সহজে মুক্তি নেই খালেদার|121683|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৯:২০
সহজে মুক্তি নেই খালেদার
উৎপল রায়

সহজে মুক্তি নেই খালেদার

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের এক বছর পূর্ণ হতে চললেও শিগগিরই তার মুক্তি নিয়ে তেমন কোনো আশা দেখছেন না আইনজীবীরা। তারা বলছেন, রাজনৈতিক কারণেই খালেদা জিয়া এমন পরিস্থিতির শিকার। তবে আইনমন্ত্রী বলছেন, এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই।   

গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালত ৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়ার পর তাকে রাখা হয় ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। একই মামলায় গত ৩০ অক্টোবর হাইকোর্ট তার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর কারাদ- দেয়। এর আগের দিন ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিএনপির চেয়ারপারসনকে সাত বছরের কারাদন্ড দেয় বিচারিক আদালত।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, এই দুই মামলাসহ তার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা আছে। গত এক বছর একের পর এক মামলায় উচ্চ ও নিম্ন আদালতে খালেদা জিয়ার জামিন ও কারামুক্তির জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন তারা। শিগগিরই খালেদা জিয়া কারামুক্ত হবেন এমন আশাও দেখছেন না তারা। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের অভিযোগ, সরকার হস্তক্ষেপ ও ষড়যন্ত্র করছে বলেই তার কারামুক্তি বিলম্বিত হচ্ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে তার মুক্তির জন্য সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি আন্দোলন ও আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের সঙ্গে সম্প্রতি কথা বলে আরও জানা গেছে, তাকে মুক্তি পেতে হলে ওই দুটিসহ কুমিল্লায় একই ঘটনায় দায়ের হত্যা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলা এবং ঢাকায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার একটি মামলাসহ চারটি মামলায় জামিন পেতে হবে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) ও জামিন আবেদনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। আর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে খালেদা জিয়ার করা আপিল ও জামিন আবেদনের শুনানি অপেক্ষমাণ রয়েছে। প্রায় চার বছর আগের দায়ের ধর্মীয় অনুভূতির ওই মামলায় গত ২০ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার একটি আদালত। এ মামলায় তাকে আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে হবে।

২০১৫ সালে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে বাসে মানুষ পুড়িয়ে হত্যা ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় খালেদা জিয়ার জামিন আবেদন গত ৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার নামঞ্জুর করে বিচারিক আদালত। বিএনপি চেয়ারপারসনের আইনজীবীদের অভিযোগ, এর আগে এই মামলায় কুমিল্লার আদালতে একাধিকবার তারিখ থাকলেও শুনানি হয়নি। পরে তারা হাইকোর্টে    আবেদন করলে গত ২৩ জানুয়ারি একটি বেঞ্চ এক আদেশে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে কুমিল্লার বিচারিক আদালতকে নির্দেশ দেয়। আইনজীবীরা জানান, এ মামলায় খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য আবারও উচ্চ আদালতে যাবেন তারা।

খালেদা জিয়ার অন্যতম আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মনে করি, কোনো মামলার কারণে খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার ও কারাগারে রাখা হয়নি। তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত কারাগারে রাখা হয়েছে। এখন যতদিন সরকারের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকবে ততদিন আইনি প্রক্রিয়ায় তিনি কারামুক্তি পাবেন না।’ তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের একমাত্র উপায় সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করা। যদি তা করতে পারি আর সরকার নমনীয় হয় তাহলেই কেবল খালেদা জিয়াকে অন্তত জামিনে মুক্ত করা সম্ভব।’ এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার মাহবুব বলেন, ‘যেহেতু বিএনপি প্যারোলে মুক্তির বিষয়টি চাইছে না, তাই এ বিষয়ে এখন কথা বলতে চাই না।’    

বিএনপির চেয়ারপারসনের আইনজীবীরা জানান, বিগত সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গত দুই মেয়াদে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে ঢাকাসহ সারা দেশে মোট ৩৭টি মামলা হয়। দুর্নীতির দুটি মামলায় সাজা হলেও তার বিরুদ্ধে হত্যা, দুর্নীতি, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে আরও ৩৫টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যার ৩টি, নাশকতার ১৬টি ও মানহানির ৪টি মামলা রয়েছে। নাশকতার ১৬টি মামলার মধ্যে ১১টিই রাজধানীর দারুসসালাম থানায়। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, ৩৭ মামলার বেশিরভাগেই জামিনে রয়েছেন খালেদা জিয়া। তবে, উচ্চ আদালতের নির্দেশে দারুসসালাম থানার ১১ মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের নাইকো, গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলাসহ ১৯টি মামলা বিচারাধীন। এগুলোর বেশিরভাগ মামলায়ই অভিযোগ গঠন হয়নি। ১২টি মামলা রয়েছে তদন্ত পর্যায়ে।

খালেদা জিয়ার কারামুক্তির প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তার আইনজীবী ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তাদের নেত্রী যে সরকারের ষড়যন্ত্রের শিকার- তা পরিষ্কার। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে দূরে সরিয়ে রাখার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাকে কারাগারে পাঠিয়েছে সরকার। বিচার বিভাগে সরকারের হস্তক্ষেপের কারণে তিনি জামিন পাচ্ছেন না। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে প্যারোলের চিন্তা করছেন কি নাÑ জানতে চাইলে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘এ নিয়ে দলে আলোচনা হয়নি। আমরা আইনানুগভাবেই তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনব।’

বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার কায়সার কামাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তার কারামুক্তিতে কতটি মামলায় জামিন লাগবে- সেটি মুখ্য নয়। আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছি একমাত্র রাজনৈতিক কারণেই তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। না হলে কুমিল্লার মামলায় তার জামিনের আবেদনের শুনানির জন্য চারবার তারিখ পেছানো হতো না। তারপরও আইনানুগ পন্থাতেই আমাদের এগুতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সরকার যদি হস্তক্ষেপ না করে, দেশের আইন, সংবিধান যদি নিজস্ব গতিতে চলে তাহলে খালেদা জিয়ার কারামুক্তি পেতে বিলম্ব হওয়ার কথা নয়।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার রাতে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার যে কথা বলছেন তার কোনো ভিত্তি নেই। খালেদা জিয়াকে সরকার সাজা দেয়নি, আটকিয়েও রাখেনি। বাস্তবতা হলো, দুর্নীতির অভিযোগে আদালত তাকে সাজা দিয়েছে। খালেদার আইনজীবীদের এ ধরনের বক্তব্য যুক্তিহীন।