এটা রাজনৈতিক নয় শৈল্পিক বিষয়|148681|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ১৪ জুন, ২০১৯ ১৫:০০
এটা রাজনৈতিক নয় শৈল্পিক বিষয়

এটা রাজনৈতিক নয় শৈল্পিক বিষয়

ঢাকার মঞ্চে কামালউদ্দিন নীলুর নাটক মানেই আলোচনার ঝড়। এর আগে অ্যাম্পিউটেশন, দ্য কমিউনিকেটর নির্দেশনা দিয়ে মুগ্ধ করেছেন দর্শকদের। সেই সঙ্গে সমালোচনাও শুনতে হয়েছে তাকে। ১৯৯৬ সালে গড়ে তুলেছেন পেশাদার থিয়েটার প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি)। প্রায় পাঁচ বছর পর দলটির নতুন নাটক নির্দেশনা দিলেন কামালউদ্দিন নীলু। নাটকের নাম ‘স্তালিন’। নাটকটির দ্বিতীয় প্রদর্শনীতেই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেছেন বামপন্থি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কয়েকজন। গত ১০ থেকে ১২ জুন টানা তিন সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে নাটকটির তিনটি প্রদর্শনী হয়েছে। নাটকটির দ্বিতীয় প্রদর্শনী শেষ হওয়ার পর হঠাৎ করেই ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তুলে নাট্যশালার লবিতে স্লোগান শোনা যায়- ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও, সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার সাবধান’। পরদিনও দর্শকদের উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে নাট্যশালার টিকিট কাউন্টারের সামনে বিক্ষোভ করে প্রতিবাদকারীরা। এদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে নাটকটি নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। স্তালিন নাটকের নানা প্রসঙ্গ এবং থিয়েটার ভাবনা নিয়ে দেশ রূপান্তরের মুখোমুখি হয়েছিলেন আন্তর্জাতিক নাট্যনির্দেশক কামালউদ্দিন নীলু। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পাভেল রহমান

দেশ রূপান্তর : পাঁচ বছর পর সিএটির নতুন নাটক এবং আপনার নির্দেশনা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাই?
কামালউদ্দিন নীলু : সেন্টার ফর এশিয়ান থিয়েটার (সিএটি) পেশাদার নাট্যচর্চার স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে চলেছে। শুরু থেকে আমরা সবার বেতন দিতে পেরেছি। ১০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন দেওয়া হয়েছে। শিল্পী- টেকনিশিয়ান মিলে ৪৫ জন লোক কাজ করেছি। এরপর ২০০৬ সালে আমাকেও চলে যেতে হলো। ২০১১ থেকে কার্যক্রম কিছুটা ঝিমিয়ে ছিল। অর্থ সংকটের কারণে ঠিকমতো বেতন দেওয়া যায়নি। এরপর আমাদের ছেলেমেয়েরা কেউ টেলিভিশনে, কেউ নানা বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ শুরু করল। এখন নব উদ্যমে কিছু করার চিন্তা করছি। এখন নতুনরা দায়িত্ব নিয়েছে। মিরপুরে সিএটির নিজস্ব একটা জায়গা আছে। সেখানে আমরা একটা ভবন করার উদ্যোগ নিয়েছি। দুই-এক বছরের মধ্যেই এটা শুরু করতে পারব। সেখানে একটা মিলনায়তন থাকবে, অফিস থাকবে, নাটকের টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেওয়ার মতো সুবিধাগুলো থাকবে।

দেশের অন্যান্য নাট্যদলও সেখানে নতুন নাটকের কারিগরি মহড়া করতে পারবে। আমাদের এখানে আসলে মহড়া কক্ষের অভাবের কারণে নানা রকম নিরীক্ষা করা সম্ভব  হয় না। শিল্পকলা একাডেমিতে যদি একটা মিলনায়তন থাকত; যেখানে নাটকের ফাইনাল মহড়া করা যাবে, লাইট, সাউন্ডসহ সব রকম টেকনিক্যাল সাপোর্ট থাকবে। আমার বিশ্বাস সেটা হয়তো হবে। এখন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক যিনি, তিনি নাটকেরই মানুষ। এই বিষয়গুলো ভেবে এমন একটা ব্যবস্থা তিনি নিশ্চয় করবেন। একটা স্টুডিও গড়ে তোলা হবে, যেখানে নাটকের ফাইনাল মহড়া হবে। দলগুলো ছোট ছোট কক্ষে মহড়া করে। আর্থিক প্রণোদনা ছাড়া এখানে থিয়েটার যেভাবে চলছে, তাতে বাংলাদেশের নাট্যশিল্পীদের ধন্যবাদ দিতেই হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক থিয়েটারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হলে আমাদের আরও পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। সব কিছু সরকার করে দেবে, এটাও মনে করি না। এজন্য কিছু কিছু নিজেদেরই করে নিতে হবে। সিএটি এমন কিছুই করতে চাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর :  স্তালিন প্রসঙ্গে জানতে চাই। এই নাটকটি মঞ্চে আনার কারণ কী?
কামালউদ্দিন নীলু : শিল্পী হিসেবে আমার মনে হয়েছে স্তালিন মঞ্চে আনা যেতে পারে। এটা নিয়ে আমি অনেক রিসার্চ করেছি। এক সময় বাম ঘরানার রাজনীতির সঙ্গে প্রচ-রকম যুক্ত ছিলাম। কমিউনিস্ট পার্টি করেছি। সেসব ভাবনা থেকেই স্তালিন করতে অনুপ্রাণিত হয়েছি। এই কাজটা করতে গিয়ে যে লেখাপড়া করেছি, তাতে আমি দেখেছি, বুঝতে চেষ্টা করেছি আসল অবস্থাটা। তা ছাড়া আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল রাশান স্কুলের অ্যাক্টিং মেথডটাকে ধরা। মায়ারহোল্ড থেকে শুরু করে মাইকেল চেকভ, স্তানিসøাভস্কি, বার্টল্ড ব্রেখট। এসব বিষয়কে মিক্সড করে আমার নিজের একটা থিওরিকে তুলে ধরা। নাটকটি মঞ্চে আসার পর দর্শকের প্রতিক্রিয়া দেখে ভালো লেগেছে। নাটকটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এখন অনেকেই স্তালিন নিয়ে নতুন করে পড়ালেখা করছে। এখানেই তো শিল্পী হিসেবে আমার স্বার্থকতা। 

দেশ রূপান্তর :  স্তালিন কি কারও আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা থেকে মঞ্চে আনা হয়েছে?
কামালউদ্দিন নীলু : নিজেদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতায় সিএটি নাটকটি মঞ্চে এনেছে। সদস্যদের চাঁদা, আমার কিছু কন্ট্রিবিউশন, এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্যদের কন্ট্রিবিউশন। কেউ কেউ ঈদ বোনাসের টাকাও এখানে খরচ করেছে। পুরো রোজার মাস আমরা মহড়া করেছি। ছেলেমেয়েরা তাদের ঈদের টাকাও এখানে খরচ করেছে। আমি দিয়েছি, আমাদের এক্সিকিউটিভ কমিটিতে যারা আছেন তারা দিয়েছেন। সিএটির আগের কাজগুলোতে আর্থিক সম্মানী দেওয়া হয়েছে। মাসে বেতন দেওয়া হতো। এই কাজটাতে আমাদের সদস্যরা সেই টাকাটা এখানে কন্ট্রিবিউট করেছে। আমরা পুরোপুরি পেশাদার মনোভাব নিয়েই কাজটি করেছি। আমাদেরকে এটা মনে রাখতে হবে, পেশাদারিত্ব মানে কিন্তু আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা নয়। পেশাদার মনোভাব আর কমার্শিয়াল মনোভাব কিন্তু এক জিনিস নয়। আমাদের সদস্যরা পুরোপুরি পেশাদার মনোভাব থেকেই কাজটি করেছে।  

দেশ রূপান্তর : স্তালিন নাটকে ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য জানতে চাই?
কামালউদ্দিন নীলু : যারা মনে করছে এই নাটকে স্তালিনকে ছোট করা হয়েছে, এই নাটকে ইতিহাস বিকৃতি করা হয়েছে, তারা সঠিক ইতিহাস তুলে ধরুক না। আমি তো একটা ডিসকোর্স তৈরি করলাম, এবার কাউন্টার ডিসকোর্স তৈরি করুক না। যারা এই বিতর্কটা তৈরি করেছে, তাদেরকে বলুন সঠিক ইতিহাসটা জানাতে। আমি তো একটা কাজ করলাম। এটাকে কাউন্টার দিয়ে তারা আরেকটা কাজ করুক না। স্তালিন যদি আপনাদের কাছে নায়ক হয়, কিংবা আমার নাটকে স্তালিনকে ছোট করা হয়েছে বলে যদি মনে হয়, তবে আপনাদের তো এখন উচিত হবে স্তালিনের ওপর নাটক করে কিংবা লেখালেখি করে আমাকে বুঝিয়ে দেওয়া, দর্শককে বুঝিয়ে দেওয়া যে কামালউদ্দিন নীলু ভুল, আমরাই সঠিক। আর এটাই তো শুদ্ধ সংস্কৃতিচর্চার জায়গা। এটা না করে এভাবে লাফালাফি করা তো ঠিক নয়। এটা তো পলিটিক্যাল ব্যাপার নয়। এটা তো আর্টিস্টিক ব্যাপার। এটা নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে চেঁচামেচি না করে আপনারা লেখালেখি করুন না। কিংবা স্তালিনকে নিয়ে আরেকটা ভালো নাটক করার চেষ্টা করুন না। সেটাই তো হওয়া উচিত।

চিন্তার প্রতিযোগিতা, জ্ঞানের প্রতিযোগিতা হলে তো আমি খুশি হব। দুই ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট আমার নাটক, দর্শক কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার নাটকটা দেখেছেন। এত দীর্ঘ সময় মিলনায়তনে বসে নাটকটি দেখেছেন। এটা আমার কাছে এক্সপেরিমেন্ট ছিল। এটাকে ‘ডার্ক কমেডি’ বলা যেতে পারে। আপনি নিজেও এ নাটক দেখে থাকলে হেসেছেন, কিন্তু চিৎকার করে হাসছেন না। দর্শক হাসবেন কিন্তু হাসিটা ভেতরেই থেকে যাবে। এটা ছিল আমার এক্সপেরিমেন্টের জায়গা। আরেকটা এক্সপেরিমেন্টের জায়গা ছিল- থ্রি ডাইমেনশনকে কীভাবে কখনো কখনো টু ডাইমেনশনে আনা যায়। এ রকম কিছু এক্সপেরিমেন্ট করার চেষ্টা করেছি। আমি তো স্তালিনকে মহানায়ক হিসেবে দেখাইনি। এটা তো স্তালিনের ট্র্যাজেডি। মারা যাওয়ার আগে মানুষের রিয়ালাইজেশন হয়, ইয়াং মেমোরিগুলো ব্যাক করে। এই নাটকেও সেটা হয়েছে। এখন কেউ মার্কসবাদের অ আ ক খ পড়ে যদি মনে করেন মার্কসিস্ট হয়ে গেছি আর বটতলার চটি বই পড়ে, ষাটের দশকের কিছু বইয়ের ফটোকপি পড়ে যদি মনে করেন মার্কসবাদ, সোশ্যালিজম, কমিউনিজম বুঝে গেছেন- তাহলে তো ভয়ংকর ব্যাপার। এখন বাংলাদেশের বাম রাজনীতির অবস্থাটা কী? তারা ৫-৭ জন বসে একটা বিষয় নিয়ে এক জায়গায় আসতে পারে না। তাদের সঙ্গে জনগণের কোনো সংযোগ নেই। তাদের কেউ ডানের মধ্যে বাম হয়ে আছে। তাদের এই চেঁচামেচি নিয়ে ভাবছি না।

দেশ রূপান্তর : প্রতিবাদের কারণে পরবর্তী প্রদর্শনী নিয়ে আপনি কোনো চাপ অনুভব করছেন কি না?
কামালউদ্দিন নীলু : কীসের চাপ? আমি এগুলো তোয়াক্কা করি না। তাদের প্রতিবাদ নিয়ে আমি ভাবছি না। ধর্মীয় মৌলবাদীদের সঙ্গে এদের পার্থক্যটা কী? যে কারণে পৃথিবী থেকে সমাজতন্ত্র হারিয়ে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেছে। ষাটের দশকে বাম রাজনীতি যে ধারায় অবস্থান করছিল, এখন কি সেই অবস্থায় আছে? ৪-৫ জন মিলে একটা পলিটিক্যাল পার্টি করে ফেলছে। বাংলাদেশ এখনো সুস্থচর্চার মধ্যে আছে যার জন্য তাদেরকে বাধা দেয় না। পার্টি করলেও তো কিছু না কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। সে জন্য এরা পার্টি করছে।

দেশ রূপান্তর : এই নাটকের প্রদর্শনী কি নিয়মিত হবে?
কামালউদ্দিন নীলু : অবশ্যই হবে। এই নাটকটির ডিজাইনও এমনভাবেই করা। এটাকে চাইলে জেলা শহরেও করা যাবে।