‘দারিদ্র্য নয়, লোভের কারণে চকবাজারে এ মৃত্যু’|124919|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ১১:৪০
‘দারিদ্র্য নয়, লোভের কারণে চকবাজারে এ মৃত্যু’
অনলাইন ডেস্ক

‘দারিদ্র্য নয়, লোভের কারণে চকবাজারে এ মৃত্যু’

রাজধানী ঢাকার চকবাজারে যানজটের মধ্যে একটি কারের সিএনজি সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে রাস্তায় আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে রাস্তার পাশে রেস্তোরাঁয় রান্নার কাজে ব্যবহৃত সিলিন্ডারগুলোও বিস্ফোরিত হতে থাকে। একইভাবে পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে অবৈধভাবে রাখা প্লাস্টিকের গুদাম ও কেমিক্যালের দোকানে আগুন ধরে যায়।

এভাবে পুরো রাস্তায় আগুনের দেয়াল সৃষ্টি হয়ে যায়। সাইকেল, রিকশা, কার, মানুষ আটকে পড়ে আগুনে। শেষপর্যন্ত নারকীয় এ অগ্নিকাণ্ডে ঘটে ১১০ প্রাণহানি।

বুধবার রাতে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকার চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এভাবে বর্ণনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

ঘনবসতি, অনিরাপদ নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার ঘোষণার পরও তা কার্যকর না হওয়ায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সম্প্রতি শতাধিক প্রাণহানি ঘটেছে।

মোহাম্মদ রাকিব নামে এক রেস্তোরাঁ মালিক দেখলেন, এক রিকশাওয়ালা আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার চোখের সামনেই জীবন্ত পুড়ে মারা যান তিনি।

রাকিব বলেন, অনেক মানুষ বাঁচতে চেষ্টা করে যাচ্ছিল। আতঙ্কিত অবস্থায় আমি টাকা-পয়সা সব ফেলে রেস্তোরাঁ থেকে পালিয়েছি।

নিজামুদ্দিন আহমেদ নামে একজন স্থাপত্যবিদ নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, “দারিদ্র্যের জন্য নয়, লোভের কারণেই এসব প্রাণহানি ঘটছে।”

তিনি বলেন, যারা আবাসিক ভবনে কেমিক্যাল গুদামজাত করে তারা ধনী লোক। তাদের গাড়ি আছে, সুন্দর বাড়ি আছে এমনকি তাদের সন্তানরা বিদেশেও পড়ালেখা করে।

সরকারি কর্তৃপক্ষের উচিত এসব ব্যবসায়ীদের কাছে গিয়ে বলা এখন থেকে বের হয়ে আসতে।

বৃহস্পতিবার সকালে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার পর দেখা যায় চকবাজারের আশপাশের এলাকাটি যেন একটি যুদ্ধক্ষেত্র।

রাস্তাজুড়ে পড়ে আছে ভস্ম হয়ে যাওয়া গাড়ি, দরজা পড়ে আছে রাস্তায়। আর উদ্ধারকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা পুড়ে যাওয়া মানুষের লাশ উদ্ধার করে সাদা ব্যাগে ঢুকাচ্ছিল।

পার্শ্ববর্তী হাসপাতালগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয় লাশগুলো। সেখানে একের পর এক লেখা হচ্ছে উদ্ধারকৃত লাশের নাম। স্বজনের খোঁজ পেতে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে নামের তালিকায়।

স্বামী হারিয়ে মুক্তা নামে এক নারী আহাজারি করছিলেন, “আমার ও আমার বাচ্চার সঙ্গে এ কী ঘটল? আমি এখন কী করব?”

অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপত্তাজনিত বিপর্যয়ে এরূপ প্রাণহানির ঘটনা এটিই প্রথম নয়।

গত ২০১০ সালেও ওই এলাকায় (নিমতলী) একই ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১২০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণ থেকে আগুন আবাসিক ভবনে রাখা কেমিক্যালের গুদামে ছড়িয়ে পড়ে।

নয় বছর আগেও একইভাবে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছতে দেরি হয়ে যায় যানজট ও সড়ক অব্যবস্থাপনার কারণে।

ওই ঘটনার পর সরকারি কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছিল ভবন আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সুস্পষ্ট আইনে আছে, আবাসিক ভবনে প্লাস্টিক পণ্যের জন্য ব্যবহৃত বিপজ্জনক কেমিক্যাল দ্রব্য গুদামজাত করা অবৈধ। কিন্তু তদারকি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি, দুর্নীতির কারণে এই আইন প্রায়ই লঙ্ঘন করা হয়।

বিশ্লেষকরা বলেন, ধনী ব্যবসায়ীরা সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে আসছেন, যাতে তাদের ব্যবসা সেখান থেকে না সরাতে হয়।

একইভাবে ২০১২ সালের নভেম্বরে তাজরীন গার্মেন্টস কারখানায় আগুনে ১১৫ জন নিহত হন।

এছাড়া ২০১৩ সালেও একইভাবে ঢাকার কাছেই গার্মেন্টস কারখানা রানা প্লাজার আটতলা ভবন ধসে ১১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক চিকিৎসক জানান, অধিকাংশ মানুষ মারা গেছে আগুনে দগ্ধ হয়ে। অনেকের ফুসফুসে বিষাক্ত গ্যাস প্রবেশ করে মারা গেছে। সম্ভবত কেমিক্যাল পুড়ে এমনটা ঘটেছে।