বাজেট জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম: প্রধানমন্ত্রী|151895|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২৯ জুন, ২০১৯ ১৯:৫৫
বাজেট জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম: প্রধানমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক

বাজেট জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম: প্রধানমন্ত্রী

বাজেটকে জনবান্ধব, উন্নয়নমুখী ও সুষম বাজেট উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি অর্জন, ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ গড়া আর আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণের কার্যকর মাধ্যম এই বাজেট।

জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আজ শনিবার আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। শনিবার বাজেট আলোচনা শেষে অর্থবিল ২০১৯ পাস হয়। এবার মোট ২৭০ জন সাংসদ আলোচনায় অংশ নেন।

পুঁজিবাজারের স্টক লভ্যাংশ এবং রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত করারোপসহ বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে বাজেটে যে প্রস্তাব আনা হয়েছিল, তা পরিবর্তনের সুপারিশ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাজেট পাসের আগে রাজস্ব অংশের আলোচিত-সমালোচিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে কিছু বিষয়ে পরিবর্তন প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রী তা সংশোধন করতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেন। পরে অর্থমন্ত্রী তা সংশোধন করে নিলে অর্থ বিল সংসদে পাস হয়।

‘সমৃদ্ধ আগামীর’ প্রত্যাশা সামনে রেখে আওয়ামী লীগের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট ১৩ জুন জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

২০১৯-২০ অর্থ বছরের জন্য প্রস্তাবিত এই ব্যয় বিদায়ী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ১৮ শতাংশ বেশি।

প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষায় কোম্পানিগুলোকে ক্যাশ ডিভিডেন্ডে উৎসাহিত করার জন্য স্টক ডিভিডেন্ডের ওপর ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেন, “এ বিষয়ে ব্যবসায়ী সমাজের কেউ কেউ আপত্তি জানিয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী পরিশোধিত মূলধন বাড়ানোর জন্য ব্যাংকগুলো নগদ লভ্যাংশ দিতে পারে না।”

তিনি বলেন, “ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের এরূপ মন্তব্যের পাশাপাশি পুঁজিবাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ আমাদের ভাবতে হবে। কোম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে বিনিয়োগকারীও নগদ লভ্যাংশ প্রত্যাশা করে।”

তাই নতুন প্রস্তাবে স্টক ডিভিডেন্ডের সঙ্গে সমান হারে নগদ লভ্যাংশও দেওয়ার প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।

“এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে আমি প্রস্তাব করছি যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি যে পরিমাণ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করবে, কমপক্ষে তার সমপরিমাণ নগদ লভ্যাংশ প্রদান করতে হবে। যদি কোম্পানির ঘোষিত স্টক লভ্যাংশের পরিমাণ নগদ লভ্যাংশের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে স্টক লভ্যাংশে উপর ১০ শতাংশ হারে কর প্রস্তাব করতে হবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “নগদ লভ্যাংশ উৎসাহিত করায় আমরা আরও প্রস্তাব করেছিলাম যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের ৫০ শতাংশের বেশি রিটেইন আর্নিং, রিজার্ভ থাকলে অতিরিক্ত রিটেইন আর্নিং, রিজার্ভের উপর অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।

“এ বিষয়েও ব্যবসায়ী উদ্যোক্তারা কেউ কেউ আপক্তি করেছেন,” মন্তব্য করে তিনি বলেন, “সেই প্রেক্ষাপটে এই ধারাটির আংশিক সংশোধনপূর্বক আমি প্রস্তাব করছি যে, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোনো কোম্পানি কোনো অর্থবছরে কর পরবর্তী নিট লাভের সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ রিটেইন আর্নিং, ফান্ড, রিজার্ভে স্থানান্তর করতে পারবে। অর্থাৎ কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ দিতে হবে।

“যদি কোনো কোম্পানি এরূপ করতে ব্যর্থ হন তাহলে প্রতিবছরে রিটেইন আর্নিং, ফান্ড, রিজার্ভের মোট অর্থের ওপর ১০ শতাংশ হারে কর আরোপ করা হবে।”

শেখ হাসিনা বলেন, “উপরোক্ত বিষয়গুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে পুঁজিবাজার সংক্রান্ত আয়কর আইনের প্রস্তাবিত ধারাগুলো আমরা বিবেচনা করবো।”

ভ্যাটের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু পরিবর্তনের সুপারিশ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় পর্যায়ে একাধিক মূসক হার প্রবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে। ১৫ শতাংশের নিম্নহারের উপকরণ কর রেয়াত দেওয়ার সুযোগ না থাকায় ব্যবসায়ীরা হ্রাসকৃত হারের পরিবর্তে উপকরণ কর গ্রহণ করে ১৫ শতাংশ হারে কর প্রদানের সুযোগ সৃষ্টির জন্য দাবি করেছে।

“হ্রাসকৃত হারের পাশাপাশি কেউ চাইলে যেন ১৫ শতাংশ কর দিয়ে রেয়াত পদ্ধতি অনুসরণ করতে পারে আইনে সেই বিধান আনার প্রস্তাব করছি।”

দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করে তাঁত শিল্পে ব্যবহৃত সুতা শিল্পের উপর ৫ শতাংশ মূসকের পরিবর্তে প্রতি কেজি সুতায় ৪ টাকা হারে সুনির্দিষ্ট করের প্রস্তাব করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “দেশীয় শিল্পের প্রতিরক্ষণ, প্রণোদনা প্রদানে প্রস্তাবিত বাজেটে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে শুল্কহার হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে এর ফলে দেশীয় কাগজ ও গ্যাস উৎপাদনকারী শিল্পসহ অন্যান্য শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। দেশীয় মুদ্রণ শিল্পের প্রণোদনা প্রদান ও বন্ড ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধকল্পে দেশে উৎপন্ন হয় না এমন পেপারগুলোর শুল্কহার যৌক্তিক করা হবে।”

এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটে আমদানি পর্যায়ে কিছু ক্ষেত্রে শুল্কহার পুনর্নির্ধারণ করা হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আর্থিক খাতে সার্বিক শৃঙ্খলা আনতে বাজেটে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমাতে অর্থমন্ত্রী যে উদ্যোগী ঘোষণা দিয়েছেন, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। এর পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সুপারিশ করেন, যেন ব্যাংক ঋণের ওপর সুদের হার এক অঙ্কে রাখতে যথার্থ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। তিনি বলেন, এটি করা হলে দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতকে সক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে। উচ্চ হারে সুদ থাকলে শিল্প বিকশিত হবে না। এ জন্য এই ব্যবস্থা নিতে হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, যুবকদের কর্মসংস্থানের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রবাসী বাংলাদেশিদের অর্থ প্রেরণে দুই শতাংশ প্রণোদনার প্রস্তাবে রেমিট্যান্স পাঠানোর বর্ধিত ব্যয় লাঘব হবে। প্রবাসী কর্মীরা বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হবেন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনাও সরকারের আছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক দ্রুত বিকাশমান ও সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে অর্থ বছরে এক শতাংশ প্রণোদনার যে প্রস্তাব করা হয়েছে তা যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এতে তৈরি পোশাক খাত আরও বিকশিত হবে। কর্মসংস্থানে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ১০ বছরে যে অভূতপূর্ব উন্নতি করছে তা দেশে বিদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের একটি বড় সাফল্য। দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে বলেই বাজেটে বৈদেশিক অনুদান মাত্র দশমিক ৮ শতাংশ।

দুর্নীতিকে দেশের জন্য একটি বড় সমস্যা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে যারা ক্ষমতায় আসে তারা নিজেরাও দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। সমাজে দুর্নীতিটাকে তারা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে দেয়। এটা মানুষের একটি মানসিক রোগে পরিণত হয়ে যায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর নীতি জিরো টলারেন্স। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। এ লক্ষ্যে এক গুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব বাজেটে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ সহজ করা হয়েছে। এক শ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলছে। দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর বিনিয়োগের প্রস্তাব আসছে। এগুলো কর্মসংস্থানে ব্যাপক অবদান রাখবে। তিনি বলেন, বেসরকারি খাতকে অগ্রাধিকার ও বৈষম্য হ্রাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রে দূরদর্শী সময়োপযোগী পদক্ষেপের কারণে সামগ্রিক অর্থনীতি স্থিতিশীল। বাজেটে যে ঘাটতি তা সহনশীল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পর্যাপ্ত, মুদ্রা বিনিময় হার বাণিজ্য সহায়ক। বাজেট ঘাতটি সব সময় ৫ শতাংশ ধরে রাখা হয়েছে, কখনো কখনো এর চেয়ে কমও হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেবল শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়, ২৯টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বিষয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে বাজেটে ৮৭ হাজার ৬২০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যা মোট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ। তিনি বলেন, কওমি মাদ্রাসার কারিকুলাম ঠিক করে মূল ধারায় আনা হয়েছে। এতে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা দেশে বিদেশে চাকরি পাবে।

শেখ হাসিনা বলেন, আগামী ২০২৩-২০২৪ সালে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা, মাথা পিছু আয় ২ হাজার ৭৫০ ডলার, রপ্তানি ৭২ বিলিয়ন ডলার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ২৮ হাজার মেগাওয়াট ও অতি দারিদ্র্যের হার ৪ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এবারের বাজেট এসব লক্ষ্য অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা আরও সুদৃঢ় হয়েছে। তার প্রমাণ গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। মানুষ আস্থা রেখেছে বলেই আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে।