ভারতের ভাষিক-জাতি সমস্যা|119277|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৭:১১
ভারতের ভাষিক-জাতি সমস্যা

ভারতের ভাষিক-জাতি সমস্যা

স্বাধীন ভারতের শাসকগোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতাকে কেন্দ্রীভূত শাসনের আওতায় নিরঙ্কুশ ও নিরাপদ রাখার অভিপ্রায়ে ভারতীয় সব নাগরিকের মস্তিষ্কে-মনোজগতে উদ্দেশ্যমূলক উপায়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিল, ‘সমস্ত ভারতীয় এক জাতি’র তত্ত্ব। ভারতে জাতির সংখ্যা একটি নয়, বহু সংখ্যক। বহু জাতিসত্তার দেশ ভারতের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত প্রাদেশিক ভাষার সংখ্যা প্রায় ২২টি। প্রত্যেক জাতির ভাষা-সংস্কৃতি পৃথক তো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে কোনোটির সঙ্গে কোনোটির তেমন মিলও নেই। ভারতের নাগরিকরা ‘ভারতীয় এক জাতিতত্ত্বের’ বৃত্তে আটকে রয়েছে। এমনকি প্রগতিশীল রাজনীতিকরা পর্যন্ত সেই চতুরতার বৃত্ত অতিক্রম করতে পারেনি।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা এবং জনগণের মুক্তি বইটির ভারতীয় সংস্করণ কলকাতার বিশ্ববঙ্গীয় প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। কলকাতা বইমেলায় বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানে যোগ দিতে স্যারের সফরসঙ্গী হিসেবে আমিও গিয়েছিলাম। তখন ভারতীয় একটি মার্কসবাদী দলের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়। দলটির কেন্দ্রীয় অফিসে সেই বৈঠকের শুরুতে স্যার তাদের প্রশ্ন করেছিলেন, ‘বৃহৎ ভারতের জাতি সমস্যা সমাধানে আপনাদের ভাবনা কী?’ প্রশ্নের উত্তরে এক নেতা অনায়াসে বলেন, ‘ভারতের জাতি সমস্যাকে আমরা সমস্যা বলেই মনে করি না। সকল ভারতীয়মাত্রই এক জাতি।’ এই উত্তর শোনার পর এ নিয়ে আর প্রশ্ন তোলা নিরর্থক ভেবে অন্য প্রসঙ্গে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছিল। ভারতে জাতি সমস্যা যে রয়েছে সেটা অস্বীকার করা যাবে না। যদিও জাতিগত আন্দোলন-সংগ্রামকে ভারতের শাসকশ্রেণি ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ আখ্যা দিয়ে সুদীর্ঘকাল থেকে কঠোর হস্তে দমন করে এসেছে। কিন্তু তারা যে শতভাগ সফল হয়নি তারও অজস্র দৃষ্টান্ত রয়েছে। ভাষার প্রশ্নে অতীতের মতো বর্তমানেও বিচ্ছিন্নভাবে সহিংস ঘটনা ঘটছে। চাপিয়ে দেওয়া হিন্দি ভাষা নিয়ে যে চাপা ক্ষোভ-বিক্ষোভ নেই, সেটাও সত্য নয়।

বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়। তিনি ইন্দিরা গান্ধীর মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী ছিলেন। রাষ্ট্রপতি পদ গ্রহণের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘সব যোগ্যতা থাকার পরেও কেবল বাংলাভাষী বিধায় আমি কংগ্রেস দলের ও সরকারের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হতে পারিনি। হিন্দিভাষীদের মতো আমার হিন্দি উচ্চারণ নির্ভুল নয়, এই অযোগ্যতায়।’ কেবল এই বিবেচনায় তার কংগ্রেস দলে ও সরকারে শীর্ষ পদপ্রাপ্তি ঘটেনি। এই আক্ষেপ কি ভাষিক-জাতি সমস্যার দৃশ্যমান প্রমাণ নয়?

বাংলা গানের কিংবদন্তি শিল্পী মান্না দে। যিনি মাত্র কয়েক বছর আগে প্রয়াত হয়েছেন। বাংলা গানের খ্যাতিমানদের অনেকের মতো তিনিও সর্বভারতীয় খ্যাতি, প্রচার-প্রতিষ্ঠার অভিপ্রায়ে শুরুতেই তার কাকা-গুরু কৃষ্ণচন্দ্র দের সঙ্গে মুম্বাই পাড়ি দিয়েছিলেন। প্রাদেশিক (বাংলা ভাষার) গান পরিহার করে হিন্দি গানের জগতে প্রবেশ করেন। গেয়েছেন, সুর করেছেন অনেক হিন্দি গান। খ্যাতি পেয়েছিলেন বটে। তবে পরিণত বয়সে তাকেও আক্ষেপে বলতে হয়েছে, ‘একমাত্র বাঙালি বলেই আমার হিন্দি উচ্চারণ মোহাম্মদ রফি, মুকেশদের ন্যায় নির্ভুল হতে পারেনি।’ শেষে শ্লেষে বলেছেন, ‘হিন্দি গানের ভুবনে আই ওয়াজ অ্যান আউট সাইডার।’ হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে এক জাতির বাতাবরণে ভারতের জাতি সমস্যাকে উপেক্ষা বা এড়িয়ে যাওয়া যে অসম্ভব এ সমস্ত অজস্র ঘটনা তারই প্রমাণ বহন করে।

অখন্ড ভারতবর্ষ দ্বিখন্ডিত হয়েছিল দ্বিজাতিতত্ত্বের খড়গাঘাতে। জাতি বিভক্তির কথা প্রচার ও প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল বটে, কিন্তু সেটা মোটেও জাতিতত্ত্ব ছিল না। ছিল সম্প্রদায়গত। জাতি সমস্যাকে আড়াল করার কৌশল হিসেবে সম্প্রদায়কেই জাতির মোড়ক দেওয়া হয়েছিল। ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পার্সিসহ অনেকগুলো সম্প্রদায় ছিল এবং আছে। তবে দুই প্রধান সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মাবলম্বীদের দ্বন্দ্বেই দ্বিজাতিতত্ত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল। মুসলিম সম্প্রদায় পৃথক পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠন করেছিল এক জাতির (সম্প্রদায়ের) বাতাবরণে। অপরদিকে ভারতও এক জাতির রাষ্ট্ররূপে নিজেদের জাহির করছে ওই দ্বিজাতিতত্ত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানে। আমরা দ্বিজাতিতত্ত্বকে প্রত্যাখ্যান করেই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলাম সত্য; কিন্তু ধর্মকে রাষ্ট্র থেকে বিচ্যুত করতে পারিনি। আমাদের শাসকশ্রেণি পাকিস্তান এবং ভারতের আদলে ধর্মকে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে।

বাংলাদেশ রাষ্ট্র বাঙালি জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হলেও বাংলাদেশ ঠিক ‘জাতিরাষ্ট্র’ নয়। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির পাশাপাশি দেশজুড়ে বিভিন্ন জাতিসত্তার অস্তিত্ব রয়েছে। সেই জাতিসত্তাসমূহকে সমঅধিকার-সমমর্যাদা প্রদান করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য কর্তব্য। রাষ্ট্রীয়ভাবে সেটা করা না গেলে জাতি প্রশ্নে পাকিস্তানিদের স্বৈরতান্ত্রিকতার সঙ্গে আমাদের কোনো পার্থক্য থাকবে না। এমনকি ভারতের তথাকথিত ‘সমস্ত ভারতীয় এক জাতি’র তকমাধারী ভারতীয় শাসকশ্রেণির দৃষ্টিভঙ্গির থেকেও নিজেদের স্বতন্ত্র রূপের প্রমাণ আমরা দিতে পারব না।

বহুজাতির ভারতে বিভিন্ন জাতিসত্তার মানুষের নিজ নিজ ভাষা এবং ভাষাভিত্তিক অঞ্চলের দাবিতে অতীতে এবং বর্তমানেও আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রয়েছে। হিন্দি ভাষাকে কেন্দ্রের একমাত্র সরকারি ভাষা ঘোষণার পরক্ষণে তামিলনাড়–তে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। হিন্দির পরিবর্তে পূর্ববৎ ইংরেজি ভাষাকে যোগাযোগের সরকারি ভাষায় অধিষ্ঠিত করার দাবিতে তীব্র আন্দোলনে আত্মদহন এবং সরকারি সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে বিক্ষুব্ধ তামিলভাষীরা। বিহার ও উত্তরপ্রদেশে উর্দু ভাষাকে সরকারি হিন্দি ভাষার সমমর্যাদা দেওয়ার ঘোষণার পরক্ষণে সরকারি এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। দুঃখজনক হলেও এই আন্দোলন দ্রুতই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পরিণত হয়। হিন্দু-মুসলিম দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সহিংস দাঙ্গায় প্রচুর হতাহতের ঘটনা ঘটে। ভারতের স্বাধীনতার পূর্বে কংগ্রেস দাবি করেছিল- ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যগুলোর পুনর্গঠন। অথচ ব্রিটিশ কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্তির পর পূর্বেকার দাবি থেকে দ্রুত সরে দাঁড়ায় কংগ্রেস। ১৯৫২ সালে এর প্রতিবাদে পট্টি শ্রীরামলুর অনশনরত অবস্থায় আত্মত্যাগ করে কেন্দ্রীয় সরকারকে বাধ্য করে পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ সৃষ্টিতে। মহারাষ্ট্র প্রদেশের ক্ষেত্রে একই নীতি অনুসরণ না করায় সংযুক্ত মহারাষ্ট্রে জাতিগত সংঘর্ষ-সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ভাষাভিত্তিক প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণেÑ মারাঠি-কানাড়া, বিহার-পশ্চিম বাংলা, আসাম-নাগাল্যান্ড, পাঞ্জাব-হরিয়ানা প্রভৃতি রাজ্যে ভাষিক-জাতি সংঘাতের নৃশংস ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া প্রদেশগুলোর সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও জাতিগত সংঘাতের সৃষ্টি হয়। যেমন আসামের বাংলাভাষি, কর্ণাটকের বেলগাঁও-কারওয়ার ইত্যাদিতে মারাঠি ভাষা, বিহার ও ওড়িষ্যায় বাংলাভাষীদের ওপর জাতিগত সংঘাত আজও থেমে নেই। ভাষা নিয়ে বিরোধ-বিবাদের প্রকরণগুলো ভিন্ন ভিন্ন হলেও, পরস্পর কিন্তু অঙ্গাঙ্গিভাবেই সম্পৃক্ত।

১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টে স্বাধীনতা লাভের দিনে মারাঠি অঞ্চল ত্রিধা-বিভক্ত ছিল। বৃহদাংশ বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে, নাগপুরসহ বিদর্ভ (বর্তমান বিদর) অঞ্চল কেন্দ্রীয় প্রদেশে এবং মারাঠাওয়াড়ার বড় অংশ নিজামের হায়দ্রাবাদ রাজ্যের সীমায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। ব্রিটিশদের করদরাজ্য হায়দ্রাবাদের শাসনকর্তা নিজাম স্বাধীন ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলে কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সেনা অভিযানে হায়দ্রাবাদ দখল করে ভারতের সঙ্গে হায়দ্রাবাদকে যুক্ত করেন। হায়দ্রাবাদের ভারতভুক্তির পর হায়দ্রাবাদের মারাঠিভাষী অঞ্চল বোম্বাই প্রেসিডেন্সিতে যুক্ত হয়। কিন্তু বিদর্ভের সমস্যার সমাধান না করায় সংযুক্ত মহারাষ্ট্রের দাবিতে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শঙ্কররাও দেও-এর নেতৃত্বে সংযুক্ত মহারাষ্ট্র পরিষদ গঠিত হয়। পরিষদের দাবি এবং দার কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে কেন্দ্রীয় সরকার বল্লভভাই প্যাটেল, পট্টভি সীতারামাইয়া ও জয়রামদাস দৌলতরামের উচ্চস্তরের কমিটির সুপারিশ ছিল ‘ভাষার ভিত্তিতে বর্তমানে প্রদেশ গঠনের প্রয়োজন নেই।’ পাশাপাশি মুম্বাই শহর যেন কোনো অবস্থাতে সংযুক্ত মহারাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত না হতে পারে কেন্দ্রীয় সরকার সেই লক্ষ্যে কঠোর কৌশল গ্রহণ করে। অন্য অনেক ক্ষেত্রে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ পুনর্গঠনে নতি স্বীকার করলেও, পট্টি শ্রীরামলুর আত্মদানের ফলে অন্ধ্র তামিলনাড়– থেকে পৃথক প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণে বাধ্য হয়েছিল। অথচ মহারাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সেই নীতি কেন্দ্র গ্রহণ করেনি। মুম্বাইয়ের গুজরাটি পুঁজিপতি শ্রেণির স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকার বিদর (অতীত বিদর্ভ) ব্যতীত মারাঠি ও গুজরাটি দ্বিভাষী মহারাষ্ট্র নীতিতে অটল থেকে মুম্বাই নগরী ও উপনগরীকে মহারাষ্ট্র থেকে পৃথক করে রাখে।

ভাষার ভিত্তিতে সংযুক্ত মহারাষ্ট্রের সমস্যা নিরসনে কেন্দ্র আজও নির্লিপ্ত। মারাঠিভাষী অঞ্চল বেলগাঁও কর্ণাটক রাজ্যের সীমানাভুক্ত থাকায় মহারাষ্ট্র একীকরণ সমিতি তাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখে। নানা সহিংস আন্দোলনের পরও কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টির নিষ্পত্তি করেনি। পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জনমতের ভিত্তিতে সমস্যা সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে সমাধান করেননি। ১৯৮১ সালে কর্ণাটক ও মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠক, আলাপ-আলোচনায়ও মীমাংসা সম্ভব হয়নি। কর্ণাটক সরকার বেলগাঁও অঞ্চলের মারাঠি ভাষার ক্ষেত্র সংকোচনের নীতি গ্রহণকে কেন্দ্র করে সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বেলগাঁওসহ কর্ণাটক রাজ্যের মারাঠিভাষীদের ভাষার অধিকার হরণ ও সংকুচিত করার কারণে ভাষিক-জাতিগত সংঘাত আজও রয়ে গেছে। যে কোনো মুহূর্তে সেটা যে ব্যাপক সংঘাতের দিকে অগ্রসর হবে না, সেটাও কিন্তু জোর দিয়ে বলা যাবে না।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত