিক ৬১ টাকা ৬০ পয়সাও আয় করতে পারে না। বিশ্বব্যাংক বলছে, নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে হলে দৈনিক কমপক্ষে ৩ দশমিক ২ পিপিপি ডলার আয় করতে হবে। নিজেদের নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে ধরলে দেশে অতিগরিব মানুষের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৮ কোটি ৬২ লাখ। আর দারিদ্র্যের হার হবে ৫২ দশমিক ৯ শতাংশ। (প্রথম আলো, ২০ জানুয়ারি ২০১৯)।

শিক্ষিত বেকারের দেশ

উচ্চশিক্ষিত বেকারের দিক দিয়েও বাংলাদেশ দ্বিতীয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে। এর পরেই আমরা। ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেকার নিয়ে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয়। সংস্থাটির মতে, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব ২০১০ সালের তুলনায় দ্বিগুণ হয়ে ২০১৭ সালে ১২ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে (যুগান্তর, ২০ জানুয়ারি ২০১৯)। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)’র গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সাল থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রবৃদ্ধি হতো ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। অথচ বিগত পাঁচ বছরে সাড়ে ছয় শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ছে মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রেও এই প্রবৃদ্ধি সহায়ক নয়। গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দারিদ্র্য বিমোচন কমেছে (এনটিভি, ১৩ জানুয়ারি ২০১৯)।

উন্নয়নটা কার?

এবার হিসাবটা মিলিয়ে নিন। গত দশ বছরের যে উন্নয়নের ঢাক পেটানো হচ্ছে সে উন্নয়নটা কার পকেটে গেছে সেটা বুঝতে এখনো অসুবিধা হচ্ছে? এবার বুঝে দেখেন, উন্নয়নের তসবিহ গোনা ‘গরিবের সরকার’ কার উন্নয়নে ব্যস্ত। অনেকেই মনে করেন, মেগা প্রজেক্ট মানে মেগা দুর্নীতি। আর সে মেগা দুর্নীতির সিংহভাগ টাকাও প্রধানত মেগা লোকদের পকেটে যায়। তার কিছু অংশ যে সেমিমেগাদের পকেট ভারী করে না এমনও নয়। তাই দেশের সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ লোকের হাতে ধনের দেবী হুমড়ি খেয়ে পড়ে। অতিধনী ও ধনীদের তালিকা প্রকাশ না পেলেও চোখের সামনে ফুলে-ফেঁপে ওঠাদের চেহারা তো সবাই দেখছেন। অনেকেই মনে করেন, এদের বড় অংশের উত্থান ঘটেছে সরকারি উন্নয়ন কাজ, ঠিকাদারিসহ বিভিন্ন সেক্টরের দুর্নীতি, ঘুষ ও অবৈধ আয়ের মাধ্যমে। বিশেষ করে ব্রিজ-রাস্তাঘাটসহ অবকাঠামো উন্নয়ন, কুইকরেন্টাল, ব্যাংক ও পুঁজিবাজার ছিল লুটেরাদের জন্য লোভনীয় খাত।  সরকারের ছত্রছায়ায় লুটপাটতন্ত্রই তাদের অতিধনী বা ধনী হওয়ার মূলমন্ত্র।

অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা

একদিকে আমরা জিডিপি বাড়ার গল্প শুনছি, অতিধনী ও ধনী বৃদ্ধিতে রেকর্ড করছি। উন্নয়নের গল্প শুনতে শুনতে কানের ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়ার অবস্থা। অন্যদিকে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে হতদরিদ্র ও বেকারের হার বৃদ্ধির উদ্বেগজনক হিসাব। অভাবের তাড়নায়, এমনকি ভাতের অভাবে আত্মহত্যার ঘটনাও নেহাত কম নয়। শুধু ২০১৮  সালে দেশের প্রথম সারির পত্রিকাগুলোর কয়েকটি সংবাদ শিরোনাম দেখলেই যে কেউ আঁতকে উঠবেন।  অভাবের তাড়নায় ঢাবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা (ইত্তেফাক, ১৬ অক্টোবর ২০১৮)। এবার অভাবের তাড়নায় আত্মহত্যা! (নয়াদিগন্ত, ২৫ অক্টোবর ২০১৮)। অভাবের তাড়নায় ৫ সন্তানের মায়ের আত্মহত্যা! (যুগান্তর, ০৩ আগস্ট ২০১৮)। অভাবের তাড়নায় ছেলে-মেয়েকে হত্যার পর বাবার আত্মহত্যা! (পরিবর্তন.কম, ২২ জুন ২০১৮)। ঈশ্বরগঞ্জে কিশোরীর লাশ উদ্ধার, গেল বছর প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় অংশ নেওয়া তাসলিমার পড়ালেখা বন্ধ হয়ে যায় অভাবের তাড়নায় (সমকাল, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। অভাবের তাড়নায় এইচএসসি পরীক্ষার্থীর আত্মহত্যা (নিউজ টোয়েন্টিফোর, ৬ মে ২০১৮)। চিকিৎসার টাকা নেই, যন্ত্রণা সইতে না পেরে কিশোরীর আত্মহত্যা (আমাদের সময়, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮)। অভাবের তাড়নায় কিশোরীর আত্মহত্যা (যুগান্তর, ২২ জানুয়ারি ২০১৮)। ভাতের অভাবে কিশোরীর আত্মহত্যা (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৬ অক্টোবর ২০১৭)।  আখাউড়ায় ২ ব্যক্তির ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, পারিবারিক কলহ আর অভাবের তাড়নায় তারা আত্মহত্যা করেছেন বলে জানা গেছে (ভোরের কাগজ, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬)।

এই সংবাদ শিরোনামগুলো বলে দেয়, আমাদের জিডিপি, অতিধনী-ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি বা উন্নয়নের গল্পে দেশের মুষ্ঠিমেয় লোক তুষ্ট হলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ লোকের এতে কিছু আসে যায় না। একদিকে কিছু মানুষ বাড়াবাড়ি রকমের টাকার মালিক হচ্ছেন, অন্য দিকে ব্যাপক জনগোষ্ঠী থেকে যাচ্ছেন বেকার, হচ্ছেন হতদরিদ্র। এদেশে লুটপাটতন্ত্রের অংশীদার ৫শতাংশ লোকের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে বাকি পঁচানব্বই শতাংশ মানুষ।

লেখক : চিকিৎসক ও কলামনিস্ট