আইন লঙ্ঘনকারীদের প্রতি নমনীয় সরকার|119045|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ১০:২৫
আইন লঙ্ঘনকারীদের প্রতি নমনীয় সরকার
রশিদ আল রুহানী

আইন লঙ্ঘনকারীদের প্রতি নমনীয় সরকার

আইন অমান্য করা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে ‘কঠোর’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে দীর্ঘদিন ধরে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আসছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সময়মতো নিজস্ব ক্যাম্পাসে না গিয়ে বছরের পর বছর ধরে আইন অমান্যকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হয়নি। আল্টিমেটাম দিয়েও পরে আবার সময় বাড়িয়ে নমনীয় আচরণ করা হয়। ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা অর্থ আত্মসাৎ করছেন- এ অভিযোগেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি মন্ত্রণালয়।

আইন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় সার্বক্ষণিক উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক এবং অপরিহার্য। অথচ ২১টিতে উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ নেই ৪৯টিতে। শুধু তাই নয়, নিয়মিত সিন্ডিকেট সভার আয়োজনও করে না বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষ। অথচ এসব ঘটনায় বড়জোর চিঠি পাঠিয়ে আইন ভঙ্গ না করার তাগিদ দিয়েই থেমে আছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে গড়িমসি শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) থেকে জানা গেছে, বর্তমানে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৫২টির স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা এখনো আসেনি।  তবে ২০১০ সালে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়নের পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে আইন লঙ্ঘন করেছে ৫১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অন্তত পাঁচবার সময় দিয়েছে সরকার। যদিও এরই মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান স্থায়ী ক্যাম্পাসে গিয়েছে। আর আইন লঙ্ঘন করে এখনো অস্থায়ী ক্যাম্পাস আঁকড়ে আছে ৩১টি বিশ্ববিদ্যালয়। আর তাদের আইনি হুমকিতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে সরকার।

স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে সরকারের কাছ থেকে অন্তত পাঁচবার সময় পেয়েছে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও নর্দান ইউনিভার্সিটি, ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দি পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভসহ বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়। তবে আইন লঙ্ঘনকারী এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উপপরিচালক জেসমিন পারভীন জানান, এ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন কোনো প্রোগ্রাম অনুমোদন বন্ধ রেখে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

সিন্ডিকেট সভার আয়োজন করে না অধিকাংশই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ১৭ ধারা ও ১৮ ধারায় কমিশন কর্র্তৃক প্রণীত ‘সিন্ডিকেট পরিচালনা নীতিমালা’ অনুযায়ী সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করার কথা থাকলেও অধিকাংশই তা মানে না বলে জানিয়েছে ইউজিসি। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এ কমিটি গঠন করলেও তা অকার্যকর করে রেখেছে। এসবই আইন লঙ্ঘন বলে মনে করে ইউজিসি।

আইনে বলা হয়েছে, প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সিন্ডিকেট গঠন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সিন্ডিকেটের সভাপতি এবং উপ-উপাচার্য, ট্রেজারার, উপাচার্য মনোনীত একাডেমি কাউন্সিলের ডিন বা বিভাগীয় প্রধান হবেন সদস্য। এছাড়া একজন শিক্ষাবিদ বা শিক্ষানুরাগী, বোর্ড অব ট্রাস্টিজ মনোনীত তিনজন সদস্য, ইউজিসির মনোনীত একজন প্রতিনিধি, রেজিস্ট্রারও সিন্ডিকেটের সদস্য হবেন। এই সিন্ডিকেট সদস্যরা পরবর্তী দুই বছর মেয়াদে দায়িত্বে বহাল থাকবেন।

সিন্ডিকেট গঠন ও নিয়মিত সভা না করার কারণ অর্থ আত্মসাৎ ও অবৈধ কর্মকাণ্ডের প্রতিফলন বলে মনে করেন ইউজিসির সাবেক একজন চেয়ারম্যান। কিন্তু সিন্ডিকেটের সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাগিদেই সীমাবদ্ধ রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি।

এ বিষয়ে আবারও আগামী ২৯ জানুয়ারি সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটপ্রধান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের নিয়ে ইউজিসি একটি সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই সভায় নীতিমালা অনুযায়ী নিয়মিত সরকার ও কমিশন কর্র্তৃক মনোনীত সদস্যদের যথানিয়মে আমন্ত্রণপূর্বক সিন্ডিকেট সভা আহ্বান করতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্র্তৃপক্ষকে অনুরোধ করবে ইউজিসি।

উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষহীন বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য সার্বক্ষণিক উপাচার্য এবং কোষাধ্যক্ষ থাকা বাধ্যতামূলক ও অপরিহার্য। অথচ বর্তমানে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা ৯১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টিতেই উপাচার্য নেই। কোষাধ্যক্ষ নেই ৪৯টিতে। আর উপ-উপাচার্য ছাড়াই চলছে ৭০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।

বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী, উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ- এ তিন পদের ক্ষেত্রেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ প্রস্তাবিত তিনটি নামের মধ্যে আচার্য ও রাষ্ট্রপতি একজনকে নিয়োগ দেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি বলছে, বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এই নিয়ম না মেনে নিজেরাই একজন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্যকে নিয়োগ দিয়ে মাসের পর মাস শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আবার তাদের মধ্যে অনেকের বিরুদ্ধেই শিক্ষক নিয়োগ, ছাঁটাই, শিক্ষার মান, আর্থিক ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তবে এমন অনিয়মের ক্ষেত্রেও আইন অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয় না শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা ধরেই নেয়, কেউই তাদের কিছু করতে পারবে না।

নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেয় না অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ইউজিসি বলছে, বর্তমানে আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলযোগ্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৮৩টি। এদের মধ্যে ২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত মাত্র ১৯টি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাব মন্ত্রণালয় ও কমিশনে জমা দিয়েছে। এর আগে ২০১৭ সালে ২৩টি, ২০১৬ সালে ২৫টি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের আর্থিক নিরীক্ষা প্রতিবেদন কমিশনে জমা দিয়েছিল। তবে প্রতিবেদন জমা দিলেও অনেকেই নিয়ম অনুযায়ী ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্ট’ (পিইউএফআর) অনুসরণ করেনি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ হিসাবরক্ষণ ও নিরীক্ষা বিষয়ে ৪৫ ধারার (১) ও (২) উপধারায় বলা আছে, ‘প্রত্যেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রত্যেক আর্থিক বছরে উহার আয় ও ব্যয়ের হিসাব কমিশন কর্র্তৃক নির্ধারিত ফরমে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করিবে। প্রত্যেক হিসাব প্রত্যেক আর্থিক বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত বহির্নিরীক্ষক প্রতিষ্ঠানসমূহের (সিএ ফার্ম) মধ্য হইতে সরকার কর্র্তৃক মনোনীত একটি ফার্ম দ্বারা নিরীক্ষা করাইতে হইবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন পরবর্তী আর্থিক বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও কমিশনে প্রেরণ করিতে হইবে।’

এরপরও প্রতিবছরই মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি থেকে সব বিশ্ববিদ্যালয়কে সময়মতো নিরীক্ষা প্রতিবেদন পাঠানোর জন্য চিঠি দিয়ে তাগিদ দেওয়া হয়। তাগিদের চিঠিতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি থাকলেও পরে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে পরের বছর আবারও তাগিদ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ গত বছর সেপ্টেম্বরে মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের উপসচিব রাহেদ হোসেন স্বাক্ষরিত চিঠিতে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে গত ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের কাছে আর্থিক বিষয়ে নিরীক্ষা প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য তাগিদ দেওয়া হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘যারা রিপোর্ট প্রদান না করবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ইউজিসি কর্র্তৃপক্ষের বক্তব্য ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় আইন অমান্য করে চলেছে। স্থায়ী ক্যাম্পাসে না গিয়ে আইন লঙ্ঘন করছে এমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কম নয়। তাদের নিয়মিত তাগাদা দিয়ে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিজেদের স্বার্থেই স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে।’ এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বসে করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, ‘অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষা প্রতিবেদন জমা দেয় না। বারবার রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য তাগিদ দিলেও কেউ দেয় কেউ দেয় না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আইনে বলা থাকলেও কিছু বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট সভার আয়োজন করে না। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো সিন্ডিকেট গঠন করাও হয়নি। এসব বিষয় আমলে নিয়ে আমরা সম্প্রতি সব প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্যদের চিঠি দিয়েছি। এছাড়াও তাদের নিয়ে ২৯ জানুয়ারি ইউজিসিতে সভা করা হবে। সেখানে এসব অনিয়মের কারণ ব্যাখ্যা চাওয়া হবে।’ পাশাপাশি নিয়মিত সিন্ডিকেট সভা আহ্বানের নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান।

এদিকে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনেকভাবেই আইনভঙ্গ করে চলেছে। কিন্তু কোন অপরাধের জন্য কী শাস্তি দেওয়া যেতে পারে তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ বলা নেই। তবে মন্ত্রণালয় চাইলে অপরাধের ধরন বিবেচনা করে নিজ ক্ষমতাবলেই শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারে; যা আবার ইউজিসির হাতে নেই।’