সুদের সঙ্গে করও ছাড় পাবেন ভালো ঋণগ্রহীতা|125535|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৯:২৭
বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশ
সুদের সঙ্গে করও ছাড় পাবেন ভালো ঋণগ্রহীতা
নিজস্ব প্রতিবেদক


সুদের সঙ্গে করও ছাড় পাবেন ভালো ঋণগ্রহীতা

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে নিয়মিত পরিশোধ করা গ্রাহকদের ‘ভালো ঋণগ্রহীতা’ হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ঋণের সুদহার ১০ শতাংশ কমানোর পাশাপাশি আয়কর ও করপোরেট করে ছাড় দেওয়ার সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে ভালো ঋণগ্রহীতাদের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে বিশেষ সুবিধার অংশ হিসেবে রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ডিসকাউন্ট সুবিধা দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল খেলাপি ঋণ কমাতে ভালো ঋণগ্রহীতাদের পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন। ভালো ঋণগ্রহীতাদের কোন ধরনের প্রণোদনা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাছে প্রস্তাব চেয়ে গত ৪ ফেব্রুয়ারি চিঠি দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক এক প্রতিবেদনে ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য প্রণোদনা হিসেবে তাদের ঋণের সুদহার কমানো, কর কমানোসহ বেশ কিছু প্রস্তাব করে। 

ব্যাংকাররা বলছেন, ভালো ঋণগ্রহীতাদের যত সুবিধাই দেওয়া হোক, যারা খেলাপি হওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়, তারা খেলাপি না হয়ে ভালো ঋণগ্রহীতা হবে না। তবে এসব সুবিধা দেওয়া হলে যারা এমনিতেই নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করেন, তারা কিছু সুবিধা পাবেন। এভাবে প্রণোদনা দিয়ে খেলাপি কমানো সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ আদায়ে যারা ঋণ নিয়ে ইচ্ছা করে পরিশোধ করছে না, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক এ কে এম আমজাদ হোসেন স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়, একজন ভালো ঋণগ্রহীতাকে বিদ্যমান ঋণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আবেদন করা ঋণের সুদহার নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা বা ছাড় দিতে হবে। ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারী ভালো ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ সুবিধার অংশ হিসেবে রিওয়ার্ড পয়েন্ট ও ডিসকাউন্ট সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।

এ ছাড়া বাজেটে ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ কর সুবিধা দেওয়ার কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে স্বীকৃত ব্যক্তি বা কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন কোনো প্রকল্প শুরু করতে চাইলে সরকারি সংস্থাগুলো গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোনসহ বিভিন্ন সেবা সংযোগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেবে।

ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য আর্থিক সুবিধার বাইরে বেশ কিছু নৈতিক প্রণোদনা দেওয়ারও সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেবল ব্যাংক পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও ভালো ঋণগ্রহীতাকে বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, নাগরিক সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভালো ঋণগ্রহীতাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ সরকারি পরিবহন ব্যবহারে তাদের বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সরকারি ব্যাংকগুলো ভালো ঋণগ্রহীতাদের বিশেষ কার্ড দেবে। ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে (সিআইবি) ভালো ঋণগ্রহীতাদের আলাদাভাবে রিপোর্ট করা হবে। তাদের সিআইবি রিপোর্টে ‘স্ট্যান্ডার্ড বা গুড বরোয়ার’ উল্লেখ করা হবে। ব্যাংকগুলো ভালো ঋণগ্রহীতাদের কাছে মাঝে-মধ্যে এসএমএস পাঠিয়ে সম্বোধন করবে। দীর্ঘ সময় ধরে ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত গ্রাহকের ছবি, প্রোফাইল ব্যাংকের বিশেষ বুকলেট ও ম্যাগাজিনে প্রকাশ করা হবে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রস্তাব সংগ্রহ করছি। সেগুলো যাচাই-বাছাই ও সমন্বয় করে ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য আর্থিকভাবে প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি তাদের সম্মাননাও জানানো হবে।’

খেলাপি ঋণ কমাতে ও ঋণগ্রহীতাদের ঋণ ফেরতে উৎসাহ দিতে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময়ও ভালো ঋণগ্রহীতাদের প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ১৯ মার্চ সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

তাতে বলা হয়, কোনো ঋণগ্রহীতার ঋণ হিসাব একটানা তিন বছর নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে ওই গ্রাহক ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হবেন। ঋণ নেওয়ার তিন বছর পর ওই গ্রাহক ঋণের সুদ বাবদ যে পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করেছেন, তার কমপক্ষে ১০ শতাংশ  তাকে ফেরত দেওয়া বা ছাড় দেওয়া হবে। এরপর প্রতি বছরই নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করলে সুদের ১০ শতাংশ ফেরত পাবেন তিনি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ডের মতো অ্যাওয়ার্ড চালু করা, কম সুদে ঋণ দেওয়া এবং গ্রাহকদের র‌্যাঙ্কিং করার জন্য ‘লাইভলেন্ড’ অ্যাপ ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মতামত চাওয়া চায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে ইতিবাচক মতামত দিয়েছে।

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রদীপ কুমার দত্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনায় ভালো ঋণগ্রহীতাদের ১০ শতাংশ সুদ ফেরত দেওয়ার কথা বলা আছে। অনেক গ্রাহককে ১৫-২০ শতাংশ সুদ ছাড় দিয়েও তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায় করা সম্ভব হয় না। কারণ যারা খেলাপি হওয়ার উদ্দেশ্যে ঋণ নেয়, তারা এসব প্রণোদনার ধার ধারে না। ব্যাংক খাতের খেলাপি বন্ধে ঋণখেলাপি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।