সব মাদক কারবারির জন্যই আত্মসমর্পণের সুযোগ|119850|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ জানুয়ারি, ২০১৯ ০৮:৩৭
সব মাদক কারবারির জন্যই আত্মসমর্পণের সুযোগ
রিহান আবদুল্লাহ ও আবদুল আজিজ কক্সবাজার থেকে

সব মাদক কারবারির জন্যই আত্মসমর্পণের সুযোগ

আত্মসমর্পণ নিয়ে কক্সবাজারের মাদক কারবারিদের উৎসাহ দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দেশের অন্যান্য জেলায়ও। তাই কক্সবাজারের পাশাপাশি এবার সারা দেশের মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণের আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে পুলিশ সদর দপ্তর বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে; যোগাযোগ রাখছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে। এরই মধ্যে কক্সবাজারের তালিকা প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের অনুমতি মিললে আত্মসমর্পণের সব প্রস্তুতি নেবে কক্সবাজার প্রশাসন। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি আত্মসমর্পণের দিন চূড়ান্ত হয়েছে। অবশ্য বিশেষ কোনো কারণে তারিখ পরিবর্তনও হতে পারে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন সম্প্রতি দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে। মাদক কারবারিরা যদি আত্মসমর্পণ করে তাহলে তাদের সাধুবাদ জানাব। শুধু টেকনাফ বা কক্সবাজার নয়, দেশের অন্যান্য স্থানেও যদি মাদক কারবারিরা আত্মসমর্পণ করতে চায় তাদের সহযোগিতা করা হবে। আর যদি আত্মসমর্পণ না করে বা মাদক কারবারি চালায় তাহলে তাদের কঠোরভাবে দমন করা হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর। পুলিশ সদর দপ্তরের উপমহাপরিদর্শক (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছি। কাউকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও না। মাদক কারবারিরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি পদমর্যাদার দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, বছর দুয়েক আগেও কয়েকটি জেলায় আত্মসমর্পণের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তাতে তেমন সাড়া না পাওয়ায় এবারের প্রক্রিয়াটি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত কক্সবাজারের আত্মসমর্পণের তালিকায় দেড় শতাধিক কারবারির নাম-ঠিকানা পাওয়া গেছে। এ তালিকা বাড়তে পারে। তালিকায় থাকা বেশিরভাগ কারবারি পুলিশি নিরাপত্তায় আছে। তালিকায় ইয়াবা নিয়ে আলোচিত সাবেক সাংসদ আবদুর রহমান বদির পরিবারের সংখ্যা বেড়েছে।

কক্সবাজার জেলা পুলিশ আত্মসমর্পণের যে তালিকা করেছে তার মধ্যে আছেÑ বদির তিন ভাই শফিকুল ইসলাম, আবদুল আমিন, ফয়সাল রহমান, বোন নুরজাহান, ভাগিনা সাহেদ রহমান নিপু, সাহেদ কামাল, দিদার মিয়া, পৌর কাউন্সিলর নুরুল বশর নুরশাদ, পশ্চিম লেদার নুরুল হুদা মেম্বার, নাজিরপাড়ার এনামুল হক মেম্বার, সাবরাংয়ের মোয়াজ্জেম হোসেন, ধানু মেম্বার, জামাল মেম্বার, রেজাউল করিম মেম্বার, আবদুর রহমান, জিয়াউর রহমান, ছৈয়দ আহমদ, শাহ আলম, নুরুল আলম, আলী আহমদ, হ্নীলা পশ্চিম সিকদার পাড়ার রশিদ আহমদ, মারুফ বিন খলিল বাবু, একরাম হোসেন, মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, মং মং সেন ওরফে মমচি, জুবাইর হোসেন, নজরুল ইসলাম, নুরুল কবীর, সৈয়দ হোসেন, ইউনুছ মিয়া, জাফর আহমদ, রুস্তম আলী, শফিউল্লাহ, ছৈয়দ আলম, করিম মাঝি, আবদুল কুদ্দুছ, মোহাম্মদ সিরাজ, আবদুল হামিদ, রফিক, সেলিম মিয়া, রহিমউল্লাহ, হেলাল, মোহাম্মদ আলম, নুরুল বশর, দ্বীন মোহাম্মদ, মোহাম্মদ হাসান, নুর মোহাম্মদ, বদিউর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, মধ্য জালিয়া পাড়ার মোজাম্মেল হক, ডেইল পাড়ার আবদুল আমিন, সাকের মিয়া, মোহাম্মদ শফিক, উত্তর আলী খালীর শাহ আজম, দক্ষিণ নয়াপাড়ার আলমগীর ফয়সাল, উত্তর শীলখালীর আবু ছৈয়দ, জাদিমুরার মোহাম্মদ হাসান আবদুল্লাহ, রাজারছড়ার হোসেন আলী, নয়াপাড়ার তৈয়ব, উত্তর জালিয়াপাড়ার নুরুল বশর, নাজিরপাড়ার জামাল হোসেন, মৌলভীপাড়ার মোহাম্মদ আলী, আবদুল গনি, আবদুর রহমান, মো. এশরাম, জালিয়াপাড়ার মোহাম্মদ জোবাইয়ের, জিয়াউল হক, মোজাম্মেল হক, হ্নীলার সৈয়দ হোসেন মেম্বার, নুরুল কবির, শীলবনিয়াপাড়ার নুরুল হক ভুট্টো প্রমুখ।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কক্সবাজার ও টেকনাফে আত্মসমর্পণের পর সারা দেশেই মাদক কারবারিদের আত্মসমর্পণের বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর অংশ হিসেবে এরই মধ্যে সারা দেশের ডিআইজি ও পুলিশ সুপারদের কিছু পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারে আত্মসমর্পণের তালিকা এখনো শেষ হয়নি। দেড়শর বেশি নাম এসেছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এ সংখ্যা বাড়তে পারে। আত্মসমর্পণকারীরা কী ধরনের সুবিধা পাবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তারা অন্তত ৬ মাস কারাগারে থাকবে। তারপর আদালতের মাধ্যমে জামিনের ব্যবস্থা হবে। জামিনের পর তারা পুলিশ বা র‌্যাবের নজরদারিতে থাকবে। এমনকি তাদের সম্পদও দেখাশুনা করবে প্রশাসন। আত্মসমর্পণের সময় তারা কী পরিমাণ মাদক নিয়ে আসবেÑ তা নিয়েও আলোচনা চলছে। কারণ, আইনে ২০০ গ্রামের বেশি যেকোনো মাদক পাওয়া গেলে মৃত্যুদ-ের বিধান রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত বছর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তালিকায় কক্সবাজার ও টেকনাফে ১১৫১ জন মাদক কারবারি ছিল। তার মধ্যে ৭৩ জন শীর্ষ কারবারি বা পৃষ্ঠপোষকের নাম আছে। তালিকায় সাবেক সাংসদ বদিসহ তার পরিবারের ২৬ জন সদস্য রয়েছে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের নেতাদের নাম আছে। মূলত তাদের মাধ্যমেই দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা থেকে শুরু করে সব ধরনের মাদক কেনাবেচা হচ্ছিল। তালিকার ওই পৃষ্ঠপোষকরা মিয়ানমারে ৩৭টি ইয়াবা কারখানার ডিলার হিসেবে পরিচিত। তারা নিয়মিত ইয়াবার চালান এনে দেশের আনাচে-কানাচে পাঠিয়ে দেয়। গত বছর দেশের অন্য সব জেলাও তালিকা করা হয়। তার মধ্যে সীমান্তবর্তী এলাকার তালিকা ছিল দীর্ঘ। অন্য জেলাগুলোয় মাদক কারবারির সংখ্যা ছিল গড়ে ১০ হাজার।

মাদক নিয়ে গত বছরের মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দেওয়ার পর কঠোর হয় পুলিশ ও র‌্যাব। কক্সবাজার ও টেকনাফসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের সঙ্গে ‘সংঘর্ষে’ ৪শর বেশি ‘মাদক কারবারি’ মারা যায়। সে সময় টেকনাফের আওয়ামী লীগ নেতা ও স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর একরামুল হক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ার পর ঘটনার ‘অডিও রেকর্ড’ ফাঁস হলে দেশ-বিদেশে তোলপাড় শুরু হয়। এরপর কিছুদিন সামান্য বিরতি দিয়ে আবার শুরু হয় মাদকবিরোধী অভিযান। চলতি মাসে কক্সবাজারে র‌্যাব-পুুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ১৫ ইয়াবা কারবারি মারা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কক্সবাজার ও টেকনাফে সমন্বয় করে কাজ করতে বলা হয়েছে। পুলিশ সুপারকেও কিছু দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানটি যাতে ভালোভাবে হয় সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে র‌্যাব ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।