বেকারত্ব এবং কাজের সক্ষমতা|120065|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৩০ জানুয়ারি, ২০১৯ ১৯:০৪
বেকারত্ব এবং কাজের সক্ষমতা

বেকারত্ব এবং কাজের সক্ষমতা

বেকারত্ব নিয়ে বাংলাদেশের সবাই বেশ চিন্তিত। নীতিনির্ধারণী মহল থেকে পাড়ার দোকানদার পর্যন্ত।  আর এটা খুবই স্বাভাবিকও। কারণ বেকারত্ব দ্বারা সবাই কোনো না কোনোভাবে প্রভাবিত। সবাই চিন্তিত থাকার পরেও যখন সমস্যাটি সমাধান হচ্ছে না, এর অর্থ হলো আমরা সমস্যাটির ভেতরে ঢুকছি না অথবা সমস্যাটি সমাধানের জন্য দীর্ঘমেয়াদি, দরকারি পদক্ষেপ না নিয়ে কাজ চালানো স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ নিয়ে কোনোভাবে দায়সারা গোছের সমাধানের চেষ্টা করছি।

কোনো ধরনের ত্বাত্তিক আলোচনায় না গিয়ে সাধারণভাবে বেকার বলতে আমি বুঝি, সেই মানুষটিকে, যে কাজ করতে ইচ্ছুক কিন্তু সামর্থ্য অনুসারে কাজ করে অর্থ উপার্জন করতে পারছেন না।  এখানে একটা ব্যাপার বেশ মনোযোগের দাবি রাখে। বলা হয়েছে কাজ করতে ইচ্ছুক, সক্ষমতার কথা বলে হয়নি। যে কাজ সে করতে ইচ্ছুক সেটা করার সক্ষমতা তার নাও থাকতে পারে, আবার তার যে কাজে সক্ষমতা আছে সেই কাজ করতে সে ইচ্ছুক নাও হতে পারে। আমার মতে ইচ্ছে আর সক্ষমতার এই পার্থক্যই আমাদের বেকার সমস্যার অন্যতম কারণ।

ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করা যাক। অর্থনীতিতে স্নাতক পাস করা ২৬ বছর বয়েসি এক তরুণ এবং পঞ্চম শ্রেণি পাস ২৬ বছর বয়েসি এক তরুণ দুজনেই কাজ করতে ইচ্ছুক।  পঞ্চম শ্রেণি পাস মানুষটি অর্থনীতির গবেষক হিসেবে কাজ করার যোগ্য নন এবং স্নাতক পাস করা মানুষটি পাড়ায় মুদির দোকান চালাবার কাজের জন্য অধিক যোগ্য হওয়ার কারণে সেই কাজ করতে অনিচ্ছুক। আমরা যদি পঞ্চম শ্রেণি পাস মানুষের জন্য গবেষক এবং স্নাতক পাস মানুষের জন্য মুদির দোকানের ব্যবস্থা করে দিই, প্রকৃতপক্ষে তারা দুজনেই বেকার থাকবেন। আমাদের বেকার সমস্যার কোনোই সমাধান হবে না।

তাহলে যে যেই কাজে যোগ্য এবং যেই কাজ করতে ইচ্ছুক সেই কাজের ব্যবস্থা করে দিলেই তো বেকার সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তাই না? উত্তর হলোÑ হ্যাঁ। কিন্তু ব্যাপারটা এত সরল না। কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার অর্থ হলো কর্মসংস্থানের উপায় বের করা। মানুষগুলোকে কাজে লাগাবার মতো কাজ তৈরি করা।  এটার সঙ্গে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিসহ অনেক অনেক বিষয় জড়িত। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যেটা দরকার সেটা হলো মানুষগুলোকে আমাদের দরকারের কাজের উপযোগী করে গড়ে তোলা।  এখানেই আসছে সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়টি, সেটা শিক্ষা।

বাংলাদেশের শিক্ষিতের হার গত এক দশকে অনেক বেড়েছে আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে শিক্ষিত বেকারের হার। এর পেছনের কারণ হলো আমরা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগের সঙ্গে আধুনিকায়ন করতে পারিনি। আমাদের তরুণরা মেধায় বিশ্বের কারও চেয়ে কমÑ এ কথা আমি মানতে রাজি না।  আমাদের এই মেধাবী তরুণ সমাজের বিশাল সংখক তরুণকে যে আমরা বেকার বানিয়ে রেখেছি এটার দায় আমরা কোনোভাবেই এড়াতে পারি না।

যখনই বেকার সমস্যা এবং শিক্ষার কথা আসে তখনই সাধারণত অভিযোগের তীর যায় আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে। নিঃসন্দেহে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দায় আছে। কিন্তু কোনোভাবেই দক্ষ মানব সম্পদ তৈরি করতে না পারার সব দায় বিশ্ববিদ্যালয় বা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়। এর বেশ বড় অংশের দায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং কারিগরি বিদ্যালয়গুলোর। আমাদের প্রথমেই নিজেদের সীমাবদ্ধতা এবং সমস্যা মেনে নিতে হবে। মেনে নিলেই, সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান সমস্যা হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বাজারবান্ধব না।

‘বাজারবান্ধব না’ কথার অর্থ হলো, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় আমরা নতুন জ্ঞান তৈরির উপযোগী শিক্ষা দিই না। আমরা অর্জিত জ্ঞানের চর্চা করি মাত্র। এবং সেই চর্চাও অনেকটা কাজ চালানোর মতো করে। বিশেষভাবে জ্ঞানী হয়ে ওঠার মতো না। নতুন জ্ঞান তৈরির ব্যাপারে আমাদের বেশিরভাগ মানুষেরই একটি ভুল ধারণা আছে যে, এর জন্য অঢেল টাকার দরকার হয়। কিছু ক্ষেত্রে কথাটি সত্য হলেও সর্বক্ষেত্রে না। নতুন জ্ঞান শুধু আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের ক্ষেত্রেই হয় না, বরং খুব সাধারণভাবে কম সময়ে একটি সেবাকে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার মাঝেও হয়, নতুন একটা সাহিত্য তৈরির মাঝেও হয়। 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সব সময়ই নতুন জ্ঞান তৈরিতে উৎসাহিত করতে বড়ই অনীহা প্রকাশ করি। বেকার সমস্যা দূর করতে এখন আমরা বরাবরই উদ্যোক্তা তৈরি করার কথা বলি। কিন্তু উদ্যোক্তা তৈরি ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার তৈরির চেয়ে জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। কারণ একজনকে উচ্চ মাধ্যমিকের পরে ৫ বছর পড়িয়ে আমরা ডাক্তার বানাতে পারব। তিনি জানবেন উচ্চ রক্তচাপ হলে হৃৎপি-, মস্তিষ্কে সমস্যা হবে। কারণ এটি প্রমাণিত। ব্যাপারটা হলো জানার। অথচ আমরা ৫ বছর পড়িয়ে কখনই একজন সফল উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারব না। কারণ আমরা জানি না আজ যে সেবায় গ্রাহক খুশি, আগামীকাল সে সেটায় খুশি থাকবে কি না। এর কোনো প্রমাণিত সূত্র নেই। একজন উদ্যোক্তাকে তার সময়ের চেয়ে আগে ভাবতে হয়, অর্থাৎ তাকে নতুন জ্ঞান বানাতে হয়। এটা শুধু শিক্ষা না,  চিন্তাধারা। আর এই চিন্তাধারা একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য দরকার প্রথম থেকেই শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তবমুখী বানানো।

৭৫% প্রবৃদ্ধির দেশে আমাদের শিক্ষাক্ষেত্রের আধুনিকীকরণ এখন সময়ের দাবি। শুধু অবকাঠামো এবং ব্যবসা দিয়ে আমাদের এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমরা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে পারব না। আমাদের উন্নয়নের মহাসড়কে অন্যদের গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে নতুন জ্ঞান তৈরির মিছিলে শামিল হতে হবে। আর নতুন জ্ঞান তৈরি করতে পারলে, তার ব্যবহার বাড়াতে পারলেই আমরা আমাদের তরুণ সমাজের ইচ্ছে আর সক্ষমতার পার্থক্য ঘোচাতে পারব। আর তাহলেই আমাদের বেকার সমস্যার সমাধান হবে।

এটি রাতারাতি সমাধান হওয়ার মতো সমস্যা নয় এবং রাতারাতি সমাধান হলেও তা হবে ক্ষণস্থায়ী সমাধান। আমাদের দরকার আগামী ১০ বছরের পরিকল্পনা তৈরি করে সে অনুযায়ী প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা। আমরা শুধু তৈরি পোশাক রপ্তানিতেই শীর্ষে থাকতে চাই না, আমরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী, বিজনেস এনালিস্ট, উদ্যোক্তা রপ্তানিতেও শীর্ষে থাকতে চাই। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে না বানিয়ে বিশ্ববাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরি করলে অবশ্যই অবস্থার উন্নতি হবে।

বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে আমি কখনই দমে যাই না। কারণ এত প্রতিকূলতার মাঝেও আমাদের তরুণরা তাদের মেধার স্বাক্ষর রাখছেন সারা পৃথিবীতে। আমি শুধু ভাবি তাদের আর একটু সুযোগ দিলে না জানি দেশটা কতই না বদলে যেত।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ফাইন্যান্স, ডিপার্টমেন্ট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি