বাংলাদেশে নদী ও জলাভূমি রক্ষার দায়বদ্ধতা|118861|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৪ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৫:৫৫
বাংলাদেশে নদী ও জলাভূমি রক্ষার দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশে নদী ও জলাভূমি রক্ষার দায়বদ্ধতা

বাংলাদেশ পানিতে ভাসা দেশ। সাগর থেকে জাগা দেশ। অবিরাম বৃষ্টিপাতের দেশ। উজান থেকে বয়ে আসা পলিমাটির দেশ। উত্তরের সুউচ্চ হিমালয় পর্বতমালা থেকে দক্ষিণের সাগরপারের বনভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত পৃথিবীর উর্বরতম দেশ। সুজলা সুফলা এই বাংলা তাই পৃথিবীর ঘনবসতির দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এর সমতল পলিমাটির বুক চিরে বয়ে চলছে অজস্র নদ-নদী। এরপর খাল-বিল আছে শত শত। এটাই ছিল বাংলার রূপ। সহস্র সহস্র বছর ধরে বাঙালির জীবন-সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য ও অর্থনীতিতে নদীই প্রধান ভূমিকা পালন করে গেছে। বাঙালির জীবন কেটেছে নদীর জলে স্নান করে-সাঁতার কেটে, বাঙালির গ্রাম-গঞ্জগুলো গড়ে উঠেছে নদীর পারে পারে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের রসদ বয়ে নিয়ে এসেছে নদী, নদী তার যাতায়াতের পথ। বাঙালির ব্যবসা-বাণিজ্য চলেছে নদীকে নির্ভর করে। তাই বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নদী। সে নদী একূল ভেঙে ওকূল গড়া হোক, কিংবা হোক হাঁটুজল নদী বা মরা নদী।

পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদ বলতে পানিই সবচেয়ে আদি ও অফুরান। কারণ প্রতি বছর প্রাকৃতিক চক্রে পানি সাগর থেকে বাষ্পীভূত হয়ে বৃষ্টির আকারে ভূমিতে পতিত হয় এবং নদীতে প্রবাহিত হয়ে আবার সাগরে যায়। ক্রমবর্ধমান মানুষের সংখ্যা পৃথিবীর জীব ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। মানুষ অন্যান্য পশু-পাখির আহার আত্মসাৎ করে নিজেরা বাড়ছে। মানুষ এর পরও যা করছে, তা হলো নিজেদের ভোগলিপ্সার জন্য কৃত্রিমভাবে খাদ্য ও ভোগসামগ্রী উৎপাদন করতে গিয়ে সুপেয় পানির বার্ষিক জোগানে হস্তক্ষেপ করছে। মানুষ ড্যাম বা বাঁধ দেওয়া জলাধার নির্মাণ করে নদীর পানি আটকাচ্ছে, ব্যারাজ নির্মাণ করে সেচ প্রকল্পে ও শহরে নিয়ে যাচ্ছে, নদীর পানি তুলে নিয়ে শিল্পে ব্যবহার করে তরল বর্জ্য ফিরিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে দিকে দিকে নদীগুলো শুকিয়ে ও দূষিত হয়ে সুপেয় পানির অভাব সৃষ্টি হচ্ছে। কিন্তু মানুষের সভ্য জীবনযাপন ও তথাকথিত উন্নয়নের জন্য পানির প্রয়োজন।     

সুপেয় পানি মানুষের মৌলিক অধিকার, বেঁচে থাকার জন্য জন্মগত অধিকার। আমাদের নদীগুলো হাজার হাজার বছর ধরে প্রবাহিত হচ্ছে। এই প্রবাহের ওপর আমাদের জনবসতি, কৃষি, অর্থনীতি এবং যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। তাই নদীতে পানির প্রবাহ থাকাটা আমাদের ঐতিহাসিক অধিকার। কিন্তু এই অধিকার হরণ করা হয়েছে। প্রথমত, উজানে অবস্থিত ভারত আন্তর্জাতিক নদীগুলোর ওপর ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি সরিয়ে নিয়ে তাদের সেচ প্রকল্পে এবং নৌপথ সচল রাখার কাজে ব্যবহার করছে। দ্বিতীয়ত, খরার সময় অভ্যন্তরীণ নদীগুলোর প্রবাহের ওপর মাটির বাঁধ দিয়ে পানি তুলে নিয়ে সেচকাজে লাগানো হচ্ছে। তৃতীয়ত, নদীর হাঁটুজল প্রবাহের উৎস বিল ও জলাশয়গুলোকে অতি নিষ্কাশন করে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। চতুর্থত, সারা দেশে অগভীর নলকূপ বসিয়ে সেচের জন্য পানি অতি উত্তোলন করে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামিয়ে ফেলা হয়েছে। পঞ্চমত, নদীগুলোর পারের খাসজমি দখল করে ভরাট করে বাড়িঘর এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ষষ্ঠত, নদী, খাল ও জলাভূমিতে শিল্পবর্জ্য ও শহুরে কঠিন বর্জ্য ফেলে ভরাট করা ও চরমভাবে দূষিত করা হয়েছে। 

বাংলাদেশে নদী ব্যবস্থাপনা বা সংরক্ষণ বিষয়ে কারুর কোনো মাথাব্যথা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। ভূমি মন্ত্রণালয় যেহেতু জমিজমার রেকর্ড রাখে ও খাসজমি বিলিবণ্টনের দায়িত্বপ্রাপ্ত, সেহেতু এই মন্ত্রণালয়ের প্রতিভূ হিসেবে ডেপুটি কমিশনাররা বিনা দ্বিধায় নদী-নালা ও জলাভূমি লিজ দিয়ে যাচ্ছে। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষও তাদের জাহাজ চলাচলের জন্য নদীর ওপর দাবিদার। অথচ বাংলাদেশ সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী নদী ব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড, যা পানি উন্নয়ন বোর্ড আইন-২০০০-এর ৬ ধারায় বিবৃত করা হয়েছে। কিন্তু এই আইন অনুযায়ী কোনো বিধিমালা তৈরি না হওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডকে ধরা যায় না, পানি উন্নয়ন বোর্ড কোনো দায়িত্বও গ্রহণ করে না। ফলে নদী ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আইন অনুযায়ী দ্রুত বিধিমালা তৈরির মাধ্যমে আইনের প্রয়োগ, নদীকে অবৈধ দখলমুক্ত করা, নদী দখলকারীদের শাস্তি ও নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ঠিক রাখার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীভাঙন প্রতিরোধ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য কাজ করে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে নদী দখল রোধ এবং বালু উত্তোলন নিয়ন্ত্রণে জন্যও দায়বদ্ধ হতে হবে। নদীতে অবাধে পয়ঃ ও শিল্পবর্জ্য ফেলা হচ্ছে। এ কারণে প্রতিটি শহর ও বন্দরের আশপাশের নদী চরমভাবে দূষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী ‘পরিবেশ অধিদপ্তর’ গঠন করা হয়েছে, কিন্তু পর্যাপ্ত লোকবল ও ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে এই অধিদপ্তর কোনোই কাজ করতে পারছে না। তাই নদীর দূষণরোধে সংশ্লিষ্ট সব কর্র্তৃপক্ষকে মিউনিসিপ্যালিটির কাছে দায়বদ্ধ করা, নদী ও প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে নদী-সংক্রান্ত বিষয়াবলি অন্তর্ভুক্ত করা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে বিশেষ শিক্ষাক্রম চালু করা, নদীতে মাছধরার বিধিনিষেধগুলো প্রতিপালন করা, ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের পরিবেশ সচেতনতা সৃষ্টি ও তাদের স্থাপনাগুলোর বর্জ্য দূষণমুক্ত করতে বাধ্য করা ইত্যাদি পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ জনগণের নিজস্ব উদ্যোগ হিসেবে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি, স্থানীয় প্রশাসন ও কর্র্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণে চাপ সৃষ্টি করা, দূষণ যাতে বৃদ্ধি না পায় তার চেষ্টা করা, নদীর স্বাভাবিক গতিতে বাধা না দেওয়া, বছরের নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে মাছ না ধরা ইত্যাদি কাজ চলতে পারে। এ ছাড়া দেশের রাজনৈতিক দলগুলো যাতে তাদের মেনিফেস্টোতে এসব বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়, তার জন্য দাবি তোলা প্রয়োজন। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে গৃহীত ‘রামসার কনভেনশন ১৯৭১’ এবং ‘রিও কনভেনশন ১৯৯২’ স্বাক্ষর করায় ভূমি ও জলজ পরিবেশ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই কনভেনশন দুটির প্রথমটি জলজ পাখির আবাস সংরক্ষণ-সংক্রান্ত, যা নদী ও জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষার লক্ষ্যে অতি প্রয়োজনীয়। দ্বিতীয়টি ভূমি ও জলের সব প্রজাতির উদ্ভিদ ও জীবের বৈচিত্র্য সংরক্ষণ-সংক্রান্ত, যাও একই লক্ষ্যে জরুরি। বাংলাদেশে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাঙ্গুয়ার হাওর ও সুন্দরবন এলাকা ‘রামসার সাইট’ হিসেবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। হাকালুকি হাওর এবং সুন্দরবনকে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ ঘোষণা করায় ওই দুই এলাকার নদী ও জলাভূমিগুলো সংরক্ষণের বেলায় সরকারি দায়বদ্ধতা প্রকাশ পায়। আমাদের দেশে আরও অনেক জলাভূমি ‘রামসার সাইট’ হিসেবে এবং ‘পরিবেশগত স্পর্শকাতর এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা উচিত।

বাংলাদেশের নদীগুলোকে রক্ষা করতে হলে কেবল দেশের বাইরে থেকে আসা নদীগুলোর প্রবাহ নিশ্চিত করাই নয়, দেশের ভেতরের অনেক নদীর উৎস জলাভূমিগুলোকেও রক্ষা করতে হবে। মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের পৌর এলাকাসহ দেশের সব পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য প্রণীত ২০০০ সালের ৩৬ নম্বর আইনটির ৫ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তনে বাধা-নিষেধ : এই আইনের বিধান অনুযায়ী ব্যতীত খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহ্নিত জায়গার শ্রেণি পরিবর্তন করা যাইবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনোভাবে ব্যবহার করা যাইবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া, ইজারা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা যাইবে না।’ গ্রামাঞ্চলের জন্য এই আইন প্রযোজ্য নয়। তা ছাড়া পৌরসভাগুলোয় এই আইন প্রয়োগ হচ্ছে না।

নদীর অবৈধ দখল, পানি ও পরিবেশ দূষণ, শিল্প-কারখানা কর্র্তৃক সৃষ্ট নদীদূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধকল্পে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার, নদীর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নৌপরিবহনযোগ্য করার লক্ষ্যে ২০১৩ সালের ২৯ নম্বর আইন জারি হয়। এই আইনকে ‘জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন’ বলা হয়। তবে ধারা ১২ অনুযায়ী এর কার্যাবলি সরকারের কাছে নানা বিষয়ে সুপারিশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ২০১৩ সালেই পানিসম্পদের সমন্বিত উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা, আহরণ, বিতরণ, ব্যবহার, সুরক্ষা ও সংরক্ষণ সম্পর্কিত ১৪ নম্বর আইনের (পানি আইন) ১৩ নম্বর ধারায় জলাধার ভরাট অপসারণ, ২০ নম্বর ধারায় জলস্রোতের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিতকরণ ও ২২ নম্বর ধারায় জলাধার সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া আছে। তবে আইনটি প্রয়োগের বেলায় জনসেবকদের আগ্রহ কম পরিলক্ষিত হয়।

বাংলাদেশে নদীর ওপর অবৈধ হস্তক্ষেপ বন্ধ করার বিষয়ে অনেক আইন আছে। তবে আইনের প্রয়োগের বেলায় জনপ্রতিনিধিদের রয়েছে অনীহা এবং আইনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বলতা ও ফাঁকফোকরগুলো জনসেবকদের দায়িত্ব পালনে বাধাও হয়ে রয়েছে। ১৯৯৫ সালের বাংলাদেশ পরিবেশ আইনের (২০১০ পর্যন্ত সংশোধিত) ১৫ক ধারায় বর্জ্যদূষণের ক্ষতিপূরণের মামলা পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকই করতে পারবেন। এই আইনের ১৭ নম্বর ধারায় বলা আছে, ‘মহাপরিচালক হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া কোনো আদালত এই আইনের অধীন কোনো মামলা বিচারের জন্য গ্রহণ করিবেন না।’ এভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরকে অপরিসীম ক্ষমতা দিয়ে একে দুর্নীতির আখড়া করা হয়েছে। নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করতে নদীরক্ষা-সংক্রান্ত সব ক্ষমতা পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বিকেন্দ্রীকরণ করা অবিলম্বে প্রয়োজন। 

লেখক : প্রকৌশলী, চেয়ারম্যান, জল পরিবেশ ইনস্টিটিউট