বেপরোয়া কেমিক্যাল বাজার|125766|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০৮:৩৮
বেপরোয়া কেমিক্যাল বাজার
অনলাইন ডেস্ক

বেপরোয়া কেমিক্যাল বাজার

রাজধানীতে রাসায়নিক ও বিস্ফোরক দ্রব্য আমদানির লাইসেন্স রয়েছে ১২৭ প্রতিষ্ঠানের। এর মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য বিক্রির বৈধ দোকান রয়েছে ৫৯টি। এসব দোকান বংশাল, টিকাটুলী, সুরিটোলা, করাতিটোলা, লালবাগ, কোতোয়ালি, মিটফোর্ডসহ আশপাশের এলাকায় অবস্থিত। দুই সিটি করপোরেশন লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের আড়াই হাজার গুদামকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে এসব পণ্য সংরক্ষণ ও মজুদ করতে।

গত এক বছরে দেশে ৮০-৮৫ হাজার টন পেট্রো কেমিক্যাল (কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক) এসেছে। এর মধ্যে গত তিন মাসে এসেছে ২৪ হাজার টন। এসবের মধ্যে ২৮ ধরনের কেমিক্যাল রয়েছে। এগুলো ডায়িং ও প্রিন্টিং কাজে ব্যবহার হয় বেশি। এর বাইরে জেলা প্রশাসকের অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিস্ফোরক আসছে। সরকারি এমন তথ্য দিয়েছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর।

তবে পরিদপ্তরের মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শকরা ভিন্ন তথ্য দিয়েছেন দেশ রূপান্তরকে। তারা জানিয়েছেন, সরকারিভাবে ১২৭টি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেওয়া হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা কয়েকগুণ বেশি। কারণ কেবল পুরান ঢাকাতেই বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যভুক্ত ১১শ’র বেশি ব্যবসায়ী রয়েছে। অবৈধ গুদাম রয়েছে ২২ হাজারের বেশি। এর বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর, নরসিংদী ও চট্টগ্রামে কেমিক্যালের বড় ব্যবসা রয়েছে। এমনকি বৈধ পথের চেয়ে অবৈধ পথেই কেমিক্যাল বেশি আসছে।

বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা আরও বলেন, বিস্ফোরক পরিদপ্তর তালিকাভুক্ত ২৮-৩০ ধরনের রাসায়নিক ও বিস্ফোরক আমদানির বৈধ অনুমতি রয়েছে। অথচ পুরান ঢাকাতে দুই শতাধিক ধরনের বিপজ্জনক ও দাহ্য কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক বেচাকেনা চলছে।

এ ব্যাপারে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, অবৈধভাবে কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক দ্রব্য দেশে আসছে, তার প্রমাণ পুরান ঢাকা। কারণ সেখানে প্রচুর অবৈধ দোকান ও গুদাম রয়েছে। এমনকি যেসব দ্রব্য আমদানি ও বিক্রি নিষিদ্ধ সেসব দ্রব্যও বেচাকেনা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এসব রাসায়নিক তদারকির মতো লোকবল আমাদের নেই। কারণ আমরা শুধু কারিগরি দিকটি দেখে থাকি। এগুলোর তদারকি কিংবা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ব্রিটিশ আমল থেকেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের। তবে বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণের জন্য আলাদা গুদামের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। এরই মধ্যে পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী নিজ উদ্যোগে গুদাম অন্যত্র স্থানান্তর করেছেন বলেও তিনি জানান।

পুরান ঢাকার কেমিক্যাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈধ প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে অবৈধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব দোকানে কোনো ধরনের সতর্কতা না মেনেই অবাধে বিপজ্জনক কেমিক্যাল বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি কাঠ ও জুতার মতো কমদামি কেমিক্যালের ছাড়পত্রে আমদানি করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরনের অতি দাহ্য রাসায়নিক। কোনো কোনো অসাধু ব্যবসায়ী গোপনে গানপাউডারও বিক্রি করছে। সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারির অভাবে এসব কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। বৈধ কাজের পাশাপাশি ব্যবহার হচ্ছে অপরাধমূলক কর্মকা-ে। বিশেষ করে মজুদের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি না মানায় চুড়িহাট্টার মতো মর্মন্তুদ প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্বদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ বলেন, বিপজ্জনক কেমিক্যাল পরিবহন, মজুদ এবং সংরক্ষণে সচেতনতা জরুরি। কেমিক্যাল ব্যবসার সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের অবশ্যই কেমিক্যালের বিষয়ে বিস্তর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি সরকারের নীতিমালা মেনে কেমিক্যাল আমদানি, পরিবহন এবং সংরক্ষণ করতে হবে। তা না হলে কেমিক্যাল বিস্ফোরণে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পুরান ঢাকাতে অবাধে বিপজ্জনক কেমিক্যাল বিক্রি হচ্ছে।

অবাধে বিপজ্জনক কেমিক্যাল বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে বিস্ফোরক পরিদপ্তরের প্রধান পরিদর্শক শামসুল আলম বলেন, আমরা কেবল পরিদপ্তর অনুমোদিত কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক নজরদারি করি। তবে যেসব কেমিক্যাল অনুমতি দেওয়ার সুযোগ নেই সেগুলো নজরদারি করি না। চকবাজারের একাধিক কেমিক্যাল ব্যবসায়ী বলেন, কেমিক্যাল ব্যবসার আড়ালে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী বিস্ফোরকের ব্যবসা করে। রাসায়নিকের দোকান ঘেঁষে আরেকটি রাসায়নিকের দোকান থাকার নিয়ম নেই। এ নিয়মও মানছে না কেউ। একটি দোকান ঘেঁষে রয়েছে আরেকটি রাসায়নিকের দোকান। কাঠ ও জুতার পলিশ দাহ্য হলেও বিক্রি হচ্ছে পাড়া-মহল্লার হার্ডওয়্যারের দোকানে।

ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে সরকারি নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু দেশের অধিকাংশ কেমিক্যাল ব্যবসায়ী এ নির্দেশনা মানছে না। প্রশাসনের যোগসাজশে অনেকেই বিপজ্জনক রাসায়নিক অবাধে বিক্রি ও গুদামজাত করছে। বিপজ্জনক রাসায়নিক বিক্রির ক্ষেত্রে লাইসেন্স নেওয়া জরুরি হলেও শুধু আমদানিকারক পর্যায়ে কিছু লাইসেন্স রয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক বাজারের বিশৃঙ্খলার জন্য কয়েকটি কারণকে দায়ী করেছেন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিকৌশল বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইয়াসির আরাফাত খান বলেন, কেমিক্যাল ও বিস্ফোরক বাজারে শৃঙ্খলা আনতে হলে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নীতিমালা দরকার। বৈধ-অবৈধ যে পথেই আসুক না কেন, কোথায় মজুদ হচ্ছে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। কারা আনছে, কী কাজে ব্যবহার করছে, সেটা সরকারকে জানতে হবে। অপব্যবহার বন্ধ করতে অ্যাকশন প্ল্যান দরকার। যেহেতু আমরা কেমিক্যাল তৈরি করি না, তাই আমদানি বন্ধ করা যাবে না। ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।

‘বিপজ্জনক রাসায়নিক মজুদ, পরিবহন ও বিক্রির ক্ষেত্রে আইন মানছেন না ব্যবসায়ীরা। এর ফলে নগরীতে অগ্নিদুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স ছাড়া শুধুমাত্র সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামজাত এবং খোলাবাজারে বিক্রি হচ্ছে। অথচ রাসায়নিক মজুদ করতে হলে আইন মতে, গুদামের নকশা, আমদানি-রপ্তানির লাইসেন্স, অগ্নিনির্বাপণ সনদসহ কমপক্ষে ১৫টি শর্ত পূরণ করতে হয়। কিন্তু তা না করে বিভিন্ন দাহ্য পদার্থ অবলীলায় বিক্রি হচ্ছে। যেমন- জাইলিন, এসিটন, রেড ফসফরাস, সালফার, অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট, পটাশিয়াম নাইট্রেট, নাইট্রোগ্লিসারিন, গানপাউডার, গানকটন, রঙিন আতশবাজি, পটাশিয়াম ক্লোরেট, ফসফরাস ও সালফার’- বলেন এই বিশেষজ্ঞ।

এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক শফিকুল ইসলাম মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিপজ্জনকসহ সব ধরনের কেমিক্যাল ব্যবসার ক্ষেত্রে লাইসেন্স দেওয়া জরুরি। কিন্তু খুচরা ব্যবসায়ীদের কোনো লাইসেন্স নেই। বিপজ্জনক রাসায়নিকের ব্যবসা নজরদারিতে আনতে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স প্রদান করা জরুরি। এসব লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সমিতির অনুমোদন, ট্যাক্স-ভ্যাট, গুদামজাত ব্যবস্থা, বিক্রির যোগ্যতা ও ব্যবসায়ীর দক্ষতা দেখা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি হচ্ছে না।