জামির মতো মানুষ বিরল|159163|Desh Rupantor
logo
আপডেট : ২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০
জামির মতো মানুষ বিরল

জামির মতো মানুষ বিরল

লেখাপড়া করেছেন ঢাকার বিখ্যাত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে, কলেজ ছিল আরও বিখ্যাত ‘সেন্ট জোসেফ হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল’। ছাত্রও ভীষণ ভালো ছিলেন ইমতিয়াজ আহমেদ জামি। এসএসসিতে পেয়েছেন ‘এ প্লাস’ ও এইচএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে গোল্ডেন ‘এ প্লাস’। এরপর পড়েছেন ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের (সিএসসি) ছাত্র ছিলেন। এই বিভাগটি বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব ভালো বলে জানিয়ে স্বীকার করলেন এই যুবক ‘হয়তো আমার প্রস্তুতি ভালো ছিল না বলে, হয়তো বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সময়গুলোকে খুব বেশি গুরুত্ব দিতে পারিনি বলে সরকারি কোনো বিশ^বিদ্যালয় বা বুয়েটে পড়া হয়নি। তাতে কোনো আফসোস এখন আর নেই।’ সেটির কারণ ‘অভিযাত্রিক ফাউন্ডেশন’। স্বপ্নগুলো তার বদলে দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী এই সংগঠন। লেখাপড়ার সময়গুলোতে ক্লাস শেষ করে বিকেলে বা কোনো ক্লাসের অবসরে তারা স্কুল চালাতেন, সক্ষম প্রকল্পের মাধ্যমে পাশে থাকবেন বলে যাদের কিছু নেই, তাদের খুঁজতেন। ২০১০ সাল থেকে ২০১৭ সালের শেষ পর্যন্ত তারা বাইরে কোনোদিন কোথাও আড্ডা দেননি। কাজের বাইরে থাকেননি। কোনো বন্যা এসেছে দেশে, তারা ত্রাণ জোগাড় করতে নেমে পড়েছেন, ঈদে মানুষের জন্য দিয়েছেন পোশাক। আরও কাজগুলো করেছেন। এই করতে করতে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সিএসসি পাস করে দেখলেন, মোট সাড়ে চারশ মানুষকে তারা তাদের সংগ্রহ করা যাকাতের টাকা সক্ষম করে তুলেছেন। তাদের দিয়েছেন জীবন বদলানোর হাতিয়ার রিকশা, পাওয়ার টিলার, মাছের বা হাঁসের খামারসহ কত কিছু। মানে যার জীবনের জন্য যা প্রয়োজন, দেবার চেষ্টা করেছেন তারা। ফলে পাস করে মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন ও ইয়াসমিন মেরির একমাত্র সন্তান সিদ্ধান্ত নিলেন, এখন অভিযাত্রিকের হাল ধরতে হবে। নয়তো সব স্বপ্নই মুছে যাবে।

এখন তাদের যে মোট সাড়ে তিন হাজার কর্মী বাহিনী আছেন, তাদের জন্য কাজ করতে করতে অনেকগুলো নিয়ম তৈরি করেছেন। মাসে একবার কর্মীদের সভা হয় নানা জেলায়। তারাই তাদের এলাকাগুলোর সমাধানযোগ্য সমস্যাগুলো বের করেন, কাদের সাহায্য করা প্রয়োজন লেখেন। এরপর সেগুলোর সমাধানে নামে অভিযাত্রিক। তাদের নিয়ে বড় একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। সেটি ‘জয় অব গিভিং’। প্রতি বছর রমজানে রমজানের পঞ্জিকা বিক্রি করেও দুই হাজার পরিবারকে তারা খাবার সামগ্রী বিলান, চাল, ডাল কিনে দেন। এবারের জয় অব গিভিং-এ তারা ১২ হাজার পরিবারের মধ্যে ত্রাণ বিলিয়ে দেবেন। ২শ পরিবারকে ভেঙে যাওয়া ঘর তুলে দেবেন। তাদের সদস্যদের ভাগ আছে ভলান্টিয়ার, কোর ভলান্টিয়ার, কোর মেম্বার, ডিপার্টমেন্ট হেড ও ন্যাশনাল বোর্ড মেম্বার। ধাপে ধাপে তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে পারেন। আমদানি-রপ্তানির ব্যবসা করা বাবার ছেলেটি এখন বস্তিতে, বস্তিতে কাজ করেন। ব্যবসা নয়, শিশুদের, মানুষের জন্য কাজ করতেই তার আনন্দ। দেখেছেন, বস্তির ছেলেমেয়েরা কোনোদিন কম্পিউটার দেখেনি। স্কুলের ভালো পরিবেশ তারা টিনের ঘরে, সেই এলাকাতে পায় না। ফলে ১০টার স্কুলের জন্য তারা ৮টাতেই এসে বসে থাকে। আবার ৩টা-৪টায় স্কুল শেষ করেও খেলবে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশবে বলে থেকে যায়। একেবারে সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। তাদের জন্য এখন আছে অভিযাত্রিক স্কুল মোট তিনটি। লতার চরে; ২/ডি/৫, পল্লবী, মিরপুর, ঢাকা; ৬৩, রায়েরবাজার, দুর্গামন্দিরের কাছে। প্রতিটি স্কুলেই ৫০টি শিশুকে তারা শিশুশ্রেণিতে ভর্তি করেন। তারাই পাস করে করে এখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। এদের জন্যই থেকে গেছেন, বেঁচে আছেন জামি। দেশের জন্য তো কিছু করতে পারছেন। চারশ শিশুকে লেখাপড়ার আলো দান করা তো কম কথা নয়। গত বছর তাদের ১৩টি শিশু পিএসসি পরীক্ষা দিয়ে সবাই পাস করেছে। এই তৃপ্তি তিনি কোথায় পাবেন?

এখন তার লক্ষ্য, বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যাকাত ফান্ডের সহযোগিতা নিয়ে আরও অনেক পরিবারকে স্বাবলম্বী করা।