ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.) |148548|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ জুন, ২০১৯ ০০:০০
ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)
পরাগ মাঝি

ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর সিদ্দিক (রা.)

খলিফার শাব্দিক অর্থ ন্যায়পরায়ণ ও সঠিকভাবে পথনির্দেশপ্রাপ্ত নেতা। হযরত মুহম্মদ (সা.) এর সহচরদের মধ্যে চারজনকে এই বিশেষ সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত করা হয়। তারা মহানবীর মৃত্যুর পর ইসলামের নেতৃত্ব দেন। খলিফা শব্দটি নেওয়া হয়েছে হযরত মুহম্মদ (সা.) এর একটি হাদিস থেকে। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘তোমরা আমার ও আমার ন্যায়নিষ্ঠ খলিফাদের দৃষ্টান্ত শক্ত করে ধরো।’ ইসলামের প্রথম খলিফাকে নিয়ে লিখেছেন পরাগ মাঝি

রাসুলের সহচর

রাসুল (সা.)-এর জন্মের দুই বছরের কিছু সময় পর তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং অনুরূপ সময়ের ব্যবধানে তারা উভয়ে ইন্তেকাল করেন। তাই মৃত্যুকালে আবু বকরের বয়স হয়েছিল রাসুল (সা.)-এর বয়সের সমান।

আবু বকর (রা.)-এর আসল নাম আব্দুল্লাহ বিন আবু কুহাফা। তার উপাধি ছিল সিদ্দিক। মিরাজের ঘটনাকে সর্বপ্রথম মনেপ্রাণে  বিশ্বাস করেছিলেন বলেই রাসুল (সা.) তাকে এই উপাধিতে ভূষিত করেন।

ছোটবেলায় তিনি অন্যান্য আরব শিশুদের মতো বেদুইনদের মাঝে খেলা করতেন উট নিয়ে। উট খুবই পছন্দ করতেন তিনি। ছাগল আর উটের বাচ্চা নিয়ে তার অতিরিক্ত ভালোবাসার জন্য লোকে তার নাম দেয় ‘আবু বকর’, যার অর্থ উটের বাচ্চার বাবা।

আবু বকর ছিলেন উজ্জ্বল গৌরবর্ণ ও পাতলা ছিপছিপে। তার ছিল প্রশস্ত ললাট। শেষ বয়সে চুল সাদা হয়ে গিয়েছিল। মেহেদির খিজাব লাগাতেন। যতটুকু হাত দেখা যেত তাতে লোম চোখে পড়ত না।

তিনি ছিলেন সম্মানিত কুরাইশ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম। জ্ঞান, মেধা, অভিজ্ঞতা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা ও সৎ চরিত্রের জন্য মক্কার সব মানুষের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তিনি। আরববাসীর নসব বা বংশসংক্রান্ত জ্ঞানে তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ। কাব্য প্রতিভাও ছিল তার। ছিলেন অত্যন্ত বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী।

বক্তৃতা ও বাগ্মিতায় খোদাপ্রদত্ত যোগ্যতার অধিকারী। এসব গুণের ফলে তিনি নিজ গোত্রে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তার অমায়িক মেলামেশা, পাণ্ডিত্য ও ব্যবসায়িক দক্ষতার কারণে অনেকেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও সখ্য স্থাপন করত। তার বাড়িতে প্রতিদিন মক্কার বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়মিত বৈঠক বসত।

হযরত মুহম্মদ (সা.)-কে সবসময় তিনি ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। মানুষের দুঃখ-দুর্দশায়, সহায়-সম্বলহীনতায় এবং দুস্থদের সাহায্য করতে তিনি ছিলেন নিবেদিত। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তার কাছে সঞ্চিত ৪০ হাজার স্বর্ণমুদ্রা ইসলামের কল্যাণে তিনি রাসুলুল্লাহর কাছে প্রদান করেন। তাবুকের যুদ্ধে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হলে আবু বকরের কাছে দান করার তেমন কিছুই ছিল না। তাই তিনি ব্যাকুল চিত্তে ঘরে গিয়ে প্রয়োজনীয় আসবাব, কাপড়চোপড় থেকে শুরু করে চুলার ছাই পর্যন্ত (যুদ্ধে আহত যোদ্ধাদের ক্ষতস্থানে ছাই উপকারী) রাসুলুল্লাহর দরবারে প্রদান করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এসময় তাকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?’ উত্তরে আবু বকর বলেন, ‘আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)-কে।’ বদর, ওহুদ ও খন্দকের যুদ্ধ ছাড়াও হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরের সময় ও মক্কা বিজয়ের সময় তিনি মহানবীর (সা.) এর পাশেই ছিলেন।

তিনি চেয়েছিলেন তার কবর যেন নবী (সা.) এর পাশেই হয় এবং মুসলিমরা তাকে সেখানেই সমাহিত করে। মদিনার মসজিদে নববীতে গেলে হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এর কবরের ঠিক পাশেই হযরত আবু বকর (রা.) এর কবর দেখতে পাওয়া যায়।

পরিবারের কথা
হযরত আবু বকর ছিলেন পিতা-মাতার একমাত্র পুত্রসন্তান। অত্যন্ত আদর-যত্ন ও বিলাসিতার মধ্য দিয়ে তিনি বড় হন। শৈশব থেকে যৌবনের সূচনা পর্যন্ত পিতার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। বিশ বছর বয়সে পিতার ব্যবসা-বাণিজ্যের দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেন।

আবু বকরের পিতা আবু কুহাফা কুরাইশদের মধ্যে যথেষ্ট মর্যদাবান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন বয়োবৃদ্ধ ও সচ্ছল। তার গৃহ কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য প্রসিদ্ধ ছিল না, সামাজিক কর্মকাণ্ডে ও তার মতামত অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করা হতো। মক্কা বিজয় পর্যন্ত ইসলামের প্রতি তিনি আকৃষ্ট না হলেও একমাত্র পুত্র আবু বকরকে কখনো ইসলাম থেকে ফিরিয়ে রাখার চেষ্টা করেননি। তবে, হযরত আলীকে (রা.) দেখলে তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, ‘এই ছোকরারাই আমার ছেলেটিকে বিগড়ে দিয়েছে।’ মক্কা বিজয়ের দিন রাসুল (সা.)-এর খিদমতে হাজির হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। শেষ বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন।


মদিনার মসজিদে নববীতে হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর রওজার ঠিক পাশেই হযরত আবু বকর (রা.)-এর রওজা মোবারক

হযরত আবুবকরের মা উম্মুল খায়ের বহু পূর্বে মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। মক্কার ‘দারুল আরকামে’ ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম। স্বামীর মতো তিনিও দীর্ঘজীবন লাভ করেন। প্রায় ৯০ বছর বয়সে ছেলেকে খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন।
আবু বকর (রা.)-এর চারজন স্ত্রী ছিলেন। তারা হলেন, কুতাইলা বিনতে আব্দুল উজ্জা, উম্মে রুমান, আসমা বিনতে উমাইস, হাবিবা বিনতে খারিজা। স্ত্রীদের মধ্যে কুতাইলা বিনতে আব্দুল উজ্জা ইসলাম গ্রহণ করেননি। আবু বকর তাকে তালাক দিয়েছিলেন। তার অন্য স্ত্রী উম্মে রুমান ইসলাম গ্রহণ করেন।আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ অনেককে ইসলাম গ্রহণে অণুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ জোগান।

খেলাফত লাভ

হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। মুহাজির ও আনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিছু গোত্র পুরনো প্রথা অনুযায়ী, গোত্রভিত্তিক নেতৃত্ব ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আনসাররা সাকিফা নামক স্থানে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এরপর আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ওই আলোচনা সভায় গিয়ে হাজির হন। সভার আলোচনায় এক পর্যায়ে উমর ইবনুল খাত্তাব আবু বকরের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহও তার অনুসরণ করেন। এরপর বাকিরাও আবু বকরকে নেতা হিসেবে মেনে নেন। সুন্নিরা তাকে ‘খলিফাতুর রাসুল’ বা  ‘আল্লাহর রাসুলের উত্তরাধিকারী’ বলে সম্মান করে থাকে। যদিও শিয়ারা আবু বকরকে বৈধ খলিফা বলে স্বীকার করে না। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী, আলি ইবনে আবু তালিবই প্রথম খলিফা হিসেবে যোগ্য।

প্রথম খলিফার শাসনব্যবস্থা

৮ জুন ৬৩২ থেকে ২২ আগস্ট ৬৩৪ পর্যন্ত মাত্র ২৭ মাস স্থায়ী ছিল আবু বকরের খিলাফত। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি এসব সফলভাবে মোকাবিলা করেন। খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর হযরত আবু বকর (রা.) তার প্রথম ভাষণে বলেন, ‘আমি আপনাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ নই। আপনাদের সকলের সাহায্য ও পরামর্শ আমার কাম্য। আমি ন্যায় ও সত্যের পথে থাকলে আপনারা আমাকে সমর্থন করবেন। বিপথগামী হলে আমাকে উপদেশ দেবেন। আমি বরণ করব সত্য, বর্জন করব মিথ্যা। আমার চোখে ধনী-নির্ধন, সবল-দুর্বল সকলেই সমান। আপনারা আমাকে ততক্ষণ মেনে চলবেন, যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তার রাসুলকে মেনে চলব। অন্যথায় আপনাদের নেতা হওয়ার আমার কোনো অধিকারই নেই।’

জানা যায়, খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যথারীতি কাপড়ের ব্যবসার জন্য বাজারে যাচ্ছিলেন। রাস্তায় হযরত উমর (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন?’ জবাবে আবু বকর (রা.) বললেন, ‘ব্যবসা করতে বাজারে যাচ্ছি।’ তখন উমর (রা.) বলেন, এভাবে বাজারে গেলে খেলাফতের কাজ কীভাবে চলবে?’ আবু বকর বললেন, ‘তাহলে আমার পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণের কী হবে?’ উমর বললেন, ‘আপনার হাতে মুসলমানদের যে কোষাগার (বায়তুল মাল) আছে, তা থেকে আপনার ভরণ-পোষণের খরচ বাবদ ভাতা নির্দিষ্ট করা হবে। যেহেতু আপনি সকল মুসলমানের তরফে খেলাফতের কাজে নিয়োজিত আছেন।’ অতঃপর তারা দুজন মিলে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের পরামর্শে একজন সাধারণ মুহাজিরের ভাতার সমপরিমাণ ভাতা খলিফার জন্য নির্ধারণ করলেন।

একদিন খলিফার স্ত্রী কিছু মিষ্টিদ্রব্য খাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলে খলিফা বললেন, আমার কাছে অতিরিক্ত পয়সা নেই, আর বায়তুল মালের পয়সা জনগণের। এ সময় খলিফার স্ত্রী জানালেন, দৈনন্দিন পারিবারিক খরচ থেকে তিনি কিছু অর্থ সঞ্চয় করেছেন। এই অর্থ দিয়ে মিষ্টিদ্রব্য আনার জন্য খলিফাকে অনুরোধ করেন তিনি। কিন্তু খলিফা বললেন, অভিজ্ঞতা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, এই পরিমাণ পয়সা বায়তুল মাল থেকে কম নিলে পরিবার-পরিচালনায় কোনোরূপ অসুবিধা হবে না। অবশেষে খলিফার হুকুমে স্ত্রীর সঞ্চিত পয়সা বায়তুল মালে জমা করে দেওয়া হলো, একই সঙ্গে তিনি নির্দেশ দিলেন, পরবর্তী সময়ে এই পরিমাণ পয়সা যেন তার বেতন থেকে কম দেওয়া হয়।

আবু বকর (রা.) জনগণ ও সেনাবাহিনীকে দশটি অমূল্য উপদেশ দিয়েছিলেন- ‘কাউকে প্রতারিত  কোরো না, চুরি কোরো না, ব্যভিচার কোরো না, বিশ্বাসঘাতকতা কোরো না, কারও অঙ্গচ্ছেদ  কোরো না, স্ত্রী লোক ও বৃদ্ধকে হত্যা কোরো না, খেজুর গাছ নষ্ট কোরো না, ফলবান বৃক্ষ নষ্ট  কোরো না, শস্য বা শস্যক্ষেত নষ্ট কোরো না এবং প্রয়োজন ছাড়া গবাদিপশু হত্যা কোরো না।

রিদ্দার যুদ্ধ ও কুরআন সংকলন
হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর মৃত্যুর আগে রক্তপাতহীন মক্কা বিজয়ের পর ইসলামকে বৃহত্তম শক্তি হিসেবে মেনে নেয় আরবের অনেক গোত্রই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই মেনে নেওয়া যতটা না ইসলামের প্রতি আনুগত্য তার চেয়ে বেশি ছিল রাজনৈতিক, ক্ষমতার পক্ষে থাকার জন্য। ফলে নবী করিম (সা.)-এর মৃত্যুর পর অনেক গোত্রই ইসলাম ত্যাগ করে। মক্কা, মদিনা, ওমানের আব্দুল কাইস গোত্র আর তায়েফের সাকিফ গোত্র ছাড়া বেশিরভাগ গোত্রেই ইসলাম ত্যাগের প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। মুসলিম বিশে^র ঐক্য রক্ষার জন্য এই ইসলাম ত্যাগ দমন করতে আবু বকর (রা.) যে যুদ্ধ করেন সেটাকে বলা হয় ‘রিদ্দা যুদ্ধ’। এ যুদ্ধে তিনি সফল হন, বেশিরভাগ গোত্রই পরাজিত হয় এবং আবারও ইসলামের আনুগত্য স্বীকার করে।

ইসলাম ত্যাগের আরও একটা কারণ ছিল ভ- নবীদের আবির্ভাব। হযরত মুহম্মদ (সা.) এর অভাবনীয় সাফল্য দেখে আরবের অনেকেই নিজেদের নবী বলে দাবি করতে থাকে। তারা আবু বকর (রা.)-এর কাছ থেকে ক্ষমতার ভাগ চেয়ে বসে। বনু হানিফা’র মুসাইলিমা বিন হাবিব নামে একজন হাতের জাদুতে পারদর্শী ছিলেন। এই জাদু দেখিয়ে তিনিও নিজেকে নবী দাবি করেন। আল ইয়ামামা নামক স্থানে আবু বকরের বাহিনীর সঙ্গে ৬৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে মুসাইলিমার যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)। যুদ্ধে ভ- নবী মুসাইলিমা নিহত হন। কিন্তু মুসলিমদের পক্ষে মারা যান অন্তত ৮০০ জন কুরআনে হাফেজ।
এতজন হাফেজ মারা যাওয়ায় উমর (রা.) অস্থির হয়ে পড়েন কুরআনের সংরক্ষণের বিষয়ে। তিনি এ বিষয়ে আবু বকর (রা.)-কে পরামর্শ দেন। আবু বকর হযরত যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করেন। কারণ হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর সাহাবী যায়েদ (রা.) প্রধান ওহি লেখক ছিলেন। এ কমিটিতে ছিলেন কুরআনের হাফেজরা। কুরআনের সকল আয়াত সংগ্রহ করার পর সেগুলো পরস্পর তুলনা করেন তারা। পুরোপুরি সন্তুষ্ট হওয়ার পর তারা একটি কপিতে কুরআন লিপিবদ্ধ করেন। সেটা হযরত মুহম্মদ (সা.) মারা যাওয়ার মাত্র এক বছর পরের কথা। বেশিরভাগ সাহাবিই তখন জীবিত। কুরআনের এই কপিটি হযরত আবু বকর (রা.) দিয়ে গিয়েছিলেন হযরত উমর (রা)-কে।

অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ মিটে যাওয়ার পর আবু বকর (রা.) ইসলামি বিশ্ব সম্প্রসারিত করবার দিকে মনোযোগ দেন। তিনি ইরাক দিয়ে শুরু করেন, কারণ সেটি ছিল সাসানীয় সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী অঞ্চল। ৬৩৩ সালে তিনি খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.)-এর অধীনে বাহিনী প্রেরণ করেন ইরাকে। এমনকি তিনি প্রবল পরাক্রমশালী রোম সাম্রাজ্যের সিরিয়া প্রদেশে চারটি বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। তবে এই মিশনগুলো তিনি কেবল শুরু করে দিয়ে গিয়েছিলেন। পরবর্তী শাসকদের আমলে সেগুলো বেশ ফলপ্রসূ হয়েছিল এবং ইসলামি বিশ^ আরও সম্প্রসারিত হয়েছিল।

দয়া ও নম্রতা

হযরত উমর (রা) একবার এক বৃদ্ধ মহিলার খোঁজ পেলেন যাকে দেখাশোনা করবার কেউ ছিল না। মহিলাটি আবার অন্ধও ছিলেন। ফজরের নামাজ শেষ করেই তিনি মহিলার বাসায় গেলেন, গিয়ে দেখলেন তার বাসা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। পর পর সাত দিন তিনি একই ব্যাপার খেয়াল করলেন, কে যেন আগেই এসে ওই অন্ধ মহিলার বাসা পরিষ্কার করে যায়। মহিলাকে জিজ্ঞেস করলে তিনিও বলতে পারলেন না। কে যেন এসে কাজগুলো করে দিয়ে যায়, অন্ধ মানুষ, দেখতেও পারেন না।
একদিন তাই উমর (রা.) ফজরের আগেই ওই বাসার সামনে উপস্থিত হলেন এবং অবাক বিস্ময়ে তিনি লক্ষ করলেন লোকটি আর কেউ না, স্বয়ং খলিফা হযরত আবু বকর (রা.)! তিনি ঘর ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করে বেরিয়ে আসছেন দরজা দিয়ে। সকলের অলক্ষ্যে, কেউ যেন না জানে সে জন্য এই ফজরের সময়টা বেছে নিয়েছিলেন তিনি। এমনই মানবদরদী ও পরোপকারী ছিলেন হযরত আবু বকর (রা.)।

একদিন হযরত আবু বকরকে জনৈক ব্যক্তি গালি দিলে জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি তুমি সত্যবাদী হও এবং আমি অপরাধী ও মন্দ হই, তাহলে আল্লাহ যেন আমাকে ক্ষমা করেন। আর যদি তুমি মিথ্যা বলে থাকো তাহলে আল্লাহ যেন তোমাকে ক্ষমা করেন।’

হযরত মুহম্মদ (সা.) বলেছিলেন, ‘আমার উম্মতের মাঝে আবু বকরই সবচেয়ে বেশি দয়ালু।’ নবী করিম (সা.) আরও বলেন, ‘বন্ধুত্ব ও সাহায্য আবু বকরই আমাকে বেশি করেছিলেন। ইহজগতে যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতাম তাহলে আবু বকরকেই করতাম।’

একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) হযরত আবু দারদা (রা.)-কে হযরত আবু বকর (রা.)-এর আগে আগে চলতে দেখে সতর্ক করলেন এবং বললেন, ‘তুমি কি এমন ব্যক্তির আগে আগে চলো, যিনি ইহকাল ও পরকালে তোমার চেয়ে শ্রেষ্ঠ?’ তিনি আরও বলেন, ‘দুনিয়ায় এমন কোনো ব্যক্তির ওপর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয়নি, যে পয়গম্বরদের পর হযরত আবু বকর থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ।’

ইসলামের প্রতি হযরত আবু বকরের অপরিসীম অবদানের জন্য তাকে ‘ইসলামের ত্রাণকর্তা’ বলা হয়। এ অবদানের স্বীকৃতির ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ বলেন, ‘দুনিয়াতে আমি প্রত্যেক মানুষের এহসানের পরিপূর্ণ বদলা আদায় করেছি কিন্তু সিদ্দিকে আকবরের ত্যাগের প্রতিদান আদায় করতে পারিনি। হাশরের ময়দানে স্বয়ং রাব্বুল আলামিন তাকে ওই প্রতিদান দেবেন।’

স্বপ্নের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার

হযরত মুহম্মদ (সা.)-এর পর হযরত আবু বকর (রা.)’কেই স্বপ্নের শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

আয়েশা সিদ্দিকা একবার স্বপ্নে দেখেন, তার ঘরে তিনটি চাঁদ উদিত হয়েছে। এমন অদ্ভুত স্বপ্নের কী মানে? আয়েশা জানতে চাইলেন হযরত আবুবকর (রা.)-এর কাছে। তিনি বললেন, ‘এ স্বপ্ন সত্য হলে তোমার ঘরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তিন মনীষীর দাফন হবে।’ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মৃত্যুর পর তিনি বললেন, ‘হে আয়েশা, তোমার দেখা স্বপ্নে তিন চাঁদের মধ্যে ইনিই সর্বশ্রেষ্ঠ।’

একদিন হযরত মুহম্মদ (সা.) নিজের স্বপ্নের কথা বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমি একদল কালো ছাগলের পিছে পিছে অনুসরণ করছি। এরপর দেখলাম, সাদা ছাগলের পালের পিছে চলছি। আর এক সময় সাদা ছাগলের দল কালো ছাগলের ভিড়ে হারিয়ে গেল।’ আবু বকর সিদ্দিক বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, সাদা ছাগল আরবের মুসলমান, আর কালো ছাগলের দল অনারব মুসলমান। ভবিষ্যতে আরব মুসলমানদের তুলনায় অনারব মুসলমানদের সংখ্যা বেশি হবে।’ নবীজি বললেন, ‘সত্য বলেছ। সকালে ফেরেশতা এসে আমাকে এমন ব্যাখ্যাই দিয়ে গেছেন।’

আরেকদিন নবীজি আবু বকরকে বললেন, ‘আমরা একই সোপানে আরোহণ করতে গিয়ে দেখি আমি তোমার চেয়ে দেড় সিঁড়ি এগিয়ে গেলাম।’ এটা শুনে আবু বকর সিদ্দিক বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, আল্লাহ আপনাকে নিজের রহমত আর মাগফেরাতের মাধ্যমে আগেই আহ্বান জানাবেন। আর আমি আপনার দেড় বছর পর ইন্তেকাল করব।’